জারুদিয়া

এরা হল আবুল জারূদ যিয়াদ ইবনে আবু যিয়াদের অনুসারী। তাদের মতে, রাসূল (সা.) আলী (রা.)-কে নামে নয় বরং গুণাবলী দ্বারা মনোনীত করেছিলেন; এবং তিনিই নবীর পর ইমাম। বিবরণটি চিনতে ও বর্ণিত ব্যক্তিকে খুঁজে না নিয়ে মানুষ তাদের দায়িত্বে ব্যর্থ হয়েছে। তারা (সাহাবারা) নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে আবু বকর (রা.)-কে প্রতিষ্ঠিত করেছিল এবং এভাবে কাফিরে পরিণত হয়েছিল। এই মতবাদ পোষণ করার ক্ষেত্রে আবুল জারূদ তার ইমাম যায়েদ ইবনে আলীর বিরোধিতা করেছিলেন, যিনি এই বিশ্বাস রাখতেন না।

ইমামতের ব্যাঘাত ও এর ধারাবাহিকতা নিয়ে জারুদীদের মধ্যে নিজেদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। তাদের কারও কারও মতে, আলী (রা.) থেকে হাসান (রা.), হাসান (রা.) থেকে হুসাইন (রা.), হুসাইন (রা.) থেকে আলী ইবনে হুসাইন যাইনুল আবিদীন, আলী ইবনে হুসাইন থেকে তাঁর পুত্র যায়েদ ইবনে আলী এবং সর্বশেষে ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আল-হাসান ইবনে আল-হুসাইন ইবনে আলী ইবনে আবু তালিবের মাধ্যমে ইমামত ধারাবাহিকভাবে চলমান ছিল, যার ইমামতেই তারা বিশ্বাস করত। আবু হানিফা (রা.) মুহাম্মাদ (ইবনে আবদুল্লাহ)-এর কাছে বাইয়াত দেন এবং তাঁর অনুসারীদের একজন হয়ে যান। যথাসময়ে এই বিষয়টি মনসুরের গোচরে আনা হলে তিনি আবু হানিফাকে কারারুদ্ধ করেন এবং তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত বন্দী অবস্থায় রাখেন। বলা হয় যে, মনসুরের শাসনামলেই আবু হানিফা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহর কাছে বাইয়াত প্রদান করেন। যখন মুহাম্মাদ (ইবনে আবদুল্লাহ) মদিনায় নিহত হন, আবু হানিফা তাঁর বাইয়াতের প্রতি বিশ্বস্ত থাকেন, এই প্রত্যয়ে যে নবীর বংশধরের কাছেই বাইয়াত দেওয়া উচিত। এই বিষয়টি মনসুরকে জানানো হয় এবং তারপরই আমরা যা বর্ণনা করেছি তা সংঘটিত হয়।

যারা ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহর ইমামতে বিশ্বাস করত, তারা নিজেদের মধ্যেই মতভেদে বিভক্ত হয়ে পড়ে। কেউ কেউ বলতে থাকেন যে, তিনি নিহত হননি, বরং তিনি এখনও জীবিত আছেন এবং পৃথিবীকে ন্যায়পরায়ণতায় পূর্ণ করতে তিনি আবার আবির্ভূত হবেন । অন্যদের একটি দল তার মৃত্যু মেনে নিয়ে তালাকানের মুহাম্মাদ ইবনে আল-কাসিম ইবনে আলী [ইবনে উমর ইবনে আলী] ইবনে হুসাইন ইবনে আলীর দিকে ইমামত স্থানান্তরিত করে। মুহাম্মাদ (ইবনে আল-কাসিম) মু’তাসিমের শাসনামলে বন্দী হন এবং খলিফার সামনে আনা হলে, তাকে তার বাড়িতেই গৃহবন্দী করে রাখা হয় এবং সেখানেই তার মৃত্যু ঘটে। আবার অন্যদের একটি দল কুফার ইয়াহইয়া ইবনে উমরের ইমামতে বিশ্বাস করে। যখন ইয়াহইয়া বিদ্রোহ করে উঠেন এবং মানুষকে তার অনুসরণের ডাক দেন, তখন অনেকেই তার প্রতি সমবেত হন। মুস্তা’ইনের শাসনামলে তিনি নিহত হন এবং তার মাথা মুহাম্মাদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে তাহিরের কাছে আনা হয়। এই ঘটনা প্রসঙ্গে এক আলাওয়িয়া (আলী (রা.)-এর বংশধর) বলেছিলেন, ”তোমরা সেই সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে হত্যা করেছ, যিনি অশ্বারোহী ব্যক্তিদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ, অথচ আমি বিনয় করে তোমাদের কাছে নম্রতা কামনা করেছিলাম। আমাদের মধ্যে তরবারির ধারালো অস্তত্থান না নিয়ে এখন আর তোমাদের মুখোমুখি হওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব।” ইয়াহইয়ার পূর্ণ নাম ছিলঃ ইয়াহইয়া ইবনে উমর ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে হুসাইন ইবনে যায়েদ ইবনে আলী।

আর আবুল জারূদের বিষয়ে – তার নাম ছিল সুরহুব, যা তাকে দিয়েছিলেন আবু জা’ফর মুহাম্মাদ ইবনে আলী আল-বাকির। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, এটি হলো সমুদ্রে বসবাসকারী এক অন্ধ শয়তানের নাম। তার অনুসারীদের মধ্যে ছিলেন ফুদাইল আর-রাসসান ও আবু খালিদ আল-ওয়াসিতি। তাঁর অনুসারীরা আইন ও সুন্নাহ সংক্রান্ত বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ পোষণ করে। কেউ কেউ মনে করেন যে, হাসান ও হুসাইন-এর বংশধরদের কাছে থাকা জ্ঞান নবীর জ্ঞানের মতো; তাই অধ্যয়ন ছাড়াই স্বভাবগত ও অপরিহার্যভাবে এই জ্ঞান তাদের দেওয়া হয়েছে। অন্যদের একটি দল আবার দাবি করে যে, তাদের কাছে থাকা জ্ঞান অন্যরাও অংশীদার; এটি তাদের কাছ থেকেও অর্জন করা যায়, আবার অন্যদের কাছ থেকেও অর্জন করা সম্ভব।


তথ্যসূত্রঃ

১। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৩৫-১৩৬



Leave a comment