খাত্তাবীয়া

আবু মাইসারা

এরা হলেন আবুল খাত্তাব মুহাম্মাদ ইবনে আবু যাইনাব আল-আসদী আল-আজদা (যিনি ‘বিকলাঙ্গ’ নামে পরিচিত)-এর অনুসারী। তিনি বনু আসদ গোত্রের মাওলা ছিলেন এবং আবু আবদুল্লাহ জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আল-সাদিকের অনুসারী হওয়ার দাবি করতেন। কিন্তু যখন সাদিক তার সম্পর্কে তার মিথ্যা ও অত্যুক্তিপূর্ণ মতবাদগুলির কথা শুনতে পান, তিনি কেবল নিজেকে তার থেকে পৃথক করেন ও তাকে অভিশাপ দেনই না, বরং তার নিজস্ব অনুসারীদেরও তার থেকে বিচ্ছিন্ন হতে আহ্বান জানান। তিনি এই বিষয়ে অত্যন্ত জোর দিয়েছিলেন এবং আবুল খাত্তাব থেকে নিজেকে পৃথক করা ও তাকে অভিশাপ দিতে তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন।

আবুল খাত্তাব যখন সাদিক থেকে বিচ্ছিন্ন হন, তখন তিনি নিজের জন্য ইমামতের দাবি করেন। তিনি বলতেন যে ইমামগণ প্রথমত নবী, এবং তারপর আল্লহর সত্ত্বা। তিনি জাফর ইবনে মুহাম্মাদ এবং তার পিতৃপুরুষদেরকে আল্লাহর অংশ বলে বিশ্বাস করতেন। তার মতে, তারা সকলেই আল্লাহর সন্তান ও তাঁর প্রিয়পাত্র। দেবত্ব হল নবুয়তের মধ্যে অবস্থিত এক জ্যোতি, এবং নবুয়ত হল ইমামতের মধ্যে অবস্থিত এক জ্যোতি; এমন নিদর্শন ও জ্যোতি ছাড়া পৃথিবী অস্তিত্বশীল থাকা অসম্ভব। তিনি দাবি করতেন যে এই সময়ে জাফরই ছিলেন দেবতা। আল্লাহ আসলে সেই বাহ্যিক রূপ নন, যা মানুষ দেখতে পায়; কিন্তু যখন তিনি এই পৃথিবীতে অবতরণ করলেন, তখন তিনি এই রূপ ধারণ করেন এবং এই রূপেই মানুষ তাকে দেখতে পায়।

খলিফা মানসুরের সেনাপতি ঈসা ইবনে মুসা আবুল খাত্তাবের ক্ষতিকর প্রচারণার কথা শুনে তাকে কুফার লবণাক্ত জলাভূমিতে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করার আদেশ দেন। তার মৃত্যুর পরে খাত্তাবীয়া বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। তাদের মধ্যে একটি দল বিশ্বাস করত যে আবুল খাত্তাবের পরে ইমাম ছিলেন মুআম্মার নামক এক ব্যক্তি, যাকে তারা আবুল খাত্তাবের মতোই অনুসরণ করত। তারা বিশ্বাস করত যে বর্তমান বিশ্বের কোনো শেষ হবে না, এবং মানুষের জন্য জান্নাত হলো আনন্দদায়ক বস্তু, বিলাসিতা ও সাধারণ সুখ-শান্তি। অন্যদিকে, জাহান্নাম হলো অপ্রীতিকর বস্তু, কষ্ট ও মানবজাতির ভোগান্তি নিয়ে গঠিত। তারা মদপান, ব্যভিচার ও অন্যান্য সকল নিষিদ্ধ কাজকে বৈধ বলে গণ্য করত। তারা নামাজ ও অন্যান্য ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা পরিত্যাগ করাকেও বিশ্বাস করত। এই দলটিকে মুআম্মারিয়া নামে ডাকা হয়।

আরেকটি দল দাবি করত যে আবুল খাত্তাবের পরে ইমাম ছিলেন বাযীগ। এই ব্যক্তি বিশ্বাস করতেন যে জাফরই ছিলেন আল্লাহ, এই অর্থে যে আল্লাহ জাফরের রূপে মানুষের কাছে প্রকাশিত হয়েছিলেন। তিনি আরও মত পোষণ করতেন যে প্রত্যেক বিশ্বাসীই আল্লাহর কাছ থেকে ওহী প্রাপ্ত হন। আর তিনি আল্লাহর বাণী [সূরা ইউনুসঃ১০০] “আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কেউ ঈমান আনতে পারেনা “-এর ব্যাখ্যা করেন যে, এর অর্থ আল্লাহর কাছ থেকে ওহী প্রাপ্তি। একইভাবে তিনি আল্লাহর অন্য বাণী [সূরা আন-নাহল] “তোমার প্রভু মৌমাছিকে ওহী দিয়েছেন“-এরও অনুরূপ ব্যাখ্যা দেন। তিনি আরও দাবি করতেন যে তাঁর কিছু অনুসারী জিবরাইল ও মীকাইলের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। আর তিনি এই মত পোষণ করতেন যে, কোনো ব্যক্তি যদি পূর্ণতায় পৌঁছে যায়, তবে তার সম্পর্কে বলা উচিত নয় যে সে মারা গেছে; বরং যে পূর্ণতা লাভ করেছে, তার সম্পর্কে বলা উচিত যে সে স্বর্গীয় জগতে ফিরে গেছে। তাঁর সকল অনুসারীই দাবি করে যে তারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের মৃতদের দেখতে পায়। এই দলটিকে বাযীগীয়া নামে ডাকা হয়।

আরেকটি দল মত পোষণ করত যে আবুল খাত্তাবের পরে ইমাম ছিলেন উমাইর ইবনে বায়ান আল-ইজলী। তাদের বিশ্বাস প্রথম দলটির মতোই, যদিও তারা স্বীকার করে নেয় যে তারা মারা যায়। তারা কুফার কুনাসায় একটি তাবু স্থাপন করেছিল যেখানে তারা সবাই সমবেত হয়ে সাদিকের উপাসনা করত। তাদের সম্পর্কে একটি রিপোর্ট ইয়াজিদ ইবনে উমর ইবনে হুবাইরার কাছে পৌঁছালে তিনি উমাইরকে বন্দী করেন এবং কুফার কুনাসায় তাকে ক্রুশে বিদ্ধ করেন। এই দলটিকে আল-ইজলিয়া বা উমাইরিয়া নামে ডাকা হয়।

আরেকটি দল বিশ্বাস করত যে আবুল খাত্তাবের পর ইমাম ছিলেন মুফাজ্জাল আল-সাইরাফী। এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা জাফরের প্রভুত্বে বিশ্বাস করত, কিন্তু তার নবুয়ত ও রিসালাতে বিশ্বাস করত না। তারা মুফাজ্জালিয়া নামে পরিচিত।

জাফর ইবনে মুহাম্মদ আল-সাদিক এই সকল সম্প্রদায় থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে পৃথক করেছিলেন, তাদের প্রত্যাখ্যান করেছিলেন এবং তাদের উপর অভিশাপ দিয়েছিলেন। এদের সবাই তাদের ইমামদের প্রকৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে বিভ্রান্ত, পথভ্রষ্ট ও অজ্ঞ এবং চরমভাবে ধ্বংসপ্রাপ্ত।


তথ্যসূত্রঃ

[১] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫৪-১৫৫



Leave a comment