মুহাম্মাদ ইবনে জারির ইবনে রুস্তম আত-তাবারী (ইবনে রুস্তম আত-তাবারী)

মুহাম্মাদ ইবনে জারির ইবনে রুস্তম আত-তাবারী ছিলেন কুখ্যাত ইসনা আশারিয়া (Twelver) শিয়া পণ্ডিত, যিনি ৯ম-১০ম শতাব্দীতে (খ্রিস্টীয়) সক্রিয় ছিলেন। তিনি উত্তর ইরানের কাস্পিয়ান সাগর সংলগ্ন তাবারিস্তান অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। একই “আত-তাবারী” উপাধিধারী অন্যান্য পণ্ডিত থাকায় সাধারণ মুসলিমরা কখনো কখনো এই কুফরী মতবাদ প্রচারকারী শিয়া রুস্তম আত-তাবারীকে ইসলামের মহান পন্ডিত মনে করেন। আসলে এই তাবারী হলো কুফরী মতবাদের প্রচারক।


জীবন ও পটভূমি:

১. উৎস:

  • জন্মস্থান: তাবারিস্তানের আমোল শহরে (একটি বুদ্ধিবৃত্তিক কেন্দ্র)।
  • পারিবারিক নাম: তাঁর পিতার নাম রুস্তম, যা তাবারিস্তানের ইসলামায়নের পরেও প্রচলিত পারস্য সাংস্কৃতিক প্রভাব নির্দেশ করে।

২. সময়কাল:

  • তিনি ৩য়-৪র্থ হিজরি শতাব্দীর শেষভাগে (খ্রিস্টীয় ৯ম-১০ম শতাব্দীর শুরু) বাস করতেন।
  • মৃত্যু: আনুমানিক ৩২৯ হিজরি (৯৪০-৯৪১ খ্রিস্টাব্দ), তাঁর বর্ণনাকারীদের (যেমন: হাসান ইবনে হামজা আত-তাবারী, মৃত্যু ৩৫৮ হিজরি/৯৬৮-৯৬৯ খ্রি.) জীবনকালের ভিত্তিতে।

৩. ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:

  • তাঁর সময়ে তাবারিস্তানে ‘আলাভি জাইদি রাজবংশ (২৫০-৩১৬ হিজরি/৮৬৪-৯২৮ খ্রি.) শাসন করত, তবে তিনি শাসকদের জাইদি শিয়া মতবাদের পরিবর্তে ইসনা আশারিয়া শিয়া হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
  • এই অঞ্চল তখন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রাণচাঞ্চল্য ও মতাদর্শিক বৈচিত্র্যের কেন্দ্র ছিল।

৪. ব্যক্তিগত তথ্যের স্বল্পতা:

  • তাঁর শিক্ষা বা ভ্রমণ সম্পর্কে খুব কম জানা যায়। মুনতাজাব আল-দীন আল-রাযী-র তারিখ আল-রেয়-এ রে (তেহরানের নিকটবর্তী) শহরে তাঁর এক সফরের উল্লেখ রয়েছে।
  • তাঁর রচনাগুলো সীমিত পরিসরে প্রচারিত হওয়ায় তিনি অন্যান্য তাবারী পণ্ডিতদের তুলনায় কম পরিচিত।

রচনাবলি:

১. আল-মুস্তারশিদ ফী আল-ইমামাহ (الْمُسْتَرْشِدُ فِي الْإِمَامَةِ):

  • এটি তাঁর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ রচনা, যা ইসনা আশারিয়া শিয়া মতানুসারে ইমামতের ধারণা (১২ ইমামের ঐশ্বরিক নেতৃত্ব) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে লিখিত।
  • এই গ্রন্থ নাজাফ থেকে প্রকাশিত হয় (সঠিক তারিখ অজানা) এবং শিয়া পণ্ডিত আল-নাজাশী (মৃ. ৪৫০ হিজরি/১০৫৮ খ্রি.) ও আল-তুসী (মৃ. ৪৬০ হিজরি/১০৬৭ খ্রি.) কর্তৃক উদ্ধৃত হয়েছে।

২. বিতর্কিত রচনাসমূহ:

  • আল-ফাজিহ (الْفَضِيحِ): ইবনে শাহরাশুব (মৃ. ৫৮৮ হিজরি/১১৯২ খ্রি.) এই রচনার উল্লেখ করলেও এর অস্তিত্ব নিশ্চিত নয়।
  • দালাইল আল-ইমামাহ (دَلَائِلُ الْإِمَامَةِ): পূর্বে তাঁকে এই গ্রন্থের লেখক মনে করা হত, কিন্তু আধুনিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে এটি পরবর্তীকালের অন্য একজন মুহাম্মাদ ইবনে জারির আত-তাবারী-র রচনা। এতে ৩৯৫ হিজরি (১০০৪-১০০৫ খ্রি.)-র মতো তারিখ উল্লেখ রয়েছে, যা তাঁর মৃত্যুর পরের সময়।

শিক্ষাগত পরিচয়:

১. ইসনা আশারিয়া শিয়া মতাদর্শ:

তিনি ১২ ইমামের প্রতি অটল বিশ্বাসী ছিলেন এবং ইমামতের ধর্মতাত্ত্বিক ভিত্তি নিয়ে কাজ করেছেন। ইসলামের মহান পন্ডিত ইবনে হাজার আল-আসকালানী (মৃ. ৮৫২ হিজরি/১৪৪৯ খ্রি.) তাঁকে “মু’তাজিলি” বলে অভিহিত করছেন।

২. কাজের পরিধি:

  • তাঁর রচনাগুলো ইমামতের ধর্মতত্ত্বে সীমাবদ্ধ ছিল, যা অন্যান্য তাবারী পণ্ডিতদের মতো ব্যাপক ইতিহাস বা তাফসিরচর্চা থেকে ভিন্ন।

অন্যান্য “আত-তাবারী” পণ্ডিতদের সাথে পার্থক্য:

১. মুহাম্মাদ ইবনে জারির ইবনে ইয়াজিদ আত-তাবারী (মৃ. ৩১০ হিজরি/৯২৩ খ্রি.):

  • পরিচয়: সুন্নি বহুশাস্ত্রজ্ঞ, তাফসির আল-তাবারী (কুরআনের ব্যাখ্যা) ও তারিখ আল-রুসুল ওয়া আল-মুলুক (ইতিহাসগ্রন্থ)-র লেখক।
  • পার্থক্য:
    • মতবাদ: সুন্নি (শাফিঈ মাযহাব)।
    • সময়: ইবনে রুস্তমের আগে মৃত্যুবরণ করেন।
    • খ্যাতি: সমগ্র ইসলামিক বিশ্বে সুপরিচিত।

২. মুহিব্ব আল-দীন আহমাদ ইবনে আবদুল্লাহ আত-তাবারী (মৃ. ৬৯৪ হিজরি/১২৯৫ খ্রি.):

  • পরিচয়: মক্কাভিত্তিক শাফিঈ ফকিহ ও ইতিহাসবিদ।
  • পার্থক্য:
    • মতবাদ: সুন্নি (শাফিঈ)।
    • সময়: ১৩শ শতাব্দীতে সক্রিয়।
    • কাজের ক্ষেত্র: ফিকহ ও মক্কার ইতিহাস।

৩. দালাইল আল-ইমামাহ-র লেখক “তৃতীয়” অজ্ঞাত আত-তাবারী:

  • পরিচয়: ১১শ শতাব্দীর (৪০০ হিজরি/১০০৯ খ্রি.-পরবর্তী) এক অজ্ঞাতনামা শিয়া পণ্ডিত।
  • পার্থক্য: ইবনে রুস্তমের মৃত্যুর পর সক্রিয় ছিলেন।


Leave a comment