বায়ানিয়্যা (বায়ানী সম্প্রদায়)

আবু মাইসারা

এরাই হচ্ছেন বায়ান ইবনে সাম’আন আত-তামীমীর অনুসারী, যার কাছে আবু হাশিমের মৃত্যুর পর ইমামত স্থানান্তরিত হয় বলে তারা দাবি করে।[১,২] সে বলতো, আল্লাহ তার কথা কুরআনে বর্ণনা করেছেন[১] যেখানে আল্লাহ বলেছেনঃ ‘এটা মানুষের জন্য বায়ান (স্পষ্ট বর্ণনা) ও হিদায়াত এবং উপদেশ মুত্তাকীদের জন্য।’[৩] বায়ান ছিলেন একজন গুলুও (চরমপন্থী) যিনি আমীরুল মু’মিনীন আলী (রা)-এর ইলাহীতে বিশ্বাস করতেন।[২] তার মতে, আল্লাহর একটি অংশ (ইলাহী কণা) আলী (রা)-এর মধ্যে অবতীর্ণ হয়েছিল ও তাঁর দেহে প্রকাশিত হয়েছিল। এই ইলাহী কণার গুণেই আলী (রা) গায়েব (অদৃশ্য) জানতেন, এবং সে কারণেই যখন তিনি যুদ্ধের ফলাফল পূর্বাভাস দিতেন, ঘটনাটি ঠিক সেভাবেই সংঘটিত হতো।[২] এই একই ইলাহী কণার গুণেই তিনি কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন এবং তাদের উপর বিজয়ী হয়েছিলেন।[২] এই শক্তির জোরেই তিনি খায়বারের দরজা উপড়ে ফেলেছিলেন।[২] আলী (রা)-ই এটির ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যখন তিনি বলেছিলেন, ‘আমি খায়বারের দরজা উপড়ে ফেলেছিলাম না দৈহিক শক্তিতে, আর না খাদ্যলব্ধ শক্তি দ্বারা; বরং আমি এটা উপড়ে ফেলেছিলাম ইলাহী শক্তিতে, যা আল্লাহ প্রদত্ত এবং যা নূর (আলো) দ্বারা উদ্ভাসিত।’[২] আলী (রা)-এর এই আসমানী শক্তিকে একটি মিসবাহ (বাতি)-এর সাথে তুলনা করা যায় যা একটি মিশকাত (কুলুঙ্গি)-এ স্থাপিত, যেখানে ইলাহী নূর নিজেই হচ্ছে সেই বাতির আলো।[২]

বায়ান বলতেন যে, সম্ভবত আলী (রা) কোনো এক সময় আবার আবির্ভূত হবেন।[২] আল্লাহর বাণী: ‘তারা কি অপেক্ষা করে যে, আল্লাহ তাদের কাছে আসবেন মেঘের ছায়ায়?[৪] – তিনি এর ব্যাখ্যা করেছেন এই আয়াত আলী (রা)-এর প্রসঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। আলী (রা)-ই হচ্ছেন তিনি যিনি মেঘের স্তরে স্তরে আবির্ভূত হবেন, যেখানে বজ্রধ্বনি হবে তাঁর কণ্ঠস্বর এবং বিদ্যুৎচমক হবে তাঁর হাসি।[২] বায়ান আরও দাবি করতেন যে, এই ইলাহী কণা তানাসুখ (আত্মার transmigration/পুনর্জন্ম)-এর মাধ্যমে তার নিজের মধ্যে স্থানান্তরিত হয়েছে, এবং এই কারণেই ইমামত ও খিলাফতের অধিকার তারই ছিল। এই একই কণার গুণেই আদম (আ.) ফেরেশতাদের সিজদার যোগ্য হয়েছিলেন।[২]

বায়ান আরও দাবি করতেন যে, আল্লাহ মানুষের আকৃতিতে রয়েছেন, তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ও অংশবিশেষ (মানুষের) অনুরূপ।[২] তিনি এও বলতেন যে, তাঁর চেহারা (ওয়াজহ) ব্যতীত সবকিছুই সম্পূর্ণরূপে বিনাশপ্রাপ্ত হবে;[২] যেমন আল্লাহ নিজেই বলেছেন, ‘তাঁর চেহারা (ওয়াজহ) ছাড়া সবকিছুই সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হবে।’[৫] এই সব আজগুবি ও উদ্ভট মতবাদ সত্ত্বেও, বায়ান মুহাম্মাদ ইবনে আলী ইবনুল হুসাইন আল-বাকিরের কাছে চিঠি লিখে তাকে তার আনুগত্য স্বীকার করার আহ্বান জানান এবং এতে যোগ করেন: ‘তুমি ইসলাম গ্রহণ কর, তাহলে রক্ষা পাবে। যে ব্যক্তি আত্মসমর্পণ করবে, তাকে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত করা হবে; কেননা তুমি জান না আল্লাহ কাকে নবুয়ত দান করতে পারেন।’[২] বাকির (রহ) বায়ানের প্রেরিত বার্তাবাহককে যে কাগজটি এনেছিল তা খেয়ে ফেলতে আদেশ দেন এবং সে তা খেয়ে ফেলার পর সে মারা যায়। সেই বার্তাবাহকের নাম ছিল উমর ইবনে আবু আফিফ।[২]

এরাই সেই দল যারা সর্বপ্রথম কুরআন সৃষ্টির বিষয় সামনে আনে।[১]

বায়ানের চারপাশে একদল অনুসারী জমায়েত হয়, যারা তার কাছে বাই’আত (আনুগত্যের শপথ) গ্রহণ করে এবং তাঁর শিক্ষা মেনে নেয়। তবে, খালিদ ইবনে আবদুল্লাহ আল-কাসরীর নির্দেশে তাঁর মতবাদের কারণে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।[২] বলা হয় যে, তাঁকে মা’রুফ ইবনে সাঈদ নামে পরিচিত আল-কুফির সাথে পুড়িয়ে মারা হয়।[২]


তথ্যসূত্রঃ

[১] আবু মুহাম্মদ ইবনে কুতায়বা, তাবিল আল হাদীস, পৃষ্ঠাঃ ১২৪, আল মাকতাবা আল ইসলামী

[২। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১২৬

[৩] কুরআন, সূরা আল ইমরান, আয়াত ১৩৮

[৪] কুরআন, সূরা বাকারা: ২:২১০

[৫] কুরআন, সূরা আল-কাসাস, আয়াত ৮৮



Leave a comment