এরা মুখতার ইবনে আবি উবাইদ আস-সাকাফির অনুসারী। মুখতার প্রথমে খারিজি ছিলেন, পরে যুবাইর ইবনুল আওয়ামের অনুসারী হন এবং সর্বশেষে কাইসানি শিয়া মতাদর্শ গ্রহণ করেন। তিনি আমিরুল মুমিনিন আলী (রা.)-এর পর মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার ইমামত বিশ্বাস করতেন, যদিও কিছু বর্ণনা মতে তার মতে মুহাম্মাদ (ইবনুল হানাফিয়া) সরাসরি আলী (রা.)-এর পরে নয় বরং হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর পর ইমাম ছিলেন। তিনি মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার পক্ষে প্রচারকার্য চালাতেন এবং নিজেকে তাঁর অনুসারী ও প্রতিনিধি বলে দাবি করতেন। তিনি অনেক মিথ্যা ও ভ্রান্ত ধারণা প্রচার করেন যা তিনি মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার নামে চালাতেন। যখন মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া এ ব্যাপারে জানতে পারেন, তিনি মুখতারের থেকে নিজেকে দূরত্ব রাখেন এবং তাঁর অনুসারীদের বলেন যে এই লোকটি শুধুমাত্র নিজের উদ্দেশ্য সাধন ও জনসমর্থন অর্জনের জন্য মানুষদের মধ্যে এসব মতবাদ ছড়িয়ে দিচ্ছে।
মুখতার দুটি কারণে সাফল্য লাভ করেছিলেনঃ
প্রথমত, তিনি তাঁর জ্ঞান ও প্রেরিতত্ব উভয়ই মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার নামে আরোপ করেছিলেন; দ্বিতীয়ত, তিনি হুসাইন ইবনে আলী (রা.)-এর রক্তের প্রতিশোধ গ্রহণের লক্ষ্য নিজ কাঁধে নিয়েছিলেন, এবং তাঁকে হত্যায় জড়িত জালিমদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে দিনরাত নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন।
মুখতার এই মত পোষণ করতেন যে, আল্লাহর ইচ্ছা বা সিদ্ধান্তে পরিবর্তন (বাদা) হতে পারে। ‘বাদা’ শব্দটি বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা যায়ঃ
প্রথমত, এটি জ্ঞানের পরিবর্তন হিসেবে ব্যাখ্যাত হতে পারে – অর্থাৎ আল্লাহ এমন জ্ঞান লাভ করতে পারেন যা তাঁর পূর্ববর্তী জ্ঞানের বিপরীত (কোনো যুক্তিবাদী মানুষ এমন মত পোষণ করবেন বলে আমি মনে করি না);
দ্বিতীয়ত, ইচ্ছা সম্পর্কিত স্পষ্টীকরণ হিসেবে – অর্থাৎ আল্লাহ বুঝতে পারেন যে, তিনি পূর্বে যা ইচ্ছা ও নির্ধারণ করেছিলেন তার বিপরীতটিই বাস্তবে সঠিক;
তৃতীয়ত, নির্দেশের পরিবর্তন হিসেবে – অর্থাৎ আল্লাহ কোনো বিষয়ের নির্দেশ দিতে পারেন এবং পরে তার বিপরীত নির্দেশ দিতে পারেন।
যারা নির্দেশের রদবদল (নসখ) মানে না, তারাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নির্দেশ [কেবল] পর্যায়ক্রমিকভাবে আসে বলে মত পোষণ করে।
মুখতার বাদা-এর ধারণা গ্রহণ করেছিলেন এই দাবির ভিত্তিতে যে, তিনি আসন্ন ঘটনাবলী জানতেন – হয় তাঁর নিকট অহীর মাধ্যমে, নয়তো ইমামের কাছ থেকে প্রাপ্ত বার্তার মাধ্যমে। যখনই তিনি তাঁর অনুসারীদের কোনো ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণী করতেন এবং ফলাফল তাঁর কথার সাথে মিলে যেত, তখন তিনি এটিকে তাঁর প্রেরিতত্বের সত্যতার প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করতেন। কিন্তু যখন ফলাফল ভিন্ন হতো, তখন তিনি বলতেন যে আল্লাহ তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছেন। এভাবে তিনি নির্দেশের রদবদল (নসখ) ও বদা-র মধ্যে কোনো পার্থক্য করতেন না, বরং সরলভাবে বলতেনঃ “যদি নির্দেশের রদবদল সম্ভব হয়, তবে ভবিষ্যত ঘটনার ভবিষ্যদ্বাণীর পরিবর্তনও সম্ভব।”
বর্ণিত আছে যে, মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া মুখতারের কাছ থেকে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে নেন যখন তিনি শুনলেন যে সে মানুষকে প্রতারণা করছে এবং তাদের এ বিশ্বাস জন্মাতে চেষ্টা করছে যে সে তার (ইবনুল হানাফিয়ার) সমর্থক ও প্রেরিত দূত। মুখতারের প্রবর্তিত ভ্রান্তি ও প্রতারণামূলক বিষয়াবলী থেকেও তিনি নিজেকে দূরে রাখেন; যেমন এর অন্তর্ভুক্ত ছিল তার মিথ্যা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ও বিকৃত কল্পনাপ্রসূত ধারণাসমূহ।
এমনই এক কল্পনাপ্রসূত বিষয় ছিল তার রাখা একটি পুরনো চেয়ার সম্পর্কে, যা ছিল রেশমি ব্রোকেড দিয়ে মোড়া ও নানাভাবে সজ্জিত। এ প্রসঙ্গে সে বলত, ‘এটি আমিরুল মুমিনিন আলী (রা.)-এর গুপ্তধনসমূহের একটি; আমাদের কাছে এর মর্যাদা ইহুদীদের কাছে তাবুতের (সাকিনার) মতো।’
সুতরাং, মুখতার যখন তার শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেত, তখন সে সেই চেয়ারটি তার সৈন্যদলের মাঝখানে স্থাপন করত যেখানে তারা যুদ্ধের জন্য কাতারবদ্ধ হতো। তারপর সে তাদের বলত, ‘যুদ্ধে অগ্রসর হও; সাফল্য, বিজয় ও কর্তৃত্ব তোমাদেরই হবে। তোমাদের মধ্যকার এই চেয়ারটি বনি ইসরাইলের তাবুতের মতো। এতে রয়েছে প্রশান্তি ও নিরাপত্তা; এবং তোমাদের সাহায্য করতে উপর থেকে ফেরেশতারা তোমাদের কাছে নেমে আসবেন ।’
সাদা কবুতরগুলোর কাহিনীও সুবিদিত, যেগুলো আকাশে দেখা দিয়েছিল যখন মুখতার তার সৈন্যদের ঘোষণা করেছিল যে ফেরেশতারা সাদা কবুতরের রূপে তাদের কাছে আসবে।
মুখতারের রচনা করা দক্ষ ছন্দবদ্ধ কবিতাগুলোও সমভাবে পরিচিত। জনগণের মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার প্রতি প্রবল আস্থা এবং তাদের হৃদয়ে তাঁর জন্য অকুণ্ঠ ভালোবাসা দেখেই মুখতার নিজেকে তাঁর সাথে যুক্ত করতে প্ররোচিত হয়েছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্য ও গভীর জ্ঞানের অধিকারী, একজন তীক্ষ্ণ চিন্তাবিদ এবং সুস্থিত ব্যবহারিক বিচারবুদ্ধিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। আমিরুল মুমিনিন আলী (রা.) তাঁকে বিভিন্ন ধরনের আসন্ন সংঘাতসমূহের কথা বলেছিলেন এবং ‘পথের চিহ্নসমূহ’ সম্পর্কিত জ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন। তবে তিনি প্রকাশ্য জীবন থেকে নিভৃতিকেই বেছে নিয়েছিলেন এবং খ্যাতির চেয়ে অনালোকিত অবস্থানকেই প্রাধান্য দিয়েছিলেন। বলা হয় যে, ইমামতের জ্ঞান তাঁর কাছে এই মর্মে আমানতস্বরূপ দেওয়া হয়েছিল যে তিনি তা যোগ্য ব্যক্তির কাছে হস্তান্তর করবেন; এই পৃথিবী থেকে চলে যাওয়ার আগে তিনি এ জ্ঞানকে তার যথাস্থানেই জমা রেখে গিয়েছিলেন।
আস-সাইয়্যিদ আল-হিময়ারি এবং কবি কুসাইর ‘আযযা ছিলেন মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত। কুসাইর তাঁর সম্পর্কে নিম্নোক্ত পঙ্ক্তিগুলো রচনা করেছিলেনঃ
“চিন্তা কর, কুরাইশ বংশীয় ইমামগণ, যারা সত্যের অধিকারী, তাদের সংখ্যা মাত্র চার – আলী ও তাঁর তিন পুত্র। এই তিনজন হলেন [নবী মুহাম্মাদের] দৌহিত্র, যাদের বিষয়ে কোনো প্রকার অস্পষ্টতা নেই। একজন দৌহিত্র ছিলেন ঈমানদার ও সৎকর্মশীল; অপরজন কারবালায় সমাহিত; এবং তৃতীয়জন মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবেন না, যতক্ষণ না তিনি তাঁর অশ্বারোহী বাহিনীর অগ্রভাগে তাঁর পতাকা সম্মুখে রেখে অগ্রসর হন। তিনি রাদওয়া পর্বতে গোপনে চলে গেছেন, যেখানে তিনি মধু ও পানি দ্বারা জীবিত রয়েছেন, এবং কিছুকালের জন্য তিনি মানুষের মধ্যে দৃষ্টিগোচর হবেন না।”
আল-হিময়ারিও বিশ্বাস করতেন যে মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়া মৃত্যুবরণ করেননি, বরং তিনি রাদওয়া পর্বতেই রয়েছেন, যেখানে তাঁকে দুই পাশ থেকে একটি সিংহ ও একটি চিতাা রক্ষা করছে, এবং নিকটেই রয়েছে দুটি প্রস্রবণ যা প্রচুর পরিমাণে পানি ও মধু প্রবাহিত করছে; তিনি তাঁর গোপণাবস্থা থেকে ফিরে আসবেন এবং পৃথিবীকে ন্যায়পরায়ণতায় পূর্ণ করবেন যেমনটি এটি এখন অত্যাচারে পূর্ণ। এটিই ছিল গোপণ (গায়বা) ও গোপণ থেকে প্রত্যাবর্তন (রুজু’) এর শিয়া মতবাদের প্রথম আবির্ভাব। এটি একটি এমন মতবাদ যা কিছু শিয়াদের মধ্যে বহাল থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তারা এটিকে ধর্মের অংশ, এবং প্রকৃতপক্ষে শিয়া মতবাদের একটি স্তম্ভ হিসাবে দেখতে থাকে। মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার মৃত্যুর পরে, ইমামতের ধারাবাহিকতার প্রশ্নে কাইসানিয়ারা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন শাখায় বিভক্ত হয়ে যায়।
তথ্যসূত্রঃ
১। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১২৬-১২৮

Leave a comment