মুগীরিয়া

আবু মাইসারা

এরা হলেন মুগীরা ইবনে সাইদ আল-ইজলীর অনুসারী। মুগীরা দাবি করত যে মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনে হুসাইনের পরে ইমামতের দায়িত্ব ছিল মুহাম্মাদ আন-নাফস আজ-যাকিয়ার – যিনি ‘পবিত্র আত্মা’ নামে পরিচিত – তিনি ছিলেন আবদুল্লাহ ইবনে হাসান ইবনে হাসানের পুত্র এবং যিনি মদিনায় বিদ্রোহ করেছিলেন। মুগীরা বিশ্বাস করত যে মুহাম্মাদ (আন-নাফস আজ-যাকিয়া) এখনও জীবিত আছেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়নি। মুগীরা ছিলেন খালিদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-কাসরীর মাওলা। ইমাম মুহাম্মাদের পরে, সে প্রথমে নিজের জন্য ইমামতের দাবি করে, তারপর নবুয়তের দাবি করে। সে অবৈধ জিনিসকেও বৈধ বলে গণ্য করত। আলী সম্পর্কে সে সকল চরম সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল, যা কোন সুস্থমস্তিষ্কের ব্যক্তির পক্ষে বিশ্বাস করা সম্ভব নয়।

মুগীরা সাদৃশ্যবাদীতেও বিশ্বাস করত। সে বলত যে আল্লাহর একটি আকৃতি ও দেহ আছে, বর্ণমালার অক্ষরের মতো যার অংশবিশেষ রয়েছে। তাঁর আকৃতি হলো আলোর তৈরি এক মানুষের মতো, যার মাথায় রয়েছে আলোর একটি মুকুট এবং যার হৃদয় থেকে জ্ঞান উৎসারিত হয়। সে আরও দাবি করত যে, যখন আল্লাহ বিশ্বসৃষ্টির ইচ্ছা করলেন, তিনি তাঁর মহান নাম উচ্চারণ করলেন, যা একটি মুকুটের আকারে তাঁর মাথার উপর নেমে এলো। সে বলত, এটাই হলো আল্লাহর বাণী [সূরা আ’লা, আয়াতঃ১-২] “আপনি আপনার সুমহান রবের নামের পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করুন যিনি সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর সুসমঞ্জস করেছেন।“-এর অর্থ।

এরপর আল্লাহ মানুষের কাজগুলো দেখলেন, যা তিনি তাঁর হাতের তালুতে লিখে রেখেছিলেন; তাদের পাপাচারী দেখে তিনি রাগান্বিত হলেন এবং ঘামে ভরে গেলেন। তাঁর ঘাম থেকে দুটি সাগরের সৃষ্টি হলো, একটি লবণাক্ত ও অন্যটি স্বাদু; লবণাক্ত সাগরটি ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন কিন্তু স্বাদু সাগরটি ছিল উজ্জ্বল। আল্লাহ তখন উজ্জ্বল সাগরের দিকে তাকালেন এবং তাঁর নিজের ছায়া দেখতে পেলেন। তিনি তাঁর সেই ছায়ার চোখ বের করে তা থেকে সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করলেন। ছায়াটির বাকি অংশ তিনি ধ্বংস করে দিলেন এবং বললেন, ‘আমার সাথে অন্য কোন প্রভুর থাকা উচিত নয়’। এরপর আল্লাহ দুই সাগর থেকে সমস্ত কিছু সৃষ্টি করলেন: ঈমানদারদের সৃষ্টি করলেন উজ্জ্বল সাগর থেকে এবং অবিশ্বাসীদের সৃষ্টি করলেন অন্ধকার সাগর থেকে। প্রথমে তিনি মানুষের ছায়া সৃষ্টি করলেন, অন্যান্য মানুষের আগেই মুহাম্মাদ (ﷺ) ও আলীর ছায়া সৃষ্টি করলেন।

এরপর আল্লাহ আসমান, জমিন ও পাহাড়গুলিকে প্রস্তাব দিলেন যে তারা ‘আমানাত’ গ্রহণ করুক – অর্থাৎ ইমামত সম্পর্কে আলীর প্রতি যারা জুলুম করতে চায়, তা থেকে তাকে রক্ষার দায়িত্ব গ্রহণ করুক। কিন্তু তারা এতে রাজি হল না। অতঃপর আল্লাহ এই আমানাত মানুষের কাছে প্রস্তাব করলেন। উমর এ দায়িত্ব নেওয়ার জন্য আবু বকরকে পরামর্শ দিলেন এবং আলীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে তাকে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিলেন।তবে শর্ত এই যে, আবু বকর তাকে (উমরকে) নিজের খলিফা হিসেবে নিয়োগ দেবেন। আবু বকর এতে সম্মত হলেন এবং বাহ্যিকভাবে তারা উভয়েই আলীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলেন। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ বলেছেন, “মানুষ এ দায়িত্ব গ্রহণ করল; নিশ্চয়ই সে ছিল অত্যন্ত জালেম ও অজ্ঞ।” [সূরা আহযাবঃ৭২]

মুগীরা বিশ্বাস করত যে উমর সম্পর্কেই নিম্নোক্ত আয়াতটি নাযিল হয়েছে: “এরা শয়তানের মত, সে মানুষকে বলে, কুফরী কর; তারপর যখন সে কুফরী করে তখন সে বলে, তোমার সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই ”। [সূরা হাশরঃ ১৬]

মুগীরাকে হত্যা করা হলে তার অনুসারীরা নিজেদের মধ্যে বিভেদে পড়ে যায়। কিছু লোক তার প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন, অন্যদিকে অন্যরা মুহাম্মাদ (আবু জাফর)-এর ইমামতের জন্য অপেক্ষা করতে থাকেন, ঠিক যেমন মুগীরা নিজেও করেছিলেন। মুগীরা আবু জাফর মুহাম্মাদ ইবনে আলীর ইমামতে বিশ্বাস করত, কিন্তু তার ব্যাপারে সে চরম সীমা অতিক্রম করে তাকে ঈশ্বরের মর্যাদা দেয়। এর ফলে বাকির (আবু জাফর) তার থেকে নিজেকে পৃথক করেন এবং তাকে অভিশাপ দেন।

মুগীরা তার অনুসারীদের বলেছিল, ‘তার (আবু জাফরের) জন্য অপেক্ষা কর। তিনি ফিরে আসবেন, এবং জিবরীল ও মীকাঈল কাবা শরিফের রুকন (কোনা) ও মাকামে ইবরাহিমের মাঝখানে তার কাছে বাই’আত (আনুগত্যের শপথ) করবেন।’ এছাড়াও সে দাবি করেছিল যে আবু জাফর মৃতদের জীবিত করে তুলবেন।


তথ্যসূত্রঃ

[১] শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫২-১৫৩



Leave a comment