মোত’আ বিয়ে কি হালাল নাকি পতিতাবৃত্তি?

ইরানী রাফেজী মোল্লারা বলে বেড়ায়: “আল্লাহতালা ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোত’আ বিবাহকে হালাল (অনুমতিপ্রাপ্ত) করেছেন, সেটাকে আমিরুল মু’মিনিন বলে দাবিদার , উমর ইবনে খাত্তাব নিষিদ্ধ করেন, অথচ মোত’আ বিবাহকে নাকি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালাল করেছেন এবং কুরআন ও সুন্নাহতে (আদিষ্ট বলে) ঘোষিত হয়েছিলো। এই রাফেজী শিয়াদের মতে আল্লাহতালার আদেশের বিরোধিতা করে উমর ফারুক রা নাকি খলিফা হওয়ার যোগ্যতা হারিয়েছেন!! এমনকি উমর ফারুক রা কে নাকি মুসলমান ও বলা যায় না এই কারণে। পাঠক চিন্তা করুন এই রাফেজীদের আল্লাহ বিরোধীতা কোন পর্যায়ে গিয়েছে যে আমিরুল মুমিনীন উমর ফারুক রা কে মুরতাদ পর্যন্ত বলছে (নাউজুবিল্লাহ)। চলুন পাঠক এখন শিয়া মুলহিদদের মুতয়া বিয়ে আলোচনা করি।

ইবনে মাজাহ -এর প্রসিদ্ধ ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণত আছে, খলীফা হিসেবে হযরত উমর ফারুক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ আমাদের জন্য তিনবার মৃত্যু’আ বিবাহক হালাল করেন, আর তিনবার হারাম করেন। ওয়াল্লাহি (আল্লাহর শপথ), আমি যদি শুনতে পাই কোনো বিবাহিত পুরুষ তার গৃহে কোনো নারীক মোত’আ বিয়ে দ্বারা বন্দি করে রেখেছে, তাহলে আমি ইসলামী রজমের বিধান বলবৎ করবো এবং তাকে পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করবো।’ খলীফার এই মন্তব্যে তিনি মৃত্যু’আ বিবাহ নিষিদ্ধ করেছিলেন মর্মে তথ্য প্রকাশ পায় না। বরং এতে প্রতীয়মান হয় তিনি মৃত্যু’আ বিয়েকে অনুমতি দেননি এ কারণে যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম সেটাকে নিষিদ্ধ করেছিলেন। সকল সাহাবী-এ-কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম-ই খলীফার এই বক্তব্যকে সমর্থন করেন, ব্যতিক্রম শুধু হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম। তিনি ছাড়া আর কেউই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেননি। আর পরবর্তী পর্যায়ে তিনিও এ ব্যাপারে একমত হন; ফলে এটা আসহাবে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম- এর সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে পরিণত হয়। সহীহ বুখারীতে হযরত আলী রা হতে বর্ণিত হয়েছে-

عَنْ عَلِيٍّ أَنَّهُ سَمِعَ ابْنَ عَبَّاسٍ يَلِينُ فِي مُتْعَةِ النِّسَاءِ فَقَالَ مَهْلًا يَا ابْنَ عَبَّاسٍ فَإِنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْهَا-

তিনি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম-কে বলেন, ‘তুমি ভুল করেছো। আমাদের কছ থেকে আল্লাহর রাসূল(ﷺ) মোত’আ বিয়ে নিষিদ্ধ করেছিলেন।’

হযরত আলী রা- এর এই কথায় হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু-ও এই সিদ্ধান্তের সাথে একমত ‘পোষণ করেন এবং স্বীকার করেন যে পরবর্তীকাল মোত’আ বিয়েকে হারাম করা হয়েছিল।’

উপরন্তু, মহাদ্দিস সুলাইমান বিন আহমদ তাবারানী এবং সুলাইমান বিন দাউদ তায়্যালিসী হযরত সাদ্দ বিন জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহ-কে উদ্ধৃত করেন, যিনি বলেন: আমি হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম-কে বলি, ‘আমি কখনো বলতে পারতাম না যে মোত’আ নিকাহ ছিলো হালাল; আর আপনারও এ কথা বলা উচিত হয়নি যে এটা হালাল। আপনি কি ভাবতে পারেন এর দৃষ্টান্ত কতখানি ক্ষতি হতে পারে? আপনি যখন বলবেন এটা হালাল, তখন সে কথা সর্বদা প্রচারিত লাভ করবে এবং অন্যরা মোত’আ বিবাহকে ন্যায়সঙ্গত প্রমাণের জন্য আপনার কথাকে দলীল হিসেবে পেশ করবে।’ এ জবাবে হযরত আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম বলেন, ‘এ কথা বলে আমি বোঝাতে চাইনি যে প্রত্যেকের জন্য মোত’আ বিয়ে সব সময়ে হালাল। আমি বলেছি এটা অনুমোদিত ছিলো শর্তসাপেক্ষে জরুরাতের সময়ে, যাতে এর অন্যথা পরিস্থিতি হতে উদ্ভুত অনিবার্য ক্ষতি নিবারণ করা যায়। আমি এই ভেবেই কথাটি বলেছি যেহেতু আল্লাহতাআলা জরুরাতের সময় উদ্ভুত ক্ষতি নিরসনের খাতিরে যতটুকু প্রয়োজন ‘লাশ’ [ইসলামে নিষিদ্ধ পচা বা জবেহ না করা প্রাণির গোস্ত] রক্ত বা শুকরের মাংস খাওয়ার অনুমতি দিয়েছেন, সেভাবে (জরুরাতের মুহূর্তে) মোত’আ নিকাহ অনুমোদিত হওয়া উচিত’। অতএব, এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ হতে বোঝা যায়, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম-এর অভিমত-ও মোত’আ বিয়ে প্রত্যেকের জন্য সর্বদা অনুমতিপ্রাপ্ত হওয়ার পক্ষে ছিলো না। তার মতামত ছিলো এটা কেবল জরুরাতের সময়েই জায়েয, যাতে আনিবার্য ক্ষতি নিবারণ করা যায়, ঠিক যেমনটি অন্যান্য হারাম বিষয়ের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য। পাঠকের জন্য আমরা একটা ঘটনা এখানে বলতে চাই। বাংলাদেশে যখন রানা প্লাজা ধসে পরে তখন ভবনের নিচে আটকে পরা কয়েকজন বাচার জন্য পানি না পেয়ে নিজেদের মূত্র পান করেছিলেন কেঊবা উপরের তলা থেকে চুইয়ে পরা রক্ত পান করেছিলেন। আপনারা অনলাইনে সেইসব লোকদের বক্তব্য আশা করি এখনও পাবেন। আধিকন্তু, মুহাদ্দিস আবু বকর আহমদ বিন হুলাইল বায়হাকী স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম নিজের এতদসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছিলেন। ইমাম তাবারানী রহমতুল্লাহি আলাইহি এবং ইমাম বায়হাকী রহমতুল্লাহি আলাইহি-ও বর্ণনা করেন যে হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘মোত’আ বিবাহ ইতিপূর্বে হালাল ছিলো। কিন্তু তা নিষিদ্ধ হয়ে যায় যখন সূরা নিসার ২৩ নং আয়াত অবতীর্ণ হয় “। অন্যত্র আল্লাহ বলেন-

অবশ্যই সফলকাম হয়েছে মুমিনগণ, যারা তাদের সালাতে ভীতি-অবনত, আর যারা আসার কর্মকাণ্ড থেকে থাকে বিমুখ এবং যারা যাকাত দানে সক্রিয় আর যারা নিজেদের যৌনাঙ্গকে রাখে সংরক্ষিত নিজেদের স্ত্রী বা অধিকারভুক্ত দাসীগণ ছাড়া, এতে তারা হবে না নিন্দিত[ সূরা মুমিনূনঃ ১-৬]

সূরা মুমিনূনের ৬ নং আয়াতে এ বিষয়টির প্রতিই গুরুত্বারোপ করা হয়েছে যে মোত’আ বিয়ে হারাম। কেননা এ আয়াতটি থেকেই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে যে স্ত্রীবৃন্দ ও অধিকারভুক্ত দাসীগণই শুধু হালাল আর অন্যান্য হারাম।

“মোত’আ বিয়ে যে হারাম তা হযরত আলী রা-সহ অধিকাংশ আসহাবে রাদিয়াল্লাহু আনহুম-ই বর্ণনা করেছেন। সহীহে বুখারী আছে, ‘হযরত আলী রা হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুম-কে জানালেন-’

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ مُتْعَةِ النِّسَاءِ يَوْمَ خَيْبَرَ وَعَنْ لُحُومِ الْحُمُرِ الإِنْسِيَّةِ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খাইবারের যুদ্ধে সময় মোত’আ বিয়ে ও গাধার গোশত নিষিদ্ধ করেছিলেন।

অপর পক্ষে, সহীহ মুসলিম ও সুনানে ইবনে মাজাহ -এ বর্ণিত আছে যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেনঃ ওহে মুসলমান সম্প্রদায়! আমি (ইতিপূর্বে) তোমাদেরকে মোত’আর মাধ্যমে নারীদের বিয়ে করার অনুমতি দিয়েছিলাম। কিন্তু আল্লাহতা’লা এখন তা হারাম করেছেন। কেউ এই ধরনের কোনো নারীকে রেখে থাকলে তাকে ছেড়ে দেয়া উচিত এবং তাকে দানকৃত সম্পত্তিও ফেরত নেয়া উচিত নয়!’ সহীহ বুখারী ও মুসলিমে আরো লিপিবদ্ধ আছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মোত’আ বিয়ে তিনবার হালাল করেন এবং তিনি তা তিনবার হারাম করেন’

যদি রাফেজী মুলহিদদের প্রশ্ন করা হয়ঃ “মোত’আ’র মাধ্যমে বিবাহিত নারী কি পুরুষটির উত্তরাধিকারী হতে পারবে? আর ধরা যাক, এই নারীর গর্ভে ওই পুরুষের ছেলেমেয়ে হলো; এমতাবস্থায় বাচ্চারা কি তাদের বাবার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার পাবে?”

রাফেজী ফকহ অনুযায়ী জবাব হবেঃ “না, তারা ওয়ারিশ হতে পারবে না।”

অতঃপর আমরা মুসলিমরা বলিঃ “তাহলে এই নারী কোনো স্ত্রী-ই নয়। মালিকানাধীণ দাসী ও নয়। রাফেজীরা সূরা মুমিনূনের ৬ নাম্বার আয়াত সম্পর্কে কী বলবে যা ঘোষণা করে- ‘ঈমানদারবৃন্দ নিজেদের স্ত্রী ও মালিকানাধীণ দাসী ছাড়া অন্য নারীদের থেকে দূরে সরে থাকে?’ অর্থাৎ, এই আয়াতটি শুধু স্ত্রী ও মালিকানাধীণ দাসী হালাল সাব্যত করে। এটা সুরলভাবে বিবৃত করে যে ওই দুই কিসিম ছাড়া অন্য কোনো নারীতে উপগত হওয়া যাবে না। স্ত্রী বা মালিকানাধীণ দাসী বলা যায় না এমন কোনো নারী, যার সাথে মোত’আ নামের ক্ষণস্থায়ী (বৈবাহিক) চুক্তি হয়েছে, তার সাথে সহবাসকে হালাল মনে করা কুরআন মজীদের স্পষ্ট আদেশের লঙ্ঘন নয় কি?

আর এটা কি প্রকারান্তরে সঠিক পথ হতে বিচ্যুত হওয়ার বেলায় একগুয়ে, ইচ্ছাকৃত ও দাম্ভিক অপপ্রয়াস নয়?

“অধিকন্তু রাফেজীরা এমন সব অযৌক্তিক মন্তব্য করে যার ন্যায্যতা কোনোক্রমেই প্রতিপাদন করা যায় না। যেমন রাফেজীদেরই এক আলেম লিখেছেন যে, মুতার মাধ্যমে এক রাতে বারো জন পুরুষের সাথে যৌন মিলনে রাত হওয়াটা একজন নারীর জন্য জায়েজ, আর যদি এতে তার গর্ভে সন্তান এসে যায়, তাহলে লাটারীর মাধ্যমে শিশুটির পিতা নির্ধারিত হবে। ইসলামের জন্য এর চেয়ে বেশি ক্ষতিকর আর অন্য কোনো অসচ্চরিত্রতা বা শত্রুতা হতে পারে বলুন?”



Leave a comment