হাশিমিয়া

এরা হলো আবু হাশিম ইবনে মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার অনুসারী। তাদের মতে, মুহাম্মাদ (ইবনুল হানাফিয়া) ইন্তেকাল করেছেন এবং ইমামত তাঁর পুত্র আবু হাশিমের কাছে স্থানান্তরিত হয়েছ।

আবু হাশিম তাঁর পিতার নিকট গূঢ় বিজ্ঞানসমূহের রহস্যাবলি শিক্ষা লাভ করেছিলেন। তাঁকে শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল আসমানী আধ্যাত্মিক জগৎ ও আত্মাসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক; আরও শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল কিভাবে রূপক ব্যাখ্যার মাধ্যমে ওহীর অর্থ বুঝতে হয়, বাহ্যিক (যাহির) ও আধ্যাত্মিক/আন্তরিক (বাতিন) এর মধ্যকার সংযোগ কীভাবে উপলব্ধি করতে হয়। হাশিমিয়াদের বিশ্বাস হলো যে, প্রতিটি বাহ্যিক রূপের (যাহির) নিচেই একটি আধ্যাত্মিক/গূঢ় অর্থ (বাতিন) বিদ্যমান; প্রতিটি ব্যক্তিরই একটি আত্মা রয়েছে; প্রতিটি ওহীরই একটি ব্যাখ্যা (তাবিল) রয়েছে; এই দুনিয়ার প্রতিটি প্রতীকেরই অদৃশ্য জগতে একটি আদিরূপ (প্রোটোটাইপ) রয়েছে। সমগ্র দুনিয়াতে বিস্তৃত সকল প্রজ্ঞা ও রহস্য একত্রিতভাবে একটি মানব সত্ত্বার মধ্যেই পাওয়া যায়। এই জ্ঞানই আলী (রা.) তাঁর পুত্র মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফিয়্যার জন্য সংরক্ষণ করেছিলেন, যিনি আবার এর রহস্য তাঁর পুত্র আবু হাশিমের কাছে হস্তান্তর করেন। যে কেউ এই জ্ঞানের অধিকারী, তিনিই সত্যিকারের ইমাম।

আবু হাশিমের পর তার অনুসারীরা পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে যায়।

দল-১ঃ এক দল দাবি করে যে, আবু হাশিম সিরিয়া থেকে ফেরার পথে খারিজি অঞ্চলে মৃত্যুবরণ করেন এবং তিনি মুহাম্মদ ইবনে ‘আলী ইবনে ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘আব্বাসকে তার উত্তরসূরি নিযুক্ত করে যান। এরপর এই নিযুক্তি ‘আব্বাসের বংশধরের মধ্যে হস্তান্তরিত হয় এবং এভাবেই খিলাফত আব্বাসীয়দের কাছে চলে আসে। তদুপরি, আব্বাসীয়রা দাবি করত যে, নবীর সাথে তাদের নিকটতম রক্তের সম্পর্কের কারণে খিলাফত যথার্থভাবে তাদেরই প্রাপ্য; কারণ নবী যখন মৃত্যুবরণ করেন, তখন তাঁর চাচা ‘আব্বাসই ছিলেন নিকটতম আত্মীয়, যার উত্তরাধিকারের অধিকার ছিল। দল-২ঃ আরেক দলের মতে, আবু হাশিমের মৃত্যুর পর ইমামতের অধিকার তার ভাইয়ের ছেলে হাসান ইবনে ‘আলী ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আল-হানাফিয়ার প্রাপ্য।

দল-৩ঃ তবে একটি তৃতীয় দল এটি অস্বীকার করে। তাদের মতে, আবু হাশিম তার ভাই ‘আলী ইবনে মুহাম্মদকে নিযুক্ত করেছিলেন, এবং তিনি আবার তার ছেলে হাসানকে নিযুক্ত করেন; অতএব, ইমামত আল-হানাফিয়ার বংশধরদেরই প্রাপ্য এবং অন্যদের কাছে স্থানান্তরিত হয়নি।

দল-৪ঃ আরেক দল বলত যে, আবু হাশিম ‘আবদুল্লাহ ইবনে ‘আমর ইবনে হারব আল-কিন্দীকে নিযুক্ত করেছিলেন, এবং সেই কারণে ইমামত আবু হাশিম থেকে ‘আবদুল্লাহর কাছে স্থানান্তরিত হয়, যার মধ্যে আবু হাশিমের আত্মা প্রবেশ করেছিল।

দল-৫ঃ তবে এই ব্যক্তির [৪র্থ দলের ইমাম আবদুল্লাহ] কোনো জ্ঞান বা ধার্মিকতা ছিল না; এবং তার কিছু অনুসারী তার অসাধুতা ও প্রবঞ্চনা বুঝতে পেরে ত্যাগ করে এবং তার পরিবর্তে ‘আবদুল্লাহ ইবনে মু‘আবিয়া ইবনে ‘আবদুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে আবু তালিবের ইমামতকে সমর্থন করে।

‘আবদুল্লাহ [ইবনে ‘আমর ইবনে হারব]-এর কিছু মতবাদ নিম্নরূপ: আত্মাসমূহ স্থানান্তরের (তানাসুখ) মাধ্যমে এক দেহ থেকে অন্য দেহে স্থানান্তরিত হয় এবং এই দেহগুলির মাধ্যমে, সেটি মানুষ হোক বা পশু হোক, পুরস্কার বা শাস্তি লাভ করে। আল্লাহর আত্মাও একটি অবিচ্ছিন্ন স্থানান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গিয়েছে, অবশেষে তা ‘আবদুল্লাহর মধ্যে পৌঁছায় এবং তার মধ্যে সাকার বা অবতীর্ণ হয়। সেই অনুসারে, ‘আবদুল্লাহ প্রভুত্ব ও নবুওয়াত উভয়ই দাবি করেন, পাশাপাশি অদৃশ্যের জ্ঞানেরও দাবি করেন। তার মূর্খ অনুসারীরা তাকে উপাসনা করত, পুনরুত্থানকে অস্বীকার করত এবং তার পরিবর্তে এই পৃথিবীতেই আত্নার স্থানান্তরে বিশ্বাস করত, এখানে গৃহীত রূপগুলির মাধ্যমে পুরস্কার ও শাস্তি প্রদানের মাধ্যমে। আল্লাহর বাণী: “যারা বিশ্বাস স্থাপন করে ও সৎকাজ করে, তারা যা ভক্ষণ করেছে তার জন্য তাদের কোনো পাপই গণ্য হবে না, যদি তারা আল্লাহ্কে ভয় করে,” [১] – ‘আবদুল্লাহ এই আয়াতের এই অর্থ ব্যাখ্যা করতেন যে, যে কেউ ইমামকে খুঁজে পায় এবং তাকে স্বীকার করে, সে যা-ই খাক না কেন, সে দোষমুক্ত এবং তার পূর্ণতা লাভ করে।

‘আবদুল্লাহ থেকেই ইরাকে খুররামীয়ামাজদাকীয়া নামক দুইটি উপ-দলের উদ্ভব হয়।সে খুরাসানে মারা গেলে তার অনুসারীরা নিজেদের মধ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। কেউ কেউ বলল যে, তিনি মারা যাননি, বরং তিনি জীবিত এবং তিনি ফিরে আসবেন; অন্যদের মতে, তিনি মারা গেছেন, এবং তার আত্মা ইসহাক ইবনে যায়েদ ইবনে আল-হারিস আল-আনসারীর মধ্যে চলে গেছে। পরবর্তী দলটি হলো হারিসীয়া, যারা অবৈধকে বৈধ বলে ঘোষণা করে এবং যেন কোনো ধর্মীয় বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ নয় এমনভাবে তাদের জীবন যাপন করে। ‘আবদুল্লাহ ইবনে মু‘আবিয়া-র অনুসারী এবং মুহাম্মদ ইবনে ‘আলী-র অনুসারীদের মধ্যে ইমামত সম্পর্কে তীব্র মতপার্থক্য রয়েছে। উভয়ই দাবি করে যে, তাদের নেতাকে আবু হাশিম নিযুক্ত করেছিলেন, যদিও তারা কোনো সঠিক ভিত্তিতে তাদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়নি।


টীকাঃ

[১]কুরআন, সূরা আল-মায়িদা (৫), আয়াত ৯৩


তথ্যসূত্রঃ

১। শাহারাস্তানি, কিতাব আল মিলাল ওয়া আন নিহাল, ইংরেজি থেকে বাংলা অনুবাদঃ আবু মাইসারা, পৃষ্ঠাঃ ১২৮-১৩০



Leave a comment