বাকিরিয়া ও জাফরিয়ার ‘ওয়াকিফা’ কারা?

আবু মাইসারা

ওয়াকিফারা মুহাম্মদ আল-বাকির ইবনে আলী যাইনুল আবিদীন ও তাঁর পুত্র জাফর আস-সাদিকের অনুসারী, যারা তাঁদের ইমামত ও বাকিরের পিতা যাইনুল আবিদীনের ইমামতে বিশ্বাস করে। তবে তাদের কেউ কেউ শুধু বাকির বা সাদিক পর্যন্তই সীমাবদ্ধ থাকে, ফলে ইমামত তাঁদের বংশধরদের কাছে হস্তান্তরিত হওয়াকে স্বীকার করে না; অন্যদের মধ্যে এ বিশ্বাস বিদ্যমান। শিয়া সম্প্রদায়ের আলোচনায় আমরা এই গোষ্ঠীকে একটি স্বতন্ত্র উপদল হিসেবে বিবেচনা করেছি। কারণ শিয়াদের মধ্যে কিছু উপদল শুধু বাকির পর্যন্তই বিশ্বাস করে এবং তাঁর প্রত্যাবর্তনে (রাজ‘আত) আস্থা রাখে, ঠিক যেমন কিছু গোষ্ঠী আবু আবদুল্লাহ জাফর ইবনে মুহাম্মদ আস-সাদিকের ইমামতে বিশ্বাস করে এবং তাঁর পরবর্তী ইমামদের স্বীকৃতি দেয় না।

সাদিক ছিলেন ধর্মীয় বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্যের অধিকারী এবং পরিপূর্ণ প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ ব্যক্তি। তিনি বৈষয়িক প্রলোভন পরিত্যাগ করেছিলেন এবং সমস্ত জাগতিক সুখ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করতেন। তিনি কিছুকাল মদিনায় অবস্থান করে তাঁর অনুগত শিয়াদের শিক্ষাদান করেন ও জ্ঞানের গূঢ় রহস্যগুলো তাদের কাছে হস্তান্তর করেন। পরে তিনি ইরাকে গিয়ে কিছুদিন সেখানেও অবস্থান করেন। তিনি কখনো ইমামতের জন্য প্রার্থী হননি বা খিলাফতের জন্য কারও বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি। “যে ব্যক্তি জ্ঞানের সমুদ্রে নিমজ্জিত, সে অগভীর পানিতে তৃষ্ণার্ত হয় না; আর যে সত্যের শিখরে আরোহণ করে, সে পতনের ভয় করে না।” কথিত আছে: “যে আল্লাহর বন্ধু হয়, সে মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকতে চায়; আর যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও বন্ধুত্ব কামনা করে, শয়তান তাকে গ্রাস করে।”

সাদিক পিতৃকুলে নবী পরিবারের (আহলে বাইত) সদস্য ছিলেন এবং মাতৃকুলে আবু বকর আস-সিদ্দিকের বংশোদ্ভূত। তিনি কিছু গুলাত (চরমপন্থী) কর্তৃক তাঁর প্রতি আরোপিত বিষয়গুলো থেকে নিজেকে পৃথক করেন; বরং তিনি তাদের থেকেই নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেন এবং তাদের উপর লা‘নত (অভিশাপ) প্রেরণ করেন। তিনি রাফিজাদের বিশেষ মতবাদ ও তাদের অযৌক্তিকতা থেকেও দূরত্ব বজায় রাখেন—যেমন গায়বত (অদৃশ্য হওয়া) ও রাজ‘আত (প্রত্যাবর্তন), আল্লাহর ইচ্ছা পরিবর্তন (বা’দা), তানাসুখ (আত্মার পুনর্জন্ম), হুলুল (অবতারবাদ) ও তাশবিহ (আল্লাহর জন্য সাদৃশ্য নির্মাণ)। তবে তাঁর মৃত্যুর পর শিয়ারা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়। প্রত্যেক উপদল নিজস্ব মতবাদ প্রচার করতে থাকে এবং তা সাদিকের প্রতি আরোপ করে তাঁর সাথে সম্পর্কযুক্ত করে। অথচ তিনি এসব থেকে মুক্ত ছিলেন—যেমনি মুক্ত ছিলেন মু‘তাজিলা মতবাদ ও কদরিয়া (স্বাধীন ইচ্ছার বিশ্বাস) থেকে।

সাদিকের ইরাদা (ইচ্ছা) সম্পর্কে মতবাদঃ

“আল্লাহ আমাদের জন্য কিছু ইচ্ছা করেছেন এবং আমাদের থেকে কিছু ইচ্ছা করেছেন। আমাদের জন্য যা ইচ্ছা করেছেন, তা আমাদের কাছে গোপন রেখেছেন; আর আমাদের থেকে যা ইচ্ছা করেছেন, তা আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন। তাহলে আমরা কেন তাঁর গোপন ইচ্ছার জন্য উদ্বিগ্ন হব, আর প্রকাশ্য ইচ্ছাকে অবহেলা করব?”

কদর (ভাগ্য) সম্পর্কে তিনি বলেছেনঃ

“কদর হলো দুটি চরমের মধ্যবর্তী অবস্থান; এটি সম্পূর্ণ নিয়তিবাদ (জাবরিয়া) নয়, আবার সম্পূর্ণ স্বাধীন ইচ্ছাবাদ (কদরিয়া) ও নয়।”

তিনি তাঁর দোয়ায় বলতেন:


“হে আল্লাহ! আমি যদি তোমার আনুগত্য করি, তার শুকরিয়া তোমারই; আর যদি অবাধ্য হই, তার দায় আমার। আমি বা অন্য কেউ আমাদের কৃত কোনো ভালো কাজের কৃতিত্ব দাবি করতে পারি না, ঠিক যেমন আমাদের কৃত কোনো মন্দ কাজের জন্য অজুহাতও নেই।”

এরপর শাহারাস্তানি একটা সতর্কবাণী উল্লেখ করেন। তিনি বলেনঃ

এখন আমরা সেই দলগুলোর বিবরণ দেব যারা এই ব্যক্তি (ইমাম জাফর আস-সাদিক) সম্পর্কে নিজেদের মধ্যে মতভেদ পোষণ করে: এটা এজন্য নয় যে তারা তাঁর অনুসারীদের মতবাদের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে, বরং কারণ এই দলগুলো দাবি করে যে তারা তাঁর বংশধর ও সন্তান-সন্ততির অন্তর্ভুক্ত। এই সতর্কতাটি অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে।

__________________________________________________________________

তথ্যসূত্রঃ

১। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৪২-১৪৩



Leave a comment