অনুবাদঃ আবু মাইসারা
যাইদিয়া
এরা হলো যায়েদ ইবনে আলী ইবনে আল-হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবু তালিবের অনুসারী। তাদের মতে, ইমামত ফাতিমা (রা.)-এর বংশধরদেরই প্রাপ্য এবং অন্যদের জন্য তা বৈধভাবে বহাল থাকতে পারে না। তবে, তারা যেকোনো ফাতেমি বংশোদ্ভূত ব্যক্তিকে ইমাম হিসেবে স্বীকার করে থাকে যিনি জ্ঞানী, খোদাভীরু, বীর্যবান ও উদার এবং যিনি তাঁর ইমামত ঘোষণা করেন: তাদের মতে, এমন ব্যক্তির কাছে বাইয়াত দিতেই হবে, তিনি হাসান (রা.)-এর বংশধর হোন বা হুসাইন (রা.)-এর বংশধর। এই বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করে যাইদিয়াদের কিছু অনুসারী ইমাম মুহাম্মাদ ও ইবরাহীমের ইমামত স্বীকার করে, যারা ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে হাসানের পুত্র এবং যারা খলিফা মনসুরের শাসনামলে বিদ্রোহ করেছিলেন ও সে কারণে নিহত হন। তারা বিভিন্ন অঞ্চলে একই সময়ে দুই ইমামের অস্তিত্বের সম্ভাবনাও স্বীকার করে; শর্ত হলো উভয়েই উপরোক্ত গুণাবলীতে ভূষিত হতে হবে, তাহলে প্রত্যেকেরই বাইয়াত পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
এই সকল ধারণা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে যায়েদ ইবনে আলী জ্ঞান-বিজ্ঞানে সুসজ্জিত হওয়ার জন্য ধর্মতত্ত্ব ও আইনশাস্ত্র অধ্যয়নের সিদ্ধান্ত নেন। ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ে তিনি মু’তাযিলাদের নেতা ও প্রধান ওয়াসিল ইবনে আতা’র[1] (“বয়নকারী” ও “তোতলানো”) শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, এমনকি যদিও ওয়াসিলের মতে, তাঁর দাদা আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) উটের লোকদের (আয়েশা -রা, তালহা -রা, যুবাইর -রা.) বিরুদ্ধে এবং সিরিয়াদের (মুয়াবিয়ার -রা বাহিনী) বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধগুলোতে পুরোপুরি সঠিক ছিলেন না। ওয়াসিলের মতে, উভয় পক্ষের যেকোন এক পক্ষ ভুল ছিল, কিন্তু তিনি কোন পক্ষ তা সুনির্দিষ্টভাবে বলেননি। সুতরাং, ওয়াসিলের কাছ থেকেই যায়েদ মু’তাযিলা মতবাদ শিক্ষা লাভ করেন এবং তাঁর সমস্ত অনুসারীই মু’তাযিলিতে পরিণত হয়।
যায়েদের একটি মত ছিল যে, কম মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি (আল-মাফদুল)-ও ইমাম হতে পারে, এমনকি যদি অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি (আল-আফদাল) বিদ্যমান থাকেন। তিনি বলতেনঃ
‘আলী ইবনে আবু তালিব (রা.) ছিলেন সাহাবাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, কিন্তু খিলাফত আবু বকরের (রা.) হাতে ন্যস্ত করা হয়েছিল অংশতঃ সুবিধার কারণে এবং অংশতঃ ধর্মীয় বিবেচনা থেকে। উদাহরণস্বরূপ, গৃহযুদ্ধের অগ্নি নির্বাপিত করা এবং মানুষের মনকে শান্ত করার প্রয়োজন ছিল, যাদের কাছে নবী করিম (সা.)-এর সময়ে সংঘটিত যুদ্ধগুলোর অভিজ্ঞতা তখনও সদ্যতাজা ছিল; এবং আমিরুল মুমিনিন আলী (রা.)-এর তরবারি তখনও কুরাইশ ও অন্যান্য মুশরিকদের রক্তে সিক্ত। তদুপরি, মানুষের মনে জমে থাকা ক্ষোভ ও প্রতিশোধের ইচ্ছা তখনও ছিল। তাই, মানুষের মন আলী (রা.)-এর প্রতি সম্পূর্ণভাবে অনুকূল ছিল না এবং তারা তাঁকে অকুণ্ঠ আনুগত্য দিতে প্রস্তুত ছিল না। সেইজন্য এটি সমীচীন ছিল যে ইমামতের দায়িত্ব পালন করবেন এমন ব্যক্তি হবেন যিনি তাদের নিকট কোমল, দয়ালু, পরিণত বয়সী, ইসলামের প্রাথমিক গ্রহণকারী এবং নবীর (সা.) নিকটতম বলে পরিচিত।’
তোমাদের কি স্মরণ নেই, তাঁর (ﷺ) শেষ রোগাবস্থায়, যখন আবু বকর (রা.) খিলাফত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর উপর অর্পণের প্রস্তাব করেছিলেন, তখন জনতা প্রতিবাদে বলে উঠেছিল, ‘আপনি আমাদের উপর এক কঠোর ও রূঢ় ব্যক্তিকে বসালেন!’ এইভাবে তারা আমিরুল মুমিনিন উমর (রা.)-এর পছন্দ অনুমোদন করেনি, তাঁর কঠোরতা ও রূঢ়তা, ধর্মীয় আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং শত্রুর প্রতি তাঁর কঠোর আচরণের কারণে। তবে আবু বকর (রা.) তাদেরকে এই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন, ‘যদি আল্লাহ আমাকে জবাবদিহির জন্য ডাকেন, তবে আমি বলব যে, আমি তাদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ এবং তাদের জন্য সর্বোত্তম ব্যক্তিকেই নিযুক্ত করেছিলাম!’ সুতরাং, অধিক মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও কম মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির ইমাম হওয়া জায়েয, এমনকি যদি এমন কেউ পাওয়া যায় যার নিকট আইনগত বিষয়ের সূত্রপাত করা যায় এবং যার সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা যায়।
যখন কুফার শিয়ারা যায়েদের এই মতবাদসমূহ শুনল এবং জানতে পারল যে, তিনি সেই দুই জ্যেষ্ঠ সাহাবী (আবু বকর ও উমর -রা.) থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করেননি, তখন তারা তাঁর জীবনের বাকি সময়ের জন্য তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল। এই কারণেই তাদের ‘রাফেজা’ (প্রত্যাখ্যানকারী) নামে ডাকা হয়।
যায়েদ ইবনে আলী ও তাঁর ভাই মুহাম্মাদ ইবনে আলী আল-বাকিরের মধ্যে মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়; তবে এই ইস্যুতে নয়, বরং যায়েদের ওয়াসিল ইবনে আতা-এর শিষ্য হওয়া এবং এমন এক ব্যক্তির কাছ থেকে জ্ঞান অর্জন করার প্রশ্নে, যিনি বিশ্বাস করতেন যে, তাঁর (যায়েদের) দাদা (আলী -রা.) যারা তাঁর বাইয়াত ভঙ্গ করেছিল, বা যারা সত্য থেকে বিচ্যুত হয়েছিল, বা যারা সক্রিয়ভাবে তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ক্ষেত্রে ভুলের সম্ভাবনা রয়েছে। কদর-সংক্রান্ত তাঁর সেই মতামতের কারণেও মতপার্থক্য সৃষ্টি হয়, যা নবী বংশধরদের মতবিরোধী ছিল। আরেকটি মতবৈষম্য ছিল ইমামতের ব্যাপারে যায়েদের এই মত যে, ইমাম হতে হলে বিদ্রোহ করে উঠতে হবে। শেষ পর্যন্ত, বাকির একদিন তাঁকে বললেন, ‘তোমার মত অনুযায়ী তো বলতে হয় যে, তোমার পিতা (আলী ইবনুল হুসাইন) ইমাম ছিলেন না, কারণ তিনি কোনো সময়ই বিদ্রোহ করেননি, এমনকি তা করার কোনো ইঙ্গিতও দেখাননি।’
যখন যায়েদ ইবনে আলী নিহত হন এবং তাঁর দেহ ক্রুশে টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়, তখন ইয়াহইয়া ইবনে যায়েদ ইমামতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইয়াহইয়া খুরাসানে চলে যান, যেখানে অনেকেই তাঁকে সমর্থনে এগিয়ে আসে। জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আস-সাদিকের একটি ভবিষ্যদ্বাণী তাঁর নিকট পৌঁছায় যে, তিনি তাঁর পিতার মতোই নিহত হবেন এবং তাঁর মতোই ক্রুশে টাঙানো হবেন। ঘটনাটি ঠিক ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারেই সংঘটিত হয়। এরপর ইমামত স্থানান্তরিত হয় ইমাম মুহাম্মাদ ও ইবরাহিমের কাছে, যারা মদিনায় বিদ্রোহ করেন। ইবরাহিম পরে বসরায় যান এবং সেখানে তিনি সমর্থন লাভ করেন। তবে এই দুইজনকেও শেষ পর্যন্ত হত্যা করা হয়। সাদিক ইতিমধ্যেই তাদের জন্য ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, তাদের সাথে কী ঘটবে, একই সাথে তাদের বলেছিলেন যে, তাঁর পূর্বসূরীরাও এ সমস্ত তাঁর কাছে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। সাদিক আরও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, উমাইয়্যারা একই সাথে নবী বংশধরদের তাদের প্রতি বিদ্বেষ সত্ত্বেও, মানুষের উপর এতটাই মাথা উঁচু করে থাকবে যে পাহাড়গুলোও যদি উচ্চতায় তাদের সাথে পাল্লা দিতে চেষ্টা করে, তারাও তাদের মাথা তার উপরে উঁচু করে দেবে। তিনি আরও বলে যান যে, নবী বংশধরদের জন্য কাউকে বিদ্রোহ করে নিজেকে ঘোষণা করা জায়েয হবে না যতক্ষণ না আল্লাহ তাদের সাম্রাজ্যের পতন ঘটান – এ কথা বলতে গিয়ে তিনি আবুল আব্বাস ও আবু জাফরের দিকে ইঙ্গিত করেন, যারা ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসের পুত্র। তারপর, মনসুরের দিকে ইশারা করে তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ না এই ব্যক্তি ও তার বংশধররা এটি (খিলাফত) ভোগ করছে, ততক্ষণ আমরা খিলাফতের এই বিষয়টি তালাশ করব না।’
যায়েদ ইবনে আলীকে কুফা নগরীর কুনাসা নামক স্থানে হিশাম ইবনে আব্দুল মালিক হত্যা করেন; ইয়াহিয়া ইবনে যায়েদকে খুরাসানের জুজজান নামক স্থানে গভর্নর হত্যা করেন; ইমাম মুহাম্মাদকে মদিনায় ঈসা ইবনে হামান হত্যা করেন এবং ইমাম ইবরাহীমকে বসরায় হত্যা করা হয় – এই শেষোক্ত দুইজনকে মনসুরের নির্দেশে হত্যা করা হয়। এরপর নাসির আল-আতরুশ খুরাসানে নেতা হিসেবে আবির্ভুত হওয়া পর্যন্ত যাইদিয়ারা সম্পূর্ণ বিশৃঙ্খল অবস্থায় পড়ে থাকে। নাসিরকে হত্যার উদ্দেশ্যে খোঁজা হচ্ছিল, কিন্তু তিনি নিজের অভিযান পরিত্যাগ করে আত্মগোপন করেন। পরে তিনি দাইলাম ও আল-জাবালের ঐসব অঞ্চলে চলে যান যেখানে তখনও ইসলাম প্রচারিত হয়নি। সেখানে তিনি যায়েদ ইবনে আলীর মাযহাব অনুসারে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দেন। স্থানীয়রা তা গ্রহণ করে ও অনুসরণ করে। যাইদিয়ারা সেই অঞ্চলে শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং তাদের ধারাবাহিক ইমামদের দ্বারা শাসিত হতে থাকে।
মতবাদ সংক্রান্ত কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে যাইদিয়াদের এই দল তাদের চাচাতো ভাইদের থেকে পৃথক, যাদের মুসাবিয়া নামে জানা যায়। সময়ের সাথে সাথে বেশিরভাগ যাইদিয়া কম মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির ইমামতের বিশ্বাস পরিত্যাগ করে। তারা নবী-সাহাবীদের সমালোচনাও করত, ঠিক যেমনটি ইমামিয়া সম্প্রদায় করত।
যাইদিয়ারা তিনটি দলে বিভক্ত:
সালিহিয়ারা বত্রিয়াদের মতামতই পোষণ করে।
যাইদিয়া সম্প্রদায়ের প্রধান ব্যক্তিত্বগণের মধ্যে নিম্নলিখিতরা উল্লেখযোগ্য: আবুল জারূদ যিয়াদ ইবনে মুনযির আল-আবদী, যাঁকে জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আস-সাদিক অভিশাপ দিয়েছিলেন; হাসান ইবনে সালিহ ইবনে হাইয়; মুকাতিল ইবনে সুলাইমান; দাঈ (প্রচারক) নাসিরুল হক হাসান ইবনে আলী ইবনে হাসান ইবনে যায়েদ ইবনে উমর ইবনে হুসাইন ইবনে আলী; তাবারিস্তানের অপর দাঈ হুসাইন ইবনে যায়েদ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল ইবনে হাসান ইবনে যায়েদ; মুহাম্মাদ ইবনে নাসর।
টীকাঃ
[1] এই ওয়াসিল বিন আতা ছিলেন হাসান বসরী রহ এর ছত্র। তিনি হাসান বসরীর (রহ) এর সাথে দ্বন্দ করে বেরিয়ে এসে মুতাজিলা মতবাদ গঠন করেন। মুতাজিলাদের মতবাদ নিম্নরূপঃ
১। তারা আল্লাহর নাম ও গুণাবলী তথা সিফতকে আল্লাহর সাথে অন্তর্ভুক্ত করতে স্বীকার করে না। তারা যুক্তি দেয় আল্লাহকে কোন কিছুর সাথে তুলনা করা যাবে না। তাই এগুলো আল্লাহর প্রতি দেওয়া যাবে না।
২। মুতাজিলারা কুরআনকে আল্লাহর অস্তিত্বের অংশ বলে মনে করে না, বরং আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টির মতই সংশোধনযোগ্য সৃষ্টি বলে মনে করে।
৩। প্রাচীন গ্রীকদের মত মুতাজিলারাও মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় বিশ্বাস করে। তারা মনে করে যে আল্লাহ মানুষের ভাগ্য পূর্বনির্ধারণ করতে পারেন না। বরং মানুষ আল্লাহর ইচ্ছার বাইরেও সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
৪। মুতাজিলারা তাদের যুক্তি প্রয়োগ করার মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে আল্লাহর কোন দয়া বা অনুকম্পা হবে ন্যায়বিচারের লঙ্ঘন ও তার প্রকৃতির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। মুতাজিলারা বিশ্বাস করে যে আল্লাহ পরিপূর্ণ ন্যায়বিচার করতে বাধ্য।
৫। মুতাজিলারা মনে করে যে একজন মুসলিম যদি সর্বোচ্চ পাপ বা কবিরা গুনাহ করে তাওবা করা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করে, তবে ঐ ব্যক্তিকে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী-এই দুইয়ের কোনটির মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত করা হবে না।
৬। সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ’ ধারণাকে মুতাজিলারা গ্রহণ করে। এই লক্ষ্যে শক্তিপ্রয়োগকে তারা বৈধ মনে করে, যা মিহনা নামে নতুন এক ধারণার সাথে পরিচিত করায়।
তথ্যসূত্রঃ
১। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৩২-১৩৫,১৩৮

Leave a comment