হিশামীয়া

আবু মাইসারা

এরা দু’জন ভিন্ন হিশামের অনুসারী – হিশাম ইবনুল হাকাম, যিনি সাদৃশ্যবাদের মতবাদের জন্য পরিচিত, এবং হিশাম ইবনে সালিম আল-জাওয়ালিকী, যিনি এই মতবাদগুলি অনুসরণ করতেন। হিশাম ইবনুল হাকাম ছিলেন একজন শিয়া ধর্মতত্ত্ববিদ। তিনি আবুল হুযাইল এর সাথে ধর্মতাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে বেশ কিছু বিতর্কে লিপ্ত হন, যার মধ্যে সাদৃশ্যবাদ এবং আল্লাহর জ্ঞান সম্পর্কিত প্রশ্নগুলি উল্লেখযোগ্য।

ইবনে রাওয়ান্দী বর্ণনা করেন যে হিশাম বলতেন, আল্লাহ ও বস্তুগত সৃষ্টির মধ্যে কিছুটা সাদৃশ্য রয়েছে, নতুবা সৃষ্টিজগৎ তাঁর জ্ঞানের দিকে পরিচালিত করতে পারত না। তবে কা’বীর বর্ণনায় রয়েছে যে, হিশাম বলতেন যে আল্লাহ হলেন একটি দেহ যার অংশবিশেষ ও কিছুটা আয়তন রয়েছে, কিন্তু তিনি কোন সৃষ্টির সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন এবং কোন সৃষ্টিও তাঁর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়। তার সম্পর্কে আরও বলা হয় যে, তিনি বিশ্বাস করতেন আল্লাহ সাত বিঘত উচ্চ, তবে তা তাঁর নিজস্ব বিঘতের পরিমাপে; তিনি একটি নির্দিষ্ট স্থান ও অবস্থানে রয়েছেন; তিনি চলমান, কিন্তু তাঁর এই চলমানতা হলো তাঁর কর্মতৎপরতা, এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হওয়া নয়। তিনি আরও বলতেন যে, স্বয়ং আল্লাহ সসীম সত্তা, তবে তা সত্ত্বেও তাঁর ক্ষমতা সসীম নয়। আবু ঈসা আল-ওয়াররাকের বর্ণনামতে, তিনি আরও বলতেন যে, আল্লাহ তাঁর আরশের সাথে এমনভাবে সংস্পর্শে রয়েছেন যে, তাঁর কোন অংশ আরশের বাইরে প্রসারিত নয়, আর আরশেরও কোন অংশ তাঁর বাইরে প্রসারিত নয়।

হিশামের দৃষ্টিভঙ্গি হলো—আল্লাহ্‌ চিরকাল স্বীয় সত্তাকে জানেন, তবে নিজের বাইরে অন্য বিষয়সমূহ তিনি তখনই জানেন, যখন সেগুলো বিদ্যমান হয়; আর তা এমন এক জ্ঞান, যা সৃষ্ট বা চিরন্তন—কোনোটিই বলা যায় না। কারণ, জ্ঞান হলো একটি গুণ, আর গুণ কখনো বর্ণনা করা চলে না। একইভাবে বলা যায় না যে, আল্লাহর জ্ঞান তাঁর সত্তা, বা তা তাঁর সত্তা ভিন্ন অন্য কিছু বা তা তাঁর অংশ।

হিশামের মতবাদে আল্লাহর শক্তি এবং জীবন সম্পর্কে ধারণা তাঁর জ্ঞানের ধারণা থেকে আলাদা, যদিও তিনি বিশ্বাস করেন না যে এগুলো সৃষ্ট হয়েছে। তিনি বলেন, আল্লাহ ইচ্ছা করেন এবং তাঁর ইচ্ছা হচ্ছে এক ধরনের গতি। তাঁর ইচ্ছা আবার না তিনি নিজেই, না তিনি ছাড়া অন্য কিছু। আল্লাহর বাণী সম্পর্কে তিনি মনে করেন, এটা আল্লাহর একটি গুণ এবং একে না সৃষ্টি বলা চলে, না অসৃষ্ট।

হিশাম মনে করেন, কোনও ঘটনা আমাদের আল্লাহর জ্ঞানে পৌঁছাতে সক্ষম নয়, কারণ এগুলোর কিছু নিজ অস্তিত্বের প্রমাণ চায়। আল্লাহর জ্ঞানে পৌঁছাতে যে উপায় দরকার, সেটা এমন কিছু হতে হবে যার অস্তিত্ব তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট, ধারণা বা অনুমান ভিত্তিক নয়। তিনি আরও বলেন, সক্ষমতা হলো এমন কিছু যা ছাড়া কোনও কাজ করা যায় না, যেমন যন্ত্র, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, সময় এবং স্থান।

হিশাম ইবনে সালিম বলেন, আল্লাহ মানুষের আকৃতিতে আছেন। তাঁর উপরের অংশ ফাঁপা এবং নিচের অংশ কঠিন। তিনি উজ্জ্বল দীপ্ত আলোর মতো এবং পাঁচটি ইন্দ্রিয় ছাড়াও তাঁর হাত, পা, নাক, কান, চোখ, মুখ এবং কালো চুল রয়েছে, এই চুল আসলে কালো আলো। তবে তিনি মাংস ও রক্তের নন।

হিশাম আরও বলেন, সক্ষমতা কারো সামর্থ্যের একটি অংশ। আরও বলা হয়, তিনি মেনে নেন যে নবীগণ পাপ করতে পারেন, যদিও তিনি ইমামদের পাপমুক্ত বিশ্বাস করেন। তিনি বলেন, নবী ও ইমামের মধ্যে পার্থক্য হলো—নবী ওহী পান, যেখানে তাঁকে তাঁর পাপ সম্পর্কে সতর্ক করা হয় এবং তিনি তওবা করেন; কিন্তু ইমাম ওহী পান না, তাই তাঁকে পাপমুক্ত হতে হয়।

আলীর ব্যাপারে হিশাম ইবনুল হাকাম চরম সীমা অতিক্রম করে বলতেন যে তিনিই হচ্ছেন আল্লাহ, যার আনুগত্য করা অবশ্যকরণীয়। এই হিশাম ইবনুল হাকাম, যিনি ছিলেন একচোখা দৃষ্টিসম্পন্ন একজন ধর্মতাত্ত্বিক, মু’তাজিলাদের প্রতি তার নিজের সমালোচনা ভুলে যাওয়া উচিত ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, সে তার বিরোধীদের যে ভুলের জন্য সমালোচনা করেন, তিনি তার চেয়েও বড় ভুলে পতিত হন এবং সাদৃশ্যবাদ মতবাদের আরও খারাপ রূপে নিপতিত হয়, কারণ সে আল্লাফের সমালোচনা করতে গিয়ে বলেছিল:

তুমি বলো, আল্লাহ্‌ জ্ঞানের মাধ্যমে জানেন, কিন্তু তাঁর জ্ঞান তাঁর সত্তা। তাহলে তো আল্লাহ সৃষ্টি হওয়া সত্তাগুলোর মত হবেন—যারা জ্ঞান দিয়ে জানে, তবে তাঁদের থেকে ভিন্ন, কারণ আল্লাহর ক্ষেত্রে জ্ঞান তাঁর নিজের সত্তা; ফলে তিনি জানবেন, কিন্তু সচরাচর সত্তাগুলোর মতো নয়, যারা জানে। তাহলে কেন তোমরা বলো না যে আল্লাহ একটি দেহ, কিন্তু অন্যান্য দেহের মতো নয়? তাঁর একটি আকৃতি আছে, কিন্তু অন্যান্য আকৃতির মতো নয়? একটি ভর আছে, কিন্তু অন্যান্য জিনিসের ভরের মতো নয়?

এবং এভাবে আরও অনেক কিছু।

জুরারা ইবনে আয়ুন হিশামের সঙ্গে একমত ছিলেন যে আল্লাহর জ্ঞান সৃষ্ট। তিনি আরও যোগ করেন যে, তাঁর শক্তি, জীবন এবং অন্যান্য গুণও সৃষ্ট; অর্থাৎ, এই গুণাবলী সৃষ্টি হওয়ার আগে আল্লাহ শক্তিমান, জীবিত, শ্রবণকারী, দর্শনকারী, ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন ও বলিয়ান ছিলেন না। তিনি আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর-র ইমামত সমর্থন করেন, কিন্তু তাঁকে কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে এবং তিনি সঠিকভাবে জানতেন না বুঝে মুসা ইবনে জাফরের অভিমুখে ফিরে যান। কিছু সূত্র অনুযায়ী, তিনি শুধু কুরআনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, ‘এটাই আমার ইমাম’; আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর-র ইমামত তাঁর কাছে কোন কারণে বেশি কঠিন হয়ে পড়েছিল।

বর্ণনা করা হয় যে যুরারীয়ারা মত পোষণ করত যে, ইমামের জ্ঞান হলো একটি অপরিহার্য ও স্বভাবজাত জ্ঞান, এবং তার জন্য অজ্ঞ থাকা অসম্ভব। এর কারণ হলো যে, তার সমস্ত জ্ঞানই স্বভাবসিদ্ধ ও অপরিহার্য। অন্যদের জন্য যুক্তির মাধ্যমে জানা যা, ইমামদের জন্য তা প্রাথমিক ও অপরিহার্য জ্ঞান, এবং তাদের জন্য যা স্বভাবসিদ্ধ, তা অন্যদের জন্য অর্জনযোগ্য নয়।


তথ্যসূত্রঃ

১। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৫৮-১৬০



Leave a comment