সালিহিয়া ও বত্রিয়া

সালিহিয়া হলো হাসান ইবনে সালিহ ইবনে হাইয়ের অনুসারী এবং বত্রিয়া হলো কাসির আন-নাওয়া আল-আবতারের অনুসারী। উভয়ের মতামত একই। ইমামত সম্পর্কে তাদের মতবাদ সুলাইমানিয়া দলের মতবাদের অনুরূপ, তবে তারা এ প্রশ্নে কোনো অবস্থান নেয় না যে ‘উসমান (রা.) মুমিন ছিলেন না কাফির’। তারা বলে:

“যখন আমরা উসমান (রা.)-এর পক্ষে হাদিস শুনি এবং শুনি যে তিনি জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত দশজন সাহাবির অন্তর্ভুক্ত, তখন আমরা স্বীকার করি যে অবশ্যই আমরা তার ইসলাম ও ঈমানের সঠিকতা মেনে নিতে বাধ্য এবং তিনি জান্নাতী। কিন্তু যখন আমরা তার কর্মকাণ্ডের দিকে তাকাই—যেমন উমাইয়া ও মারওয়ান বংশীয়দের শাসন করতে তার ব্যর্থতা কিংবা সাহাবায়ে কেরামের পথ থেকে সরে গিয়ে তার স্বেচ্ছাচারী আচরণ—তখন আমরা বাধ্য হই এ কথা বলতে যে, ‘আমাদের তাকে কাফির বলে ঘোষণা দিতে হবে।’তাই আমরা তার ব্যাপারে অনিশ্চিত; সুতরাং আমরা এ বিষয়ে মতামত স্থগিত রাখি এবং তা ‘সর্বোত্তম বিচারকের’ (আল্লাহর) কাছে সোপর্দ করি।”

আলী (রা.) সম্পর্কে তারা বলেঃ

নবীর পর তিনি ছিলেন সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ এবং ইমামতের জন্য সর্বাধিক যোগ্য ব্যক্তি। কিন্তু তিনি স্বেচ্ছায় নিজের অধিকার ত্যাগ করে ইমামত অন্যদের হাতে ছেড়ে দিয়েছিলেন এবং তাদের কাছে নতি স্বীকার করেছিলেন। যা নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট ছিলেন, আমরা তা নিয়েই সন্তুষ্ট; তিনি যা অনুমোদন করেছিলেন, আমরা তাই অনুমোদন করি। এর ব্যত্যয় আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। যদি আলী (রা.) সম্মতি না দিতেন, তাহলে আবু বকর (রা.) ধ্বংস হয়ে যেতেন।

সালিহিয়া গোষ্ঠী নিম্নতর গুণাবলিসম্পন্ন ব্যক্তির ইমামতের বৈধতাও স্বীকার করে, যদি উচ্চতর যোগ্যতাসম্পন্ন বা শ্রেষ্ঠতর ব্যক্তি স্বেচ্ছায় তা মেনে নেন। তাদের দাবিঃ হাসান (রা) ও হুসাইনের (রা) বংশধরদের মধ্যে যে কেউ তরবারি উন্মোচন করে (অর্থাৎ সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে) এবং একইসাথে জ্ঞানী, পরহেজগার ও বীর হয়, সে-ই ইমাম। তাদের কেউ কেউ আরও শর্তারোপ করেন যে, তাকে অবশ্যই প্রসন্ন মুখশ্রী (cheerful of countenance) সম্পন্ন হতে হবে।

যদি একই সময়ে দুজন ইমামের আবির্ভাব হয় যারা উভয়েই প্রয়োজনীয় গুণাবলিতে সমৃদ্ধ ও তরবারি ধারণকারী, তবে তারা ব্যাপকভাবে বিভ্রান্তিতে পড়ে। যদি উভয়ে এই সকল বিষয়ে সমান হনঃ
১. প্রথমে তারা দেখবে কে অধিকতর মর্যাদাশালী ও পুণ্যবান।
২. যদি উভয়ে এতে সমান হয়, তবে খুঁজবে কে বিচক্ষণতায় শ্রেষ্ঠ ও কর্মে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
৩. যদি এখানেও সমান হয়, তবে তারা উভয়কে পরস্পরের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করে এবং নিজেদের বিবেচনায় বিষয়টির পরিসমাপ্তি ঘটায়।

তাছাড়া সালিহিয়া গোষ্ঠীর মতে, যদি একই সময়ে দুজন ইমামের আবির্ভাব ঘটে, তবে ইমাম নির্বাচনের প্রক্রিয়া আবারও শুরু হবে: প্রকৃত ইমাম নেতৃত্ব দেবেন, আর ভুল দাবিদারকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে। যদি দাবিদার দুজন ভিন্ন অঞ্চলের হন, তবে প্রত্যেকে নিজ নিজ অঞ্চলের একমাত্র ইমাম হিসেবে গণ্য হবেন, এবং সে অঞ্চলের জনগণের জন্য তার আনুগত্য করা বাধ্যতামূলক হবে। এক ইমাম যদি অন্যজনের বিপরীত ফতোয়া দেন (যেমন—অপর ইমামের রক্তপাত বৈধ ঘোষণা করা), তবুও উভয়ের ফতোয়াই সঠিক বলে গণ্য হবে।

আমাদের সময়ে (হিজরী ৫০০-৫৫০ সালের দিকে) অধিকাংশ সালিহিয়া অনুসারীরা নিজস্ব মতামত (রায়) বা ব্যক্তিগত বিচার-বিবেচনা (ইজতিহাদ) ব্যবহার করতো না। ফিকহী বিষয়ে তারা ইমাম আবু হানিফার মাযহাব অনুসরণ করত, তবে কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নে তারা ইমাম শাফিঈ ও শিয়া মতের সাথে একমত ছিলো। ধর্মতাত্ত্বিক প্রশ্নে তারা মু’তাজিলা মতবাদের শিক্ষা অনুসরণ করতো; বস্তুত তারা মু’তাজিলা নেতাদের নবী বংশোদ্ভূত ইমামদের চেয়েও বেশি সম্মান করে।


তথ্যসূত্রঃ

১। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৩৭-১৩৮



Leave a comment