মেনু

আমিরুল মুমিনীন উসমান রা এর উপাধি

আশ শহীদ ( شَهِيدُُ)

আমিরুল মুমিনীন উসমান রা এর অন্যতম উপাধি ছিলো শহীদ যা স্বয়ং রাসূল (ﷺ) তাকে দিয়েছিলেন এবং বারবার তা বলেছিলেন। উহুদ পাহাড়ে আরোহিত অবস্থায় তিনি (ﷺ) বলেছিলেনঃ

মুহাম্মদ ইবনু বাশশার (রহঃ) … আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, (একবার) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবূ বকর, উমর, উসমান (রাঃ) উহুদ পাহাড়ে আরোহণ করেন। পাহাড়টি নড়ে উঠল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, হে উহুদ, স্থির হও। তোমার উপর একজন নবী, একজন সিদ্দীক ও দু’জন শহীদ রয়েছেন (অর্থাৎ, উমর ফারুক (রা) ও উসমান আশ শহীদ (রা)।[১]

আরেকদিন হেরা পাহাড়ে আরোহিত অবস্থায় তিনি (ﷺ) উসমান (রা)-কে আশ শহিদ বলে সম্বোধন করেন। আমিরুল মুমিনীন উসমান (রা) তার শাহাদাতের আগে বিদ্রোহীদেরকে রাসূল (ﷺ)- এর এই উপাধির কথা স্মরণ করিয়ে দেন। মুসনাদে আহমদে [২]বর্ণিত আছেঃ

আবু সালামা বিন আবদুর রহমান বলেন, উসমান (রাঃ) যখন অবরুদ্ধ, তখন প্রাসাদ থেকে নিচের দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, আমি আল্লাহর কসম দিয়ে জিজ্ঞেস করি, হেরার দিনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে কে ছিল, যখন পাহাড় কেঁপে উঠলো? তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে পা দিয়ে লাথি মারলেন, তারপর বললেন, থামো হেরা, তোমার ওপরে একজন নবী, একজন সিদ্দিক (অর্থাৎ, আবু বকর সিদ্দীক রা) ও একজন শহীদ ছাড়া আর কেউ নেই। তখন আমি তার সাথেই ছিলাম। উসমানের এ কথায় অনেকেই কসম খেয়ে সমর্থন জানালো।

যুননুরাইন (ذوالنورين)

উসমান (রা.)-এর উপাধি ছিল যুননুরাইন (ذوالنورين) বা “দুই জ্যোতির অধিকারী”। তাঁকে দুই জ্যোতির অধিকারী বা যুন নুরাইন কেন বলা হয়? কারণ তিনি মুসলমান হওয়ার পর প্রথমে মহানবী (ﷺ) -এর কন্যা রুকাইয়া (রা)-কে বিবাহ করেন। তাঁর (রা) মৃত্যুর পর তিনি মহানবী (ﷺ) -এর আরো এক কন্যা উম্মু কুলসুম (রা)-কে বিবাহ করেন। এ কারণেই উসমান (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-এর সম্মানিত উপাধি যুন নুরাইন’ বা “দুটো জ্যোতির অধিকারী” বলে অভিহিত হন।

উসমান ﷺ ‘যুন-নুরাইন’ (দুই নূরের অধিকারী) উপাধিতে পরিচিত ছিলেন। বদরুদ্দীন আল-আইনি তাঁর সহীহ বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেছেন যে, একবার আল-মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরাহকে[*] জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল: “উসমানকে কেন যুন-নুরাইন বলা হত? তিনি উত্তরে বললেন: কারণ নবী-কন্যাদ্বয়কে বিবাহ করার মতো কোনো ব্যক্তি আমরা তাকে ছাড়া আর কাউকে জানি না।” [৩]

আল-মুহাল্লাব ইবনু আবি সুফরাহ্ বলেন, ‘আমি কয়েকজন সাহাবীকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘আপনারা কেন বলেন যে উসমান (রা.) আমাদের অনেক উপরে? তাঁরা জবাব দিলেন, ‘কারণ উসমান (রা.) ব্যতীত প্রাচীন বা বর্তমান পৃথিবীর অন্য কেউ কোন নবীর দুই কন্যাকে বিয়ে করতে পারেনি।’[৪]

আবদুল্লাহ ইবনে উমর ইবনে আবান আল-জু’ফি বর্ণনা করেন: “আমার মামা হুসায়ন আল-জু’ফি আমাকে বললেন: হে প্রিয় পুত্র, তুমি কি জান উসমানকে কেন যুন-নুরাইন বলা হত? আমি বললাম: আমি জানি না। তিনি বললেন: আল্লাহ আদমকে সৃষ্টি করেছেন থেকে শুরু করে কিয়ামত সংঘটিত হওয়া পর্যন্ত—কোনো সময়েই উসমান ছাড়া অন্য কেউ কোনো নবীর দুই কন্যাকে বিবাহ করেননি। এজন্যই তাকে যুন-নুরাইন উপাধি দেওয়া হয়।”[৫]

আল-হাসান-এর সূত্রে আয-যাহাবী উল্লেখ করেছেন যে, আল্লাহ্ আদমকে সৃষ্টি করার পর থেকে এ পর্যন্ত উসমান (রা.) তিনি অন্য কোন পুরুষ কোন নারীর দুই কন্যাকে বিয়ে করার সৌভাগ্য অর্জন করেননি। আর মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) যেহেতু শেষ নবী, সেহেতু কিয়ামত পর্যন্ত কারো পক্ষের কোন নবীর দুই কন্যাকে বিয়ে করা সম্ভব হবে না। এ কারণে উসমান (রা.)-কে যুননুরাইন বা দুই নুর-এর অধিকারী বলা হয়।[৬]

উসমান (রা.)-এর এই উপাধির বিষয়ে কেউ কেউ ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন : ‘তিনি প্রতি রাতে সালাতে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কুরআন তিলাওয়াত করতেন। এজন্য তাকে যুননুরাইন বলা হয় : কুরআন একটি নূর, অন্য নূর হল রাতের সালাত।’[৭]

গণী

কুরাইশদের সাধারণ পেশা ছিল ব্যবসা। ব্যবসায়-বাণিজ্যে তিনি খুব সুনাম অর্জন করেছিলেন। মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে সূরা লিঈলাফের মধ্যে গ্রীষ্ম ও শীত মৌসুমে কুরাইশদের ঠাট্টা-বিদ্রুপের কারণে আমিরুল মুমিনীন উসমান (রাযিয়াল্লাহু ‘আনহু)-ও ব্যবসাকে জীবিকার মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছিলেন। রবিয়া ইবনে হারেস-এর সাথে শরিক হয়ে বিশাল আকারে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করে দেন। ব্যবসায় তিনি এমন প্রসিদ্ধি ও সফলতা লাভ করেন যে, তিনি উসমান গণি উপাধিতে ভূষিত হন।


টীকাঃ

[*] তিনি ছিলেন আল-মুহাল্লাব ইবনে আবি সুফরাহ আল-আযদী আল-আক্বালী, একজন মহান সেনাপতি। মু’আবিয়া (রা)-এর খিলাফতকালে আল-মুহাল্লাব ভারত আক্রমণ করেছিলেন এবং তিনি ইবনুয যুবায়র (রা)-এর একজন গভর্নর ছিলেন। আবদুল মালিক ইবনে মারওয়ানের খিলাফতকালে তিনি খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন, অতঃপর ৭৯ হিজরিতে তিনি খোরাসানের গভর্নর হন। খাওয়ারিজদের বিরুদ্ধে তাঁর যুদ্ধের জন্য তিনি বিখ্যাত। তিনি ৮৩ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। দেখুন: ওয়াফিয়াতুল আ’য়ান, ৫/৩৫০; সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ৪/৩৮৩।


তথ্যসূত্রঃ

[১] সহীহ বুখারী,হাদীসঃ ৩৬৭৫, সুনানে তিরমিযি, হাদীসঃ ৩৬৯৭

[২] মুসনাদে আহমদ, ভলিঃ১,হাদীসঃ ৪২০

[৩] বদরুদ্দীন আইনী, উমদাতুল কারী শরহে সহীহুল বুখারী, ১৬/২০১

[৪] ইবনু কাসীর, আল-বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ (কায়রো: মাতবা’আতুস সা’আদাহ, তাবি), ৭:২১২

[৫] সুনান আল বায়হাকী,৭/৭৩। ড. আ’তিফ লামাদাহ বলেনঃ ইহা একটি হাসান বর্ণনা।

[৬] আয-যাহাবী, তারীখ ৩ঃ৯৩

[৭] ‘আব্বাস আল-আক্কাদ, উসমান ইবনু ‘আফফান যুননূরাইন, পৃ. ৭৯।



Leave a comment