এরা হল সুলাইমান ইবনে জারীরের অনুসারী। তার মতে, ইমামত হল একটি এমন বিষয় যা সম্প্রদায়ের পরামর্শের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়; এমনকি দুইজন সর্বোত্তম মুসলিমের সম্মতিতেও এটি স্থির হতে পারে। তিনি আরও বলতেন যে, অধিকতর যোগ্য ব্যক্তি থাকা সত্ত্বেও কম যোগ্য ব্যক্তির ইমামতও বৈধ হতে পারে। সম্প্রদায়ের পছন্দের মাধ্যমে আবু বকর ও উমরের ইমামতের বৈধতাকেও সুলাইমান সমর্থন করতেন, যা ইজতিহাদের (যুক্তিভিত্তিক সিদ্ধান্ত) ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। যদিও মাঝে মাঝে তিনি এও বলতেন যে, আলী উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাদের কাছে বাইয়াত দেওয়ায় সম্প্রদায় ভুল করেছিল; তবে এই ভুল প্রকৃতপক্ষে ফিস্ক (পাপ) পর্যন্ত পৌঁছায়নি, বরং তা ছিল ইজতিহাদী ভুল (বিচার-বুদ্ধির ত্রুটি)। অন্যদিকে, উসমানের ব্যাপারে তিনি আক্রমণাত্মক ছিলেন, তার প্রবর্তিত নব উদ্ভাবনী বিষয়গুলোর (বিদআত) জন্য, এবং সেগুলোর কারণে তাকে কাফির বলে ঘোষণা করেন। তিনি আয়িশা, যুবায়ের ও তালহাকেও কাফির বলে আখ্যায়িত করেছিলেন, কারণ তারা আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন।
রাফেজী সম্প্রদায়কেও সুলাইমান আক্রমণ করতেন। তার মতে, রাফেজী নেতারা তাদের অনুসারীদের জন্য দুটি মতবাদ স্থির করেছিল, যার ফলে কখনও কেউ তাদের উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারত না। এর মধ্যে একটি হল তাদের ‘বাদা’ (পরিবর্তন) এর মতবাদ। যখনই তারা ভবিষ্যদ্বাণী করত যে তাদের ক্ষমতা, প্রাধান্য ও বিজয় হবে, কিন্তু তাদের ভবিষ্যদ্বাণী সত্যি না হলে তারা বলত, ‘আল্লাহর ইচ্ছায় একটি পরিবর্তন ঘটে গেছে।’ অন্যটি হল ‘তাকিয়া’ (গোপনীকরণ)। তারা মনে যা ইচ্ছা তা-ই বলত; কিন্তু যখন তাদের কাছে প্রমাণিত হত যে তা সত্য নয়, এবং তার মিথ্যাচার তাদের সামনে উন্মোচিত করা হত, তখন তারা বলত, ‘আমরা যা-ই বলি বা করি না কেন, তা ছিল কেবল তাকিয়া।’
মু’তাজিলাদের কিছু ব্যক্তি সুলাইমানের এই মতবাদ অনুসরণ করে যে, অধিকতর যোগ্য ব্যক্তি জীবিত থাকা সত্ত্বেও কম যোগ্য ব্যক্তির ইমামত বৈধ। তাদের মধ্যে ছিলেন জা’ফর ইবনে মুবাশশির, জা’ফর ইবনে হারব ও কাসির আন-নাওয়া, যিনি একজন হাদীসবিশ্বাসী ছিলেন। তাদের মতে, ইমামত হলো ধর্মের সেই দিক যা জনসাধারণের কল্যাণ সাধন করে; আল্লাহ ও তাঁর একত্বের জ্ঞান লাভের জন্য এটি আবশ্যক নয়, কারণ এই জ্ঞান যুক্তির মাধ্যমেই অর্জন করা যায়। তবে, ইমামতের প্রয়োজন ঐশ্বরিক আইন প্রয়োগের জন্য, বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে ফয়সালা করার জন্য, এতীম ও বিধবাদের দেখাশোনার জন্য, ধর্ম রক্ষার জন্য, দ্বীনী বাণী প্রচারের জন্য এবং ধর্মের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদের জন্য। তাছাড়া, ইমামতের মাধ্যমেই মুসলমানরা একটি ঐক্যবদ্ধ সংগঠন গঠন করে এবং সমাজে অনাচার দূর হয়। তাই ইমামের জন্য সমাজের সবচেয়ে জ্ঞানী ব্যক্তি হওয়া, অথবা সর্বাধিক বয়োজ্যেষ্ঠ ও প্রজ্ঞাবান হওয়া আবশ্যক নয়; কারণ কম গুণসম্পন্ন ব্যক্তির দ্বারাও সমাজের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব, যদিও প্রয়োজনীয় গুণাবলীসম্পন্ন বা তাতেও শ্রেষ্ঠতর কোনো মানুষ পাওয়া যায়।
অধিকাংশ সুন্নী আলেমও এই মতের দিকেই ঝোঁক রাখেন, এবং এমনকি তারা বলেন যে ইমামের জন্য আইনগত বিষয়ে স্বাধীন বিচার-বুদ্ধি (মুজতাহিদ) প্রয়োগের সক্ষমতা থাকা আবশ্যক নয়; তার জন্য ইজতিহাদের (যুক্তিভিত্তিক স্বাধীন সিদ্ধান্ত) সকল ক্ষেত্রের সাথে পরিচিত হওয়াও জরুরি নয়। তবে তার অবশ্যই এমন কাউকের সেবা-সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন যিনি ইজতিহাদ করার সক্ষমতা রাখেন, যার সাথে তিনি আইনগত বিষয়ে পরামর্শ করতে পারেন এবং যার মতামত তিনি হালাল-হারাম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে পারেন। তৎসত্ত্বেও, তাকে অবশ্যই সাধারণভাবে সুস্থ বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন এবং সমসাময়িক বিষয়ে গভীর দূরদর্শিতা রাখার মতো ব্যক্তি হতে হবে।
১। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১৩৬-১৩৭

Leave a comment