মেনু

শিয়াবাদ কি ও কেনো?- আব্দুল্লাহ ইবনু সাবা

লেখকঃ মাহদি হাসান কাসেমি (ঈষৎ পরিমার্জিত)

পাঠক! ‘শিয়া মতবাদ সৃষ্টির প্রেক্ষাপট ও সূচনা’ অধ্যায়ে যা কিছু বর্ণনা করবো এর সবটাই শিয়াদের নির্ভরযোগ্য সব গ্রন্থে বিদ্যমান। আসুন এখন শিয়া গ্রন্থের আলোকেই আবদুল্লাহ বিন সাবাকে পরিমাপ করি।

চতুর্থ শতাব্দীর প্রসিদ্ধ শিয়া ইতিহাসবিদ আবু আমর ইবনু আবদিল আজিজ আল-কাশশি; যার সম্পর্কে শিয়া আলিমদের মত হলো: তিনি নির্ভরযোগ্য আলিম, বিশুদ্ধ আকিদাসম্পন্ন মুস্তাকিমে মাযহাব বা দৃঢ় ধর্মবীদ ছিলেন। এবং ইলমুর রিজাল বা রিজাল শাস্ত্র সম্পর্কে বুনিয়াদি হাইসিয়াত রাখতেন। যার রচিত গ্রন্থ ‘মা’রেফাতুন নাকিলিন আনিল আইম্মাতিস সাদিকিন’ সম্পর্কে ‘ইখতিয়ারু মারিফাতির রিজাল’ গ্রন্থের ভূমিকায় রিজাল শাস্ত্রে মূল পাঁচ কিতাবের প্রথম নাম্বার হিসেবে আখ্যায়িত করে। যেটা রিজালুল কাশশি নামেও প্রসিদ্ধ; তিনি সে গ্রন্থে লেখেন:

‘কতক আহলে ইলম থেকে বর্ণিত: আবদুল্লাহ ইবনু সা’বা ইহুদি ছিলো। অতঃপর সে মুসলমান হয়ে হযরত আলি আলাইহিস সালামের মুহাব্বতের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে লাগলো। এবং (ইহুদি অবস্থায়) ইউসা ইবনু নুন সম্পর্কে তার যে আকিদা ছিলো, আলি আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রেও সে আকিদা পোষণ করতে লাগলো। সেই সর্ব প্রথম ব্যক্তি, যে আলি আলাইহিস সালামের ইমামত ফরয হওয়ার প্রবক্তা। সে সঙ্গে তার বিরোধীদের থেকে নিজেকে মুক্ত দাবি করত: তাকফির বা কাফির সাব্যস্ত কারী। এজন্যই বিরোধীরা বলে যে, শিয়াবাদ ইহুদিবাদ থেকে নির্গত। (১)

একই রেওয়ায়েত আবু জাফর তুসি, হাসান ইবনু মুসা নওবাখতি ও নিয়ামাতুল্লাহ জাযায়িরিও উল্লেখ করেছে। (২)

শিয়া ইমাম হাসান ইবনু মুসা আবু মুহাম্মদ আন-নাওবাখতি; (যার সম্পর্কে শিয়া রিজাল শাস্ত্রের প্রসিদ্ধ ইমাম আবুল আব্বাস আহমাদ ইবনু আলি আন-নাজাশি তার প্রসিদ্ধ গ্রন্থ (যেটা শিয়া রিজালশাস্ত্রের উসুলে আরবায়া বা মৌলিক চার গ্রন্থের একটি(৩))-এ লেখে: হাসান ইবনু মুসা আবু মুহাম্মদ আন-নাওবাখতি অনেক বড় শিয়া মুতাকাল্লিম এবং সমকালীনদের উপর কতৃত্বকারী গ্রহণযোগ্য আলিম ছিলেন।(৪) আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনু হাসান আত-তুসি লেখে: ‘আবু মুহাম্মদ নওবাখতি বড় দার্শনিক ও বিশুদ্ধ আকিদা সম্পন্ন শিয়া আলিম ছিলো।’ (৫) আর নুরুল্লাহ তাসতারি লেখে: ‘নাওবাখতি শিয়া ফিরকবার আকাবিরদের অন্তর্ভূক্ত। সে অনেক বড় আলিম ও দার্শনিক ছিলো।’(৬));- সে স্বীয় গ্রন্থ ফিরাকুশ শিয়া-তে লেখে:

“আবদুল্লাহ ইবনু সাবা আবু বকর, উমার, উসমান এবং অন্যান্য সাহাবাদের গালিগালাজ ও অভিসম্পতের সূচনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত ছিলো। সে লোকদের বলতো: আলি আলাইহিস সালাম তাকে এমনটা করার নির্দেশ দিয়েছেন। হযরত আলি যখন এটা জানতে পারলেন, তখন তাকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিলেন। সুতরাং তাকে গ্রেফতার করে আনা হলো। এবং এ কথার স্বীকরক্তির উপর হযরত আলি তাকে হত্যা করার নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তার সাথীরা চিৎকার দিয়ে উঠলো এবং বললো: আমিরুল মুমিনিন, আপনি এমন ব্যক্তিকে কেনো হত্যা করছেন, যে লোকদের আপনার আহলে বাইতের মুহাব্বাতের দিকে ডাকে? এরপর আলি রাদিয়াল্লাহু আনহু তাকে দেশান্তর করে ইরানের শহর মাদায়েনে পাঠিয়ে দেন।” (৭)

নাওবাখতি উল্লেখ করে: আবদুল্লাহ ইবনু সাবার কাছে যখন মাদায়েনে আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যার সংবাদ পৌঁছে, সে সংবাদদাতাকে বলে: তুমি মিথ্যা বলছো। যদি তুমি তাঁর শরীরের সত্তর টুকরাও উপস্থিত করো আর সত্তর জন প্রত্যক্ষদর্শী এর সাক্ষ্য দেয়, তবুও আমি বলবো তিনি ইন্তেকাল করেন নি। (কেননা আমার আকিদা হলো) যতক্ষণ অবধি তিনি পুরো দুনিয়া কব্জা না করবেন, মৃত্যুবরণ করবেন না। (৮)

হিজরি এগারোতম শতাব্দীর শিয়া মুহাদ্দিস ও ফকিহ সাইয়্যেদ নিয়ামাতুল্লাহ আল জাযায়েরি; যার সম্পর্কে রওযাতুল জান্নাত গ্রন্থকার সাইয়্যেদ মুহাম্মদ বাকের খুনসারি বলে: ‘নিয়ামাতুল্লাহ জাযায়িরি মুতায়াখখিরিন ওলামাদের মধ্যে অনেক বড় ব্যক্তিত্ব, জ্ঞানীদের সর্দার এবং আরবি আদব, ফিকাহ ও হাদিসের ক্ষেত্রে বাহরুল উলুম ও যুগের একক ব্যক্তিত্ব।’ আর এগারো শতাব্দির বড় মুহাদ্দিস ও শিয়াদের শাইখুল ইসলাম খ্যাত আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান ইবনু আলি আল-হুররুর আমিলি (মৃত. ১১০৪) স্বীয় ‘আমালুল আ’মাল’ গ্রন্থে লেখে: সাইয়্যেদ নিয়ামাতুল্লাহ ইবনু আবদিল্লাহ আল হুসাইনি আল জাযায়িরি একজন জ্ঞানী আলেম, যুগশ্রেষ্ঠ মুহাক্কিক ও সমকালীন মহান শিক্ষকদের অন্তর্ভূক্ত’।

জাযায়েরি লেখে: ইবনু সাবা বলে, আলি আলাইহিস সালাম মৃত্যু বরণ বা হত্যা হতে পারে না। ইবনু মুলজিম আলির সুরাতে শয়তানকে হত্যা করেছে। আলি আলাইহিস সালাম তো মেঘের মধ্যে। বজ্রধ্বনী তাঁর আওয়াজ। বিদ্যুৎচমক তাঁর আলো। এরপর তিনি যমিনে অবতরণ করবেন এবং ন্যায় ও ইনসাফ দ্বারা ভরে দিবেন। তারা বজ্রপাত শুনলে বলে: হে আমিরুল মুমিনিন! আপনাকে সালাম। (৯)

হিজরি নবম শতাব্দীর শিয়া ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবনু খাওন্দশাহ স্বীয় ‘রওযাতুস সাফা’-গ্রন্থে লেখে: ‘আবদুল্লাহ ইবনু সাবা যখন জানতে পারলো যে, মিসরে উসমান ইবনু আফফানের মুখালিফিন বা বিরোধীরা রয়েছে, তখন সে মিসর চলে গেলো। সেখানে সে বাহ্যিক তাকওয়ার পোষক পড়লো এবং সুফি বেশ ধরলো। এভাবে যখন কিছু সহচর পেয়ে গেলো, তখন স্বীয় চিন্তাধারা প্রচার করা শুরু করলো। সে বললো: প্রত্যেক নবিরই একজন ওয়াসি এবং নায়েব হয়ে থাকে। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওয়াসি ও নায়েব আলি। সে এটাও বলেছে যে, এ উম্মত আলির উপর যুলুম করেছে। তার খিলাফত আত্মসাৎ করেছে। সে খিলাফতের হকদার ছিলো কিন্তু তাঁর অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। আর আত্মসাৎকারী আবু বকর ও উমার। আর এখন সে আত্মসাৎকারী উসমান। কাজেই তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে হযরত আলির কাছে বাইয়াত গ্রহণ করা আমাদের উপর ফরয। কিছু মিসরি তার কথায় প্রভাবিত হয়ে তার সাথী হয়ে গেলো এবং উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঘোষণা দিলো। (১০)
এমন আরো অনেক বর্ণনা রয়েছে। আশা করি এই হাওয়ালাগুলোই যথেষ্ঠ হবে। এখান থেকে আমরা কয়েকটা বিষয় বুঝতে পারি:

১. আবদুল্লাহ ইবনু সাবা ইহুদি ছিলো। সে কেবল মুসলমানদের মধ্যে বিচ্ছেদ ও বিভ্রান্তির জন্যই ইসলাম গ্রহণ করেছিলো।
২. সেই উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুর হত্যাকারী ও বিদ্রোহীদের হোতা। এবং হত্যার পরবর্তী ফিতনার জন্য দায়ি।
৩. জঙ্গে জামাল ও জঙ্গে সিফফিনে আপোষ না করে মুসলমানদের মধ্যে খুনাখুনি ও রক্তারক্তি ঘটানোর মূল ষড়যন্ত্রকারী।
৪. সেই সর্বপ্রথম ইসলামে ওয়াসি ও ইমামতের প্রবক্তা। যেটা একমাত্র ইহুদি আকিদা। যার আগে এই উম্মাহ এ সম্পর্কে কিছুই জানতো না।
৫. সেই প্রথম ব্যক্তি, যে সাহাবাদের বিশেষত আবু বকর, উমার ও উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের তাকফির করত: আত্মসাৎকারীরূপে সাব্যস্ত করেছে।
৬. সেই প্রথম রজআত বা পুনর্জনমের প্রবক্তা। যেটা পাক্কা মাজুসি ও ইহুদি আকিদা।
৭. সেই সর্ব প্রথম আলি রাদিয়াল্লাহুর ব্যপারে বাড়াবাড়ি বশত তাকে আল্লাহ বলে সাব্যস্ত করেছে। এবং পুরো দুনিয়া কতৃত্বের আগে তার ইন্তেকাল হতে পারে না বলে দাবি করেছে। যেটা ফিরকা ভিন্নতায় ইমামিয়াদের বারোতম ইমামের ক্ষেত্রে পোষণ কৃত আকিদার একটা রূপ মাত্র। যে পুরো দুনিয়া কতৃত্ব করতেই গুহা থেকে বেরোবে।

পাঠক! তাহলে একটা প্রশ্ন জাগে, আবদুল্লাহ বিন সাবা এগুলো কেনো করেছে? এর পিছনের কারণ কি? আসুন এখন সে কারণগুলোই নির্ণয় করি।

  • এটা তো প্রমাণ হলো যে, সেই সর্বপ্রথম ওয়াসি, খিলাফত, ইমামত ও সাহাবাদের তাকফিরের প্রবক্তা। সে এক্ষেত্রে পোলসের আদর্শকেই গ্রহণ করেছে। সে যেমন খ্রিস্টানদের প্রিয় ব্যক্তি ঈসা আলাইহিস সালামের ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি করেছিলো, তেমনি ইবনু সাবা আলি রাদিয়াল্লাহু আনহুর ব্যপারে বাড়াবাড়ি করেছিলো। আর এই বাড়াবাড়ির ফল ছিলো ইসলামে বর্ণিত বিধানকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা।
  • হযরত আবু বকর, উমার ও উসমান রাদিয়াল্লাহু আনহুমদের যুগে যেহেতু কুরআন সংকলিত হয়েছিলো, আর তারা সর্বপ্রচেষ্টার মাধ্যমে কুরআন হিফাযত করত: তা একত্রিত করেছিলেন, তাই তাদের মিথ্যা প্রতিপন্ন করা। কারণ তাদের মিথ্যা বানাতে পারলে কুরআন মিথ্যা হয়ে যাবে আর ইসলামও সন্দেহপূর্ণ হয়ে যাবে।
  • তাছাড়া এই তিন যুগেই যেহেতু ইসলাম সবচেয়ে বেশি বিস্তার হয়েছে এবং ইহুদি, খ্রিস্টান ও মাজুসিদের ভূমি দখল করত: তাদের সিংহাসন উপড়ে দিয়েছে, তাই সে অন্তর্জালা মিটানো।
  • ইসলামের দ্বিতীয় স্তম্ব হাদিস বা রাসুলের বাণী। যা আমাদের কাছে পৌঁছানোর একমাত্র মাধ্যম সাহাবায়ে কিরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তাদেরকে যদি কাফির ও সন্দেহপূর্ণ প্রমাণ করা যায়, তখন রাসুলের বাণী বলতে পৃথিবীতে কিছুর অস্তিত্ব থাকবে না। তখন ইসলাম আবির্ভাবকারী মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহর দ্বীনও দুনিয়াতে থাকবে না। এ জন্যই তো শিয়ারা রাসুলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোনো হাদিস মানে না এবং বিধি বিধান সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে তার বাণীকে দলিল হিসেবে সাব্যস্ত করে না। এ ক্ষেত্রে ইমামদের বাণীই মূল দলিল। মূলত এরদ্বারা তারা এটাই প্রমাণকারী যে, ইসলামে রাসুলের বাণীর কোনো হাইসিয়াত নেই। এমনকি তা অসম্পূর্ণও। নতুবা তার আনীত দ্বীনের বিধান সাব্যস্ত করণের ক্ষেত্রে অন্য কারো বাণী দলিল হতে পারে কী! যা তার বাণীর সাথে পুরোপুরিই সাংঘর্ষিক!

_________________________________________________________________

সুত্র.

১. রিজালুল কাশশি লি আবি আমর ইবনি আবদিল আজিজ: ১৬, প্র. মুয়াসসাসাতুল আ’লামি, কারবালা, ইরাক।
২. ইখতিয়ারু মা’রিফাতির রিজাল আল মারুফ বি- রিজালিল কাশশি লি আবি জাফর আত-তুসি: ১০৩ মুয়াসসাতুন নাশরিল ইসলামি, কুম, প্র. ১৪২৭ হি., ফিরাকুশ শিয়া: ৫৭, মানসুরাতুর রিযা, বাইরুত, আনওয়ারুন নুমানিয়্যা: ২/২০৫, মুয়াসসাসাতুল আ’লামিল মাতবুয়াত, বাইরুত, প্র. ২০১০।
৩. রিজালুন নাজাশি: ১/৩৬০, প্র. বুসতানে কিতাব, কুম।
৪. রিজালুন নাজাশি, মুকাদ্দামাতুত তাহকিক: ১/৫৭
৫. ফিহরিস্ত লিত-তুসি: 71, মাতবায়াতুল হায়দারিয়া, নাজফ, প্র. ১৯৬১
৬. মাজালিসুল মু’মিনিন: ১৭৭ হাওয়ালা ইহসান ইলাহি জহির রহি.-এর আশ-শিয়া ওয়াস সুন্নাহ থেকে গৃহিত।
৭. ফিরাকুশ শিয়া: ৫৭, মানসুরাতুর রিযা, বাইরুত।
৮. ফিরাকুশ শিয়া: ৫৮, মানসুরাতুর রিযা, বাইরুত।
৯. আনওয়ারুন নু’মানিয়্যাহ: ২/২০৫ মুয়াসসাসাতুল আ’লামিল মাতবুয়াত, বাইরুত, প্র. ২০১০।
১০. রওযাতুস সাফা (ফারসি): ২/২৯২, ইহসান ইলাহি জহির রহিমাহুল্লাহর আশ শিয়া ওয়াস সুন্নাহ থেকে গৃহিত।



Leave a comment