আবু মাইসারা
ঘালি শিয়ারা (চরমপন্থী) হচ্ছে তারাই যারা তাদের ইমামদের ব্যাপারে চরম সীমা অতিক্রম করেছিল। তারা ইমামদেরকে সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করেছিল এবং তাদের উপর দৈব গুণাবলী আরোপ করেছিল।[১] কখনও তারা একজন ইমামকে আল্লাহর সাথে সাদৃশ্য করত, আবার কখনও আল্লাহকে মানুষের সাথে সাদৃশ্য করত।[২] এভাবে তারা দুটি চরমপন্থায় পতিত হয়েছিল। ঘালিয়াদের এই ভ্রান্ত ধারণাগুলোর উৎপত্তি হয়েছিল হুলুল (অবতারবাদ) ও তানাসুখ (আত্মার পুনর্জন্ম)-এ বিশ্বাসীদের মতবাদ থেকে, অথবা ইয়াহুদী ও নাসারাদের বিশ্বাস থেকে।[৩] কেননা ইয়াহুদীরা আল্লাহকে মানুষের সাথে সাদৃশ্য করত আর নাসারারা মানুষকে আল্লাহর সাথে সাদৃশ্য করত। এই ধারণাগুলো চরমপন্থী শিয়াদের মনে এত গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল যে তারা তাদের কিছু ইমামের উপর দৈব গুণাবলী আরোপ করেছিল।[৪]
মানুষের আকৃতিতে আল্লাহকে কল্পনা (Anthropomorphism) সর্বপ্রথম শিয়াদের মধ্যে উদ্ভব হয়েছিল এবং পরবর্তীতে কিছু সুন্নিদের মধ্যে তা দেখা গিয়েছিল।[৫] তবে শিয়ারা মুতাজিলা মতবাদের প্রভাবে আসে, যা তারা অধিকতর যুক্তিনির্ভর মনে করে এবং মানুষের আকৃতিতে আল্লাহকে কল্পনা এই আকিদা থেকে সরে আসে কিন্তু তারা হুলুলে (অবতারবাদ) বিশ্বাস করতে থাকে ।[৬]
ঘালিয়াদের বিদ’আত চার প্রকারে সীমিত করা যায়ঃ[৭]
- মানুষের আকৃতিতে আল্লাহকে কল্পনা (Anthropomorphism),
- বাদা (আল্লাহর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন),
- ইমামের প্রত্যাবর্তন (রাজ’আত) এবং
- তানাসুখ (আত্মার পুনর্জন্ম)।
আব্দুল কাদের জ্বিলানী (রহ) ঘালিয়া ফেরকার লোকদের আকীদা সম্পর্কে বলেনঃ[৮]
এই ফেরকার লোকদের আকীদা এই যে, হযরত আলীর (রা:) মর্যাদা সকল নবীদের অপেক্ষা বেশী। তাহাদের মত এই যে, হযরত আলী (রা:) অন্যান্য সাহাবীদের মত যমিনে সমাহিত হন নাই। বরং তিনি মেঘের মধ্যে বিদ্যমান। তিনি সেখানে হইতেই আল্লাহর দুশমনদের সঙ্গে যুদ্ধ করিবেন। শেষ যমানায় আবার তাহার আবির্ভাব ঘটিবে এবং তিনি তখন শত্রুদিগকে হত্যা করিবেন। উহারা আরও বলে যে, হযরত আলী (রা:) এবং ইমামদের কেহই মৃত্যুবরণ করেন নাই বরং ইহারাই সকলেই রোজ কিয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকিবেন। গালিয়া (ঘালিয়া) ফেরকার লোকেরা ইহাও বলে যে, হযরত আলী (রা:) নবী ছিলেন। ফেরেশতা জিবরাঈল অহি পৌঁছাইতে ভুল করিয়া হযরত মুহাম্মদ (দঃ)-এর কাছে উহা পৌঁছাইয়াছেন। এমনকি উহাদের কেহ কেহ এই কথাও বলে যে, হযরত আলী (রা:)ই মাবুদ ছিলেন। (নাউজুবিল্লাহ) এই ফেরকায়ে লোকগণ এই সমস্ত আকীদা এবং কথা দ্বারা ইসলাম হইতে খারিজ হইয়া গিয়াছে। উহাদের উপর সদা সর্বদা আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হইতেছে। উহাদের এই ধরণের আকীদা ও মনোভাব হইতে আল্লাহ্ সকলকে রক্ষা করুন।
ঘালিয়ারা বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন নামে পরিচিত। যেমন ইসফাহানে তারা আল-খুররামিয়া ও আল-কূধিয়া নামে, রাইয়ে আল-মাজদাকিয়া ও আল-সানবাদিয়া নামে, আজারবাইজানে তারা আল-দুকুলিয়া নামে পরিচিত, অন্য এক স্থানে আল-মুহাম্মিরা নামে এবং ট্রান্সঅক্সিয়ানায় আল-মুবাইয়্যিদা নামে পরিচিত।[৯]
এই ফির্কার শিয়াদের ও উদ্ভব হয় হযরত আলী (রাঃ)-এর খেলাফতকালেই। ইহুদী চরমপন্থী আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা- এর ইন্ধনেই এই মতবাদের সৃষ্টি হয়। এই চরমপন্থী শিয়াদের আকীদা ও বিশ্বাস হলো- “হযরত আলী-ই আল্লাহ” (নাউযুবিল্লাহ)। এই শ্রেণিভুক্ত ফির্কার লোক যদি ও পূর্বের তিনটি দলের তুলনায় কম ছিল- তবু পরবর্তীকালে তারা বহু দলে বিভক্ত হয়ে পরে। এই মতবাদের প্রধান প্রবক্তা ছিলেন ইবনে সাবা।এই আকীদা পোষণকারী কারও সন্ধান পেলে হযরত আলী (রাঃ) সাথে সাথে তাদের কড়া শাস্তি দিতেন। এমনকি সর্বশেষ আলী (রা) ইহুদি আব্দুল্লাহ ইবনে সাবাহর দলকে ধরতে সক্ষম হন এবং ঐসব যিন্দিককে পুড়িয়ে হত্যা করেন।
সহীহ বুখারীতে ইকরামাহ (রহ.) হতে বর্ণিত।
‘আলী (রাঃ) এক সম্প্রদায়কে আগুনে পুড়িয়ে ফেলেন। এ সংবাদ ‘আবদুল্লাহ্ ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ)-এর নিকট পৌঁছলে তিনি বলেন, ‘যদি আমি হতাম, তবে আমি তাদেরকে জ্বালিয়ে ফেলতাম না। কেননা, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা আল্লাহর আযাব দ্বারা কাউকে আযাব দিবে না। বরং আমি তাদেরকে হত্যা করতাম। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে লোক তার দ্বীন বদলে ফেলে, তাকে হত্যা করে ফেল।’ [১০]
এই হাদীসে উল্লেখ নেই কারা ছিলো সেই সম্প্রদায়, কেন তাদের পুড়িয়ে হত্যা করা হয়েছিলো। তবে এর উত্তর আছে আরেক বর্ণনায় যা ইবনু আসাকির তার তারিখে দিমাশক-এ উল্লেখ করেছেন। জাবির (রা) বর্ণনা করেন,
যখন আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) লোকদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিচ্ছিলেন, তখন আব্দুল্লাহ ইবনে সাবা তাঁর সামনে দাঁড়ালেন এবং তাঁকে বললেন: “আপনিই পৃথিবীর প্রভু।” তিনি (আলী) তাকে বললেন: “আল্লাহ্কে ভয় কর।” সে তাকে বলল: “আপনিই বাদশাহ।” তিনি তাকে বললেন: “আল্লাহ্কে ভয় কর।” সে তাকে বলল: “আপনিই স্রষ্টা, আর আপনি সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টি করেছেন এবং রিজিক বণ্টন করেছেন।” তখন তিনি (আলী) তাকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। এরপর আর-রাফিদা (অর্থাৎ ইবনে সাবার অনুসারীরা) জড়ো হয়ে বলল: “তাকে ছেড়ে দিন এবং মাদাইনের উপকণ্ঠে (সাবাত আল-মাদাইনে) নির্বাসিত করুন। যদি আপনি তাকে মদিনায় হত্যা করেন, তবে তার সঙ্গী ও অনুসারীরা আমাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।” তাই তারা তাকে সাবাত আল-মাদাইনে নির্বাসিত করল, এবং সেখানেই কারামিতা ও রাফেজী (রাফিদী) গোষ্ঠীর উদ্ভব ঘটে।
তিনি (জাবির) বললেন: অতঃপর একদল লোক তার নিকট এলো—তারা ছিল সাবাইয়্যা (ইবনে সাবাহর অনুসারী)—এবং তারা এগারো জন পুরুষ ছিল। তিনি (আলী (রা)) বললেন: “ফিরে যাও! কেননা আমি আলী ইবনে আবি তালিব, আমার পিতৃপরিচয় সুবিদিত, আমার মাতৃপরিচয় সুবিদিত, এবং আমি মুহাম্মাদ ﷺ-এর চাচাতো ভাই।”
তারা বলল: “আমরা ফিরে যাব না, আপনার দাবি পরিত্যাগ করুন।” তখন তিনি তাদের অগ্নিতে দগ্ধ করেন, এবং তাদের সমাধিস্থল সাহরা (মরুভূমি) প্রান্তরে অবস্থিত— তাদের এগারোটি কবর সুপরিচিত ।
তিনি (বর্ণনাকারী) বললেন: “তাদের মধ্যে যারা নিজেদের মাথা (অর্থাৎ প্রকৃত মত) গোপন রেখেছিল এমন ব্যক্তিরা অবশিষ্ট থাকলে, আমরা তাদের শিক্ষা দিতাম: ‘আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই’। আর তারা ইবনে আব্বাস (রা.)-এর উক্তি উদ্ধৃত করে আপত্তি করত: ‘কেবলমাত্র অগ্নির স্রষ্টাই (আল্লাহ) অগ্নি দ্বারা শাস্তি দিতে পারেন।”[১১]
পাঠক আমরা দেখতে পেলাম, বুখারীতে বর্ণিত পুড়িয়ে ফেলা সেই যিন্দিকের দল আর কেউ নয় ইহুদি ইবনে সাবাহর দল ছিলো। আগ্রহী পাঠকগণ তারিখে দিমাশকের ভলিয়্যুম ২৯ এর পৃষ্ঠা ৩-১০ পর্যন্ত পড়ে দেখতে পারেন। সেখানে ইবনে সাবাহ সম্পর্কে আরও তথ্য রয়েছে। সমসাময়িক এক ইহুদি ইবনে সাবাহর অনুসারী মুর্তজা আসকারী একটি কিতাব লিখেছেন। সেখানে তিনি দাবি করেছেন ইবনে সাববাহ নাকি কাল্পিনিক চরিত্র, বানোয়াট!!আমরা পাঠকদের অনুরোধ করবো আমাদের লিখিত,ইবনে সাবাহঃ ফ্যাক্ট নাকি ফিকশন” কিতাবটি পড়তে। এখানে বিস্তারিত আলোচনার সু্যোগ নেই। সেখানে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি এবং শিয়া পাদ্রী আসকারীর মুখোশ উন্মোচন করেছি।
ঘালিয়ারা পরবর্তীতে এগারোটি দলে বিভক্ত হয়েছেঃ
- সাবাইয়া বা তাবাররাইয়া
- কামিলিয়া
- আলবাঈয়্যা
- মুগীরিয়া
- মানসূরিয়া
- খাত্তাবিয়া
- কায়্যালিয়া
- হিশামিয়া
- নু’মানিয়া
- ইউনুসিয়া
- নুসাইরিয়া ও ইসহাকিয়া
আমরা একে একে ঘালিয়াদের প্রত্যেকটি দলের আলোচনা করবো।
তথ্যসূত্রঃ
[১] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৪৯
[২]শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫০
[৩] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫০
[৪] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫০
[৫] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫০
[৬] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫০
[৭] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫০
[৮] জ্বিলানী,আব্দুল কাদের, গুনিয়াতুত ত্বালেবীন, ভলিঃ ১ ও ২, পৃঃ৯০-৯১, ফেন্সী লাইব্রেরী এন্ড ষ্টেশনারী
[৯] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫০
[১০] সহীহ বুখারী, তাওহীদ পাবলিকাশন, হাদীসঃ ৩০১৭,৬৯২২
[১১] ইবনু আসাকির, তারিখে দিমাশক, ভলিঃ ২৯, পৃষ্ঠাঃ ৯-১০

Leave a comment