লেখকঃ মাহদি হাসান কাসেমি
মানুষ বলতেই জানে যে, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঔরসে হযরত খাদিজাতুল কুবরা রাদিয়াল্লাহু আনহার গর্ভ থেকে চার মেয়ের জন্ম হয়েছিল। যয়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলছুম ও ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না। আমার ক্ষুদ্র মুতাআলায় শিয়াদের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থগুলোতে এমনই পড়েছিলাম। হুঁ, এক মেয়ের কথাও অনেকে বর্ণনা করেছে, কিন্তু এ বিষয়ের উপর তেমন গুরুত্বারোপ না করায় খেয়াল করা হয় নি। তাছাড়া যেহেতু ‘শিয়াদের সিরাত চর্চার ধারা’ শিরোনামে সিরাত বিষয়ে ওদের বিভ্রান্তি ও মিথ্যাচার পর্ব আকারে লিখে যাচ্ছিলাম, তাই ভেবেছিলাম যথা স্থানেই এ বিষয়ে আলোচনা করব। কিন্তু দিনকয়েক আগে শিয়াদের অন্যতম একটি অনলাইন গ্রুপ ‘শিয়া- সত্যের প্রতি আহবান’-এ উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর শানে বেয়াদবি মূলক শব্দ ব্যবহার ও নোংরা ভাষায় কমেন্ট আক্রমণ করায় একপর্যায়ে আমি ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জামাতার দোহাই দিয়ে ভদ্রভাবে তাঁর নাম উচ্চারণ করতে বলেছিলাম। কিন্তু উত্তরে রাসুলের এক মেয়ে ও অন্যদের তাঁর পালক মেয়ে সাব্যস্ত করে যে কথাটা বলেছিল, শুনলে হয়ত আপনাদেরও পিলে চমকে যাবে। বলে উসমান তো ফিরাউনের চেয়েও নিকৃষ্ট। আর আসিয়া কিন্তু উত্তম মহিলাদের অন্তর্ভূক্ত, তবে তার স্বামী কিন্তু ফিরাউন। শুনে আমি ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। একটা মানুষ কতটা নিকৃষ্ট ও অভদ্রঘরের সন্তান হলে এমন নোংরা কথা বলতে পারে, সেটা ভাবছিলাম। যাকগে, তখনই আমি শিয়াদের নির্ভরযোগ্য সব কিতাব দেখতে শুরু করলাম। এবং সেখানে যা পেলাম তা রীতিমত কতটা যে হাস্যকর, তার কিছুটা উল্লেখ করলেই বুঝতে পারবেন। সে সঙ্গে তাদের মূর্খতা ও মিথ্যাচার সুস্পষ্টভাবে অনুধাবন করবেন। তাই সংক্ষেপে সে বিষয়েই কিছু তুলে ধরছি।
সর্বপ্রথম হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার ব্যপারটা লক্ষ করি:
ষষ্ঠ শতাব্দির শিয়াদের অন্যতম বড় আলিম ইবনু শহর আশুব (৪৮৮-৫৮৮ হি.) ‘আল-মানাকিবু আলে আবি তালিব’ গ্রন্থে ১৫৯/১ লেখে: “أن النبی (ص) تزوج بہا و کانت عذراء” নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহাকে কুমারি হালাতে বিয়ে করেছেন।
মোল্লা বাকের মাজলিসি (১০৩৭-১১১০ হি.) হায়াতুল কুলুবের মধ্যেও ২/৭২৮ খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার কুমারি থাকার কথা লেখেছে।
আর আনওয়ারুন নুমানিয়্যাহর মধ্যে ১/১২৪ সাইয়্যেদ নিয়ামাতুল্লাহ আল জাযায়িরি (মৃত. ১১১২ হি.) লেখে, আতিক থেকে হযরত খাদিজার গর্ভে হিন্দা নামক এক মেয়ে হয়েছিল এবং ওই পৃষ্ঠায়ই তার পরবর্তী স্বামী সম্পর্কে লেখে যে, আবু হালা থেকে হযরত খাদিজার গর্ভে হিন্দ নামক একটা ছেলে হয়েছিল।
আল মুহাব্বর পৃ. ৪৫৬ ও হায়াতুল কুলুবের মধ্যে ২/৯১ লেখে যে, হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার প্রথম বিবাহ আতিক ইবনু আয়িয মাখযুমির সাথে অতঃপর আবু হালার সাথে হয়েছিল।
হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা কুমারি ছিলেন কিনা সেটা নিয়ে তাদের বড় কয়েক মুহাদ্দিসের বর্ণনা বিভ্রান্তি লক্ষ করলাম। পরবর্তী বিষয় লক্ষ করুন:
নাসাবুল কুরাইশ গ্রন্থে ২২৯ রয়েছে, হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার হালা নামক একজন আপন বোন ছিল। যার ছেলে ছিল আবুল আস।
আর শায়েখ সুদুক কিতাবুল খিসালের মধ্যে ২/১৬৪ লেখে: হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক মেয়ে যয়নাবের বিবাহ আবু হালার ছেলে আবুল আসের সঙ্গে হয়েছিল।
অথচ পূর্বে আরেক রেওয়ায়েতে দেখে আসলাম আবু হালা খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার দ্বিতীয় স্বামী ও আরেক রেওয়ায়েতে তাঁর সন্তান হিন্দ ছিল বলল।
মোল্লা বাকের মাজলিসি হায়াতুল কুলুবের মধ্যে ৬/৭১৯ লেখে রুকাইয়া এবং উম্মে কুলসুম হালার মেয়ে ছিল। আর আবুল কাসিম আল কুফি (মৃত. ৩৫২ হি.) আল ইস্তিগাছার মধ্যে ১/৮১ লেখে, যয়নাব ও রুকাইয়া হালার মেয়ে ছিল।
দেখুন কমেডি। রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঔরসজাত কন্যাদের পিতা অন্য কাউকে সাব্যস্ত করার জন্য কি হাস্যরসের অবতরন করছে তারা। কত বড় মিথ্যাচারের আশ্রয় নিচ্ছে তারা। ফলে কেউ ঠিকমত এ বানোয়াটগুলো প্রতিষ্ঠিতও করতে পারছে না। আবার যার যার মত রেওয়ায়েত জাল করার কারণে একমতও হতে পারছে না।
পরের ব্যপারটি আরো মজাদার। কারণ মোল্লা বাকের মাজলিসি হায়াতুল কুলুবের মধ্যে ২/৪৯৩ লেখে, আবু হালার ছেলে আবুল আস যয়নাবের স্বামী ছিল।
পাঠক! এখন একটু লক্ষ করুন, আবুল কাসিম কুফি লেখল যয়নাব এবং রুকাইয়া আবু হালার মেয়ে ছিল আর মোল্লা বাকের মাজলিসি লেখল আবু হালার ছেলে আবুল আস যয়নাবের স্বামী ছিল। তাহলে সম্পর্কে কি হয় তারা? আপন ভাই বোন নয় কী!? সাইয়্যেদ নিয়ামাতুল্লাহ জাযায়িরি আনওয়ারুন নুমানিয়্যার মধ্যে ১/১২৪ হযরত যয়নাব, রুকাইয়া ও উম্মে কুলছুম রদিয়াল্লাহু আনহুন্না রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঔরসজাত কন্যা কিনা, সেটা নিয়ে উলামাদের মতবিরোধ রয়েছে বলেছে, সে জন্য কি এ পর্যায়ের মতবিরোধ যে কাউকে তার আপন ভাই বোনের মধ্যে বিয়ে দিয়ে দিবে? রেওয়ায়েত জাল করবে ঠিক, কিন্তু সেটা কি এ পর্যায়ের? মানুষ তো অন্তত জাতে মাতাল হলেও তালে ঠিক থাকে, কিন্তু এসব শিয়া মুহাদ্দিসরা তো তালেও মাতাল ছিল। ফলে কে কাকে নিয়ে কি বলত, তারও কোনো খবর থাকত না। এমনকি কোন রেওয়ায়েত কোনদিকে গেল সেটা ভাবারও ফুরসৎ পেত না।
এখন আসি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঔরষজাত চার মেয়ের ব্যপারে:
প্রথমত এ সম্পর্কে আমি পবিত্র কুরআনুল কারিমের একটি আয়াত পেশ করব অতঃপর শিয়াদের কিতাব থেকেই সুম্পষ্ট ইবারতের মাধ্যমে এর প্রমাণ পেশ করব ইন শা আল্লাহ।
আল্লাহ তাআলা সুরা আহযাবের ৫৯ নাম্বার আয়াতে বলেন:
يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ
অর্থ: হে নবি! আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেনো তাদের চাদরের কিয়াদংশ নিজেদের ওপর টেনে নেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদের উত্যাক্ত করা হবে না।
এ আয়াত দ্বারা সুস্পষ্টত এটাই প্রতিয়মাণ হয় যে, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক মেয়ে নয় বরং একাধিক। কারণ এখানে “أَزْوَاج” তথা স্ত্রীগণ শব্দটি বহুবচন উল্লেখের সঙ্গে “بَنَات” তথা মেয়েগণ শব্দটিও বহুবচন এনেছেন। আর উভয়টিই “ل” হরফে জর থেকে আতফ হয়েছে এবং “ك” এ খিতাব দ্বারা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করেছে। যার দ্বারা স্পষ্টত বুঝা যায় যে, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যেমন একাধিক স্ত্রী ছিল, তেমন একাধিক কন্যাও ছিল।
এখন দেখি শিয়াদের কিতাবে এ ব্যপারে কি লেখা আছে:
ইবনে শহর আশুব মানাকিবে আলে আবি তালিবের মধ্যে ১/১৪০ রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তানদের বর্ণনায় লেখে:
أولاده : ولد من خديجة القاسم و عبد الله وهما : الطاهر والطيب ، وأربع بنات : زينب ، ورقية ، وام كلثوم وهي آمنة ، وفاطمة وهي ام أبيها
এখানে সুস্পষ্টভাবে খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার গর্ভ থেকে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চার মেয়ের কথা উল্লেখ করল। অতঃপর তাদের কার সাথে কার বিবাহ হয়েছিলি এবং কার কয়টি সন্তান হয়েছিল, সেটা উল্লেখের পর লেখে “ولا عقب للنبي إلا من ولد فاطمة” হযরত ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু আনহার সন্তান ব্যতিত অন্য কারো থেকে তাঁর বংশের ব্যপ্তি ঘটে নি।
শায়েখ সুদুক কিতাবুল খিসালের মধ্যে ৩৭৫ লেখে:
ان خدیجة رحمهاﷲ و لدت منی طاهر وهو عبدﷲ هو المطهر و ولدت منی القاسم وفاطمة ورقیة وام کلثوم وزینب
এখানেও সুস্পষ্ট চার মেয়ের কথা উল্লেখ করল।
হায়াতুল কুলুবের মধ্যে ২/৯১ মোল্লা বাকের মাজলিসি “چہار دختراز وبرائے حضرت آورد زینب و رقیہ ام کلثوم وفاطمہ” দ্বারা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চার মেয়ের কথা স্পষ্ট করল।
অথচ আগেই কিন্তু আমরা এই বাকের মাজলিসির কিতাবে রুকাইয়া এবং উম্মে কুলসুম রাদিয়াল্লাহু আনহুমাদের আবু হালার মেয়ে লেখেছে দেখেছিলাম। আবার এই রুকাইয়া রাদিয়াল্লাহু আনহাকেই কিন্তু শায়েখ তবরাসি তাফসিরে মাজমাউল বয়ানের মধ্যে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঔরসজাত কন্যা লেখেছিল। যেখানে সে প্রথম হাবশায় হিজরতকারী ১১ পুরুষ ও চার মহিলার কথা উল্লেখ করতে গিয়ে “وهم عثمان بن عفان وامرأته رقية بنت رسول الله” লেখেছিল।
আবার সে-ই তাজুল মাওয়ালিদের মধ্যে (পৃ.-৮) রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সন্তান সন্ততির বর্ণনা দিতে গিয়ে লেখে:
كان لرسول الله عليه التحية والسلام ولد له سبعة اولاد من خديجة ابنان واربع بنات : القاسم وعبد الله وهو الطاهر والطيب ، وفاطمة صلوات الله عليها وزينب و ام كلثوم ورقية ، وولد له ابرهيم من مارية القبطية . اما فاطمة ع فتزوجها امير المؤمنين على بن ابي طالب عليه السلام امر الله تبارك وتعالى نبيه
এখানেও সুস্পষ্টভাবে রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাত সন্তান, যার ৬জন খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহা থেকে জন্মগ্রহণ করেন এবং যয়নাব, রুকাইয়া ও উম্মে কুলছুম রাদিয়াল্লাহু আনহুন্না তাদেরই অন্তর্ভূক্ত বলে উল্লেখ করে। এমনকি তাদের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য হাদিসের কিতাব উসুলুল কাফির ১/১৪৭ মধ্যেও এই কথার উল্লেখ রয়েছে।
আমার ক্ষুদ্র মুতালা মতে যদি রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঔরসজাত চার মেয়ের বর্ণনাগুলোই শিয়াদের গ্রন্থ থেকে একত্রিত করা হয়, তবে মোটামুটি পর্যায়ের একটা কিতাব হয়ে যাবে। যা হুকুমের দিকে মুতাওয়াতির পর্যায়েই সাব্যস্ত হবে। শুধু লেখা দীর্ঘ হওয়ার ভয়ে সেগুলো ছেড়ে দিলাম। তবুও যতটুকুন উল্লেখ করলাম, এরদ্বারা কি রাসুলে কারম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এক মেয়ে; এটা মিথ্যা প্রতিপন্ন হয় না? তাদের কিতাবেরই এতসব বর্ণনা দ্বারা চার মেয়ের কথা সাব্যস্ত হয় না? এরপরও যদি কারো সন্দেহ থাকে, তবে চ্যালেঞ্জ করুন; ইন শা আল্লাহ আমি অসংখ্য রেওয়ায়েত বের করে দিব। এখন আমি জিজ্ঞেস করি, রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেয়ের জামাতা কি কোনোদিন কাফির হতে পারেন? তিনি কি ফিরাউনের চেয়েও নিকৃষ্ট হতে পারেন? আপনার জামাতার সম্ভ্রান্ত হতে পারে আর রাসুলের জামাতা কি সামান্যতম মর্যাদা পাবার হকদারও হতে পারে না? আপনার জামাতা কটুক্তির উর্ধে থাকে, রাসুলের জামাতা কি কটু কথার বানে জর্জরিত হবে? আপনাদের বারো ইমামতো গায়েব জানত, তাই তারা সবার সব সংবাদসহ মৃত্যু সংবাদ পর্যন্ত বলে দিতে পারত, তবে কি উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহু সম্পর্কে রাসুল কিছুই জানতেন না? তিনি কি ইমামদের চেয়েও নিম্মস্তরের? একটু চিন্তে করুন। ঠাণ্ডা মাথায় সামান্য ভাবুন। আল্লাহ তাআলা আমাদের হেদায়েত দান করুন।


Leave a comment