
[১৯৯০ সালের মার্চ মাসে প্রকাশিত আল্লামা সাইয়েদ মুহিব্বুদ্দীন আল-খতীব কতৃক লিখিত “ শিয়া-সুন্নী ঐক্য প্রসংগ” বইয়ে আল্লামা উবায়দুল হক (রহ) এর দেওয়া মুখবন্ধ]
আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করে আসছি যে, দ্বাদশ ইমামগণী শিয়া মযহাবের পক্ষ থেকে তথাকথিত ‘শিয়া-সুন্নী ঐক্য’ প্রতিষ্ঠার নামে বিভিন্ন সুন্নী
দেশে শিয়াবাদকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য ব্যাপক প্রচার কার্য চালানো হচ্ছে এখন থেকে অর্ধশত বছর পূর্বে আন্তর্জাতিক শিয়া নেতৃত্ব তথাকথিত শিয়া- সুন্নী ‘ঐক্য’ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে কাজ করার জন্য মিসরে প্রথম প্রচার কেন্দ্রটি স্থাপন করার সময় থেকেই একটি শক্তিশালী শিয়ারাষ্ট্র গোপনভাবে এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে নিয়োজিত রয়েছে এবং যাবতীয় ব্যয়ভার বহন করে এসেছে। এক দশক পূর্বে ইরানে সংঘটিত রাষ্ট্র বিপ্লবের পর শিয়া-সুন্নী ঐক্য আন্দোলনে নতুন প্রাণ ও গতি সঞ্চারিত হয় এবং মিসরের বাইরে অন্যান্য সুন্নী দেশেও এ আন্দোলন দ্রুত প্রসার লাভ করে। বিগত বছরগুলোতে যেসব সুন্নী দেশে এ শিয়া আন্দোলনটির কাজ খুব জোরেশোরে চলছে তন্মধ্যে বাংলাদেশের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
উল্লেখ্য, ইসনা আশারিয়া ইমামিয়া শিয়া মযহাব ও আহলে সুন্নত ওয়াল জমায়াতের মধ্যে তথাকথিত ‘ঐক্য’ স্থাপনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে ত্রিমুখী তৎপরতা চালানো হচ্ছে। প্রথমতঃ, শিয়া মযহাব সম্পর্কে আমাদের দেশের সরলপ্রাণ সুন্নী মুসলমানদের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে তাদের সম্মুখে এর ভুল সংজ্ঞা তুলে ধরা হচ্ছে এবং আমাদের সালফে সালেহীন ও পূর্ববর্তী উলামায়ে কেরাম যে শিয়া ফিরকা সমূহকে বাতিল ফিরকা হিসেবে গণ্য করে গেছেন এ সত্যকে চাপা দেওয়ার জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চালানো হচ্ছে। দ্বিতীয়তঃ শিয়া মতবাদকে এদেশের জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য অত্যন্ত সুচতুরভাবে একথা প্রচার করা হচ্ছে যে, ‘হানাফী- শাফেয়ী- হাম্বলী’ প্রভৃতির মত শিয়াবাদও ইসলামে একটি প্রচলিত মযহাবের নাম এবং শিয়ারা আকীদা ও আমলের দিক থেকে হানাফীদের অত্যন্ত নিকটবর্তী। এসব প্রচারণা যে আসলে প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয় তা এ পুস্তকের পাতায় পাতায় আপনারা দেখতে পাবেন। তৃতীয়তঃ, শিয়া-সুন্নী সম্প্রীতি, ইসলামী বিশ্ব ইত্যাদি চটকদার স্লোগানের মাধ্যমে শিয়া মতবাদের প্রতি সুন্নী মুসলমানদের সহানুভূতি অর্জন এবং ইসলামের নামে পরিচালিত একটি শিয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বার্থ ও সহিংসতার প্রতি বৃহত্তর মুসলিম জনগোষ্ঠীর সমর্থন আদায়ের এক অশুভ পাঁয়তারা চালানো হচ্ছে।
শিয়া ও সুন্নী জনগোষ্ঠীর মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন এবং শিয়া মযহাব ও আহলে সুন্নত ওয়াল জমায়াতের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা আসলে সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস বলা বাহল্য, প্রথমটি অভিপ্রেত এবং কল্যাণকর কিন্তু দ্বিতীয়টি নিঃসন্দেহে অনভিপ্রেত এবং ক্ষতিকর। শিয়া কেন অন্য যেকোন ধর্ম বা মতবাদের অনুসারীদের সঙ্গে মুসলমানদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে সহযোগিতার সম্পর্ক স্থাপন ইসলামে শুধু অনুমোদিত নয়- প্রশংসিতও। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, শিয়াদের তাতে মোটেই আগ্রহ নেই। সুন্নীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক স্থাপনের চেয়ে আহলে সুন্নত ওয়াল জমায়াতের সাথে ধর্মীয় ঐক্য স্থাপনই শিয়াদের উদ্দেশ্য বেশি। অবশ্য এজন্য তারা কানাকড়ি মূল্য দিতেও রাজী নয়। তারা চায় যে, আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাহ ও সলফে সালেহীনের তরীকা তথা ইসলামের মূলধারার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে আমরা তাদের মতবাদের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করি। কিন্তু আমরা কি তা করতে পারি? কোন ধর্ম বা মতবাদের সঙ্গে ঐক্য স্থাপনের উদ্দেশ্যে আমরা কি আমাদের দ্বীন পরিত্যাগ করতে পারি? ইসলাম কি আমাদের কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি যে একে নিয়ে আমরা খেলা করব?
শিয়া মতবাদ ও আহলে সুন্নত ওয়াল জমায়াতের মধ্যে ঐক্য স্থাপনের প্রচেষ্টা
প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র ও ইসলামে একটি নতুন ফিতনা। কিন্তু এ ফিতনা দ্বারা শিয়াদের ক্ষতিগ্রস্ত হবার কোন আশংকা নেই। কারণ, শিয়া মতবাদ নিজেই ইসলামে একটি ফিতনা। মুহাদ্দিসীন ও মুজতাহিদীনে কেরাম শিয়াবাদকে ইসলামে নতুন উদ্ভাবিত একটি বাতিল ফিরকা বলে গণ্য করেছেন। এ ফিরকা উদ্ভাবনের মাধ্যমে তারা ইসলামের মূলধারা-আহলে সুন্নাহ ওয়াল জমায়াহ- থেকে দূরে সরে গেছে। এখন তারা চাচ্ছে আমাদেরকেও এ ধারা থেকে সরিয়ে নিয়ে তাদের সাথে একই সমতলে দাঁড় করাতে। এ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই তারা তথাকথিত শিয়া-সুন্নী ঐক্যের স্লোগান তৈরী করেছে। ঐক্যের প্রতি আগ্রহে তারা যদি অন্তরিক হতো তবে কি তারা আল্লাহর কিতাব, রসূলের সুন্নাহ, সাহাবায়ে কেরাম, ইসলামের পবিত্রস্থান ও পথিকৃতদের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হতে পারত? তবে তারা যা-ই ভাবুক বা করুক না কেন আমরা তাদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করতে প্রস্তুত।
কিন্তু একটি শিয়া রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা ও বদান্যতায় বাংলাদেশে শিয়া মতবাদের সমর্থনে ও আহলে সুন্নত ওয়াল জমায়াতের সমালোচনায় যে ব্যাপক প্রচারণা চালানো হচ্ছে তা দেখে বিশ্বাস হয়না যে, তারা সুন্নীদের সঙ্গে শান্তি ও ঐক্য চায়। একটি বাতিল ফিরকার স্বার্থে কুরআন-হাদীসের অপব্যাখ্যা করা ও সাধারণ মুসলমানদের আকীদা- বিশ্বাসের উপর বেপরোয়াভাবে আক্রমণ পরিচালনা করা সত্যিই অত্যন্ত দুঃখজনক ব্যাপার। বলা বাহুল্য, শিয়াদের উদ্যোগ ও অর্থে পরিচালিত এসব কার্যকলাপ প্রকৃতপক্ষে মুসলমান ও ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। আমাদের উলামা, মাশায়েখ ও পীর-মুর্শিদগণের উচিত পূর্বাহ্নেই ষড়যন্ত্রের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং বাংলাদেশের সাধারণ মুসলমান বিশেষতঃ যুবসমাজকে এর স্খলন থেকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। বাতিল ফিরকাসমূহের আলোচনা শুধু হাদীস, তফসীর ও আকাইদের কিতাবসমূহে সংরক্ষিত থাকলেই চলবেনা। বরং সভা-সম্মেলনে ওয়াজ মহফিলে এবং জুমার খুৎবাতেও অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে এ বিষয়টি আলোচিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন।
উল্লেখ্য যে, মিসরীয় পন্ডিত আল্লামা মুহিব্বুদ্দিন আল-খতীব বর্তমান শতকে
শিয়া মযহাব সম্পর্কে ইসলামী বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গবেষক ও বিশিষ্ট গ্রন্থকার হিসেবে পরিচিত। গ্রন্থ প্রণয়ন ছাড়াও শিয়া মতবাদ সম্পর্কে তিনি পত্র-পত্রিকায় প্রচুর লেখালেখি করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থাবলীর মধ্যে এ বইটি ইসলামী বিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। প্রথম প্রকাশের পর বিগত তিনদশকে এর ডজন খানেক সংস্করণ এবং একাধিক ভাষায় এর অনুবাদই গ্রন্থটির জনপ্রিয়তার সর্বোৎকৃষ্ট প্রমাণ। বিশেষতঃ এর দ্বিতীয় খন্ডে অন্তর্ভুক্ত ‘নজফ সম্মেলন’ বইটির মর্যাদা ও জনপ্রিয়তা বহুলাংশে বাড়িয়ে দিয়েছে। ঐতিহাসিক নজফ সম্মেলনের সভাপতি ও বিচারক আল্লামা আবদুল্লাহ আল- সুয়াইদী (রহঃ) তাঁর স্মৃতিকথায় সম্মেলন সম্পর্কে যেসব তথ্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন তা যেমন হৃদয়গ্রাহী তেমনি জ্ঞান সমৃদ্ধ ও চিন্তা উদ্দীপক। বিশেষতঃ নাদির শাহের দরবার ও শিয়া নেতা মোল্লা বাশীর সঙ্গে কথোপকথনের যে চিত্র তিনি যুক্তিখণ্ডীয় তুলে ধরেছেন তা যেকোন নাটক-উপন্যাসের বর্ণনা ও সংলাপের মতই আকর্ষণীয়। দেরীতে হলেও গ্রন্থটির পূর্ণাঙ্গ বঙ্গানুবাদ এদেশের সুন্নী জনগণের অশেষ কল্যাণ সাধন করবে বলে আমার বিশ্বাস।
বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানদের উপহার দেওয়ার জন্য এ বইটি অনুবাদ করে আমার একান্ত শ্রদ্ধাভাজন ছাত্র আবদুশ শাকুর খন্দকার দ্বীন ও মিল্লাতের প্রতি একটি বিরাট খিদমত আঞ্জাম দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা তাঁর এ প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং এর দ্বারা সংশ্লিষ্ট সকলকে উপকৃত হবার তৌফিক দিন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সাধারণ পাঠকবর্গের মত আমাদের দেশে আধুনিক শিক্ষিত সমাজ, এমনকি উলামায়ে কেরামও এর দ্বারা যথেষ্টই উপকৃত হবেন। তাই বইটির বহুল প্রচার এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা কামনা করি।আমীন।
উবায়দুল হক
খতীব,
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররম, ঢাকা।
প্রাক্তন হেড মাওলানা, মাদরাসা আলিয়া, ঢাকা।

Leave a comment