আবু মাইসারা
পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় ইসমাইল বিন জাফর সাদিককে নিজেদের সপ্তম ইমাম দাবি করত। ১৩৯ হিজরি সালে (৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে) ইসমাইলের পূত্র মুহাম্মদ বিন ইসমাইল ইমামত কবুল করে ইসমাইলিয়া সম্প্রদায় দাবি করে যে, তিনি আত্মগোপন করে আছেন এবং অতি শীঘ্রই ইমাম মাহদি নামে আত্মপ্রকাশ করে পৃথিবীতে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। এ সময় আব্বাসি খিলাফতের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ইয়ামেন, ইরাক, আরব উপদ্বীপের পূর্বাংশ ও পারস্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামাইলিয়া মতাদর্শের প্রচারকরা ব্যাপক পরিসরে কাজ করতে থাকে। ইরাক ও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন অঞ্চলে (বাহরাইন ও খোরাসান) ইসলামাইলিয়া মতাদর্শ প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন হামদান বিন কারামাত। ইতিহাসে হামদান বিন কারামাতের অনুসারীরাই ‘কারামাতিয়া’ নামে পরিচিত হয়। কারামাতিয়া গোষ্ঠী বিভিন্ন সময় বাহরাইন, ইয়ামেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে স্বতন্ত্র রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে।[১]
আল্লাম ইবনে কাসীর (রহ) তার আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ কিতাবে ২৭৮ হিজরীর ঘটনাবলী সম্পর্কে বলেনঃ[২]
এই হিজরী সনে কারামাতী সম্প্রদায় মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এরা ছিল যিন্দীক ও নাস্তিক্যবাদী সম্প্রদায়। তারা সেই সব লোকের দর্শন অনুসরণ করে যারা বিশ্বাস করত যে, যারদাশ ও মুযদিক দুজনী নবী ছিল। এরা দুজন হারাম বিষয়গুলো হালাল বলে ফতোয়া দিত। এরপর তারা তাদের অনুসারীদেরকে সরাসরি বাতিল ও কুফরীর দীক্ষা দিত। রাফিজী সম্প্রদায়ের সহায়তায় তারা বেশি অরাজকতা সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং রাফিজী সম্প্রদায়ভুক্ত লোকই বেশির ভাগ তাদের দলে যোগ দিয়েছে। কারণ রাফিকীদের বিবেক-বুদ্ধি কম। তাদেরকে ইসলামইলিয়াও বলা হয়। কারণ তারা নিজেদেরকে জাফর সাদিক (র.)-এর পুত্র ইসমাইল আল-আরাজের অনুসারী বলে দাবি করে। তারা কারামাতী সম্প্রদায় নামেও পরিচিত। কারণ তারা নিজেদেরকে কারামাত ইবন আশআছ আল-বিকারকের অনুসারী বলে পরিচয় দেয়। কেউ কেউ বলে যে, তাদের নেতা প্রথম ধাপে যারা তার অনুসরণ করে তাদেরকে রাতে-দিনে মিলিয়ে ৫০ (পঞ্চাশ) ওয়াক্ত সালাত আদায়ের নির্দেশ দেয়। এটি ছিল তার গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ব্যাপারে আপাতত তাদেরকে অন্ধকারে রাখার কৌশল। এরপর সে ১২ জন নেতা মনোনীত করে এবং তার লক্ষ্য বাস্তবায়নে একটা নীতিমালা তৈরী করে এবং তার অনুসারীদেরকে আহলে বায়ত-এর নেতৃত্ব মেনে নেয়ার আহবান জানায়। এরা বাতিনী সম্প্রদায় নামেও পরিচিত। কারণ তারা মুখে রাফিজী কথাবার্তা বলে কিন্তু অন্তরে সাচ্চা কুফরী পোষণ করে। তারা খাররামী এবং বাবুকী সম্প্রদায় নামেও পরিচিত। এতদ্দারা তারা নিজেদেরকে খলীফা মু‘তাসিমের আবির্ভূত হওয়া ও নিহত হওয়া বাবুক খাররামী’র অনুসারী বলে ইঙ্গিত দেয়। তারা মুহাম্মিরা বা লাল বাহিনী নামেও পরিচিত। কারণ আব্বাসীদের কালো প্রতীকের বিরুদ্ধে তারা সর্বদা লাল প্রতীক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা তালিমিয়া নামেও পরিচিত। এজন্য যে, তারা নিষ্পাপ ইমাম থেকে তালীম প্রাপ্ত হয় বলে দাবি করে। তাদেরকে সপ্তগ্রহীও বলা হয়। কারণ তারা বিশ্বাস করে, সপ্তগ্রহের পরিকল্পনায় এই জগৎ পরিচালিত হয় (তাদের প্রতি আল্লাহর লানত)। এই সপ্তগ্রহ হল প্রথম কক্ষপথে চাঁদ, দ্বিতীয় কক্ষপথে বুধ, তৃতীয় কক্ষপথে শুক্র, চতুর্থ কক্ষপথে সূর্য, পঞ্চম কক্ষপথে মঙ্গল, ষষ্ঠ কক্ষপথে বৃহস্পতি এবং ৭ম কক্ষপথে চলমান রয়েছে শনি গ্রহ।
ইবনুল জাওজি বলেছেন, বাবুকিয়া সম্প্রদায়ের কিছু লোক অবশিষ্ট ছিল। কথিত আছে যে, তারা বছরে বিশেষ এক রাতে নারী-পুরুষ সবাই একত্রিত হয়। বাতি নিভিয়ে দিয়ে নারীদেরকে লুট করে। যার হাতে যে নারী পড়ে তাকে ভোগ করা তার জন্য বৈধ হয়। তারা বলে যে, এ জাতীয় শিকার বৈধ। তাদের প্রতি আল্লাহর লানত। ইবনুল জাওজি তাদের মতবাদ ও দুর্নীতিমূলক নিয়ম-কানুন বিস্তৃতভাবে উল্লেখ করেছেন। অবশ্য তার পূর্বে আবু বকর বাকিল্লানি ও তার ‘হাতকুল আসতার ওয়া কাশফুল আসরার’ (هتك الستر وكشف الأسرار) গ্রন্থে তাদের সম্পর্কে উল্লেখ করেন এবং ফাতিমি যুগে মিশরীয় কতক বিচারক মিলে আল-বালাগ আল-আযম ওয়া নামূসুল আকবার (البلاغ الأعظم والنّاموس الأكبر) নামে যে পুস্তক রচনা করেছিলেন তা রদ করেন। তারা তাদের পুস্তকটিকে ১৬টি অধ্যায়ে বিভক্ত করেছিলেন। প্রথম অধ্যায় হল আহলুল সুন্নত ওয়াল-জামাআতভুক্তকেই তাদের দলে যোগ দিলে তাকে এই দীক্ষা দেওয়া হয় যে, হযরত আলী (রা)-এর মর্যাদা হযরত উসমান (রা)-এর উপরে। এটি সে মেনে নিলে তাকে দীক্ষা দেয়া হবে যে, আলী (রা)-এর মর্যাদা হযরত আবু বকর ও হযরত উমর (রা)-এর উপরে। এরপর আরও এক ধাপ অগ্রসর হয়ে হযরত আবু বকর (রা) ও উমর (রা)-কে গাল-মন্দ ও সমালোচনা করার দীক্ষা দেয়া হবে। তাদের ভাষায় এই যুক্তিতে যে, তারা দু’জন হযরত আলী (রা) এবং নবী পরিবারের প্রতি যুলুম করেছেন। এরপর আরও ধাপ এগিয়ে এই উম্মত মূর্খ ও জাহিল এবং অধিকাংশ লোকের অনুসরণ করাটা ভুল পথ, এই দীক্ষা দেয়া হবে। এরপর ইসলামের বিধি-বিধান সম্পর্কে সমালোচনা ও নিন্দাবাদ শুরু হবে।
বস্তুত এই জাতীয় লোকদেরকে সতর্ক করার জন্য, পরিচিত করার জন্য আল্লাহ্ তা’আলা সন্দেহবাদী-গোমরাহ এ জাতীয় কতক শব্দের উল্লেখ করেছেন। যেগুলো বদবখত, হতভাগা, মূর্খ ও বোকার লোকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেমন আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন:
وَالسَّمَاءِ ذَاتِ الْحُبُكِ إِنَّكُمْ لَفِي قَوْلٍ مُّخْتَلِفٍ يُؤْفَكُ عَنْهُ مَنْ أُفِكَ
“শপথ বহু পথ বিছানো আকাশের, তোমরা তো পরস্পর বিরোধী কথায় লিপ্ত। যে ব্যক্তি সত্যভ্রষ্ট সেই তা পরিত্যাগ করে।” (সূরা যারিয়াত: ৭-৯)
অর্থাৎ যে গোমরাহ ও পথভ্রষ্ট সে এটি দ্বারা গোমরাহ হয়। আল্লাহ্ তা’আলা বলেছেন:
فَإِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مَا أَنتُمْ عَلَيْهِ بِفَاتِنِينَ إِلَّا مَنْ هُوَ صَالِ الْجَحِيمِ
“তোমরা এবং তোমরা যাদের ইবাদত কর তারা, তোমরা কেউই কাউকে আল্লাহ্ সম্বন্ধে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। কেবল প্রজ্বলিত অগ্নিতে প্রবেশকারীকে ব্যতীত।” (সূরা সাফফাত: ১৬১-১৬৩)
আল্লাহ্ তা’আলা আরো বলেছেন :
وكذلك جعلنا لكل نبي عدوا شياطين الإنس والجن يوحي بعضهم إلى بعض زخرف القول غرورا ولو شاء ربك ما فعلوه فذرهم وما يفترون ولتصغى إليه أفئدة الذين لا يؤمنون بالآخرة وليرضوه وليقترفوا ما هم مقترفون
“এরূপে মানব ও জিনের মধ্যে শয়তানদেরকে প্রত্যেক নবীর শত্রু করেছি, প্রতারণার উদ্দেশ্যে তাদের একে অন্যকে চমকপ্রদ বাক্য দ্বারা পরিচিত করে। যদি আপনার প্রতিপালক ইচ্ছা করতেন তবে তারা এমনটি করত না। সুতরাং আপনি তাদেরকে এবং তাদের মিথ্যা রচনাকে বর্জন করুন এবং তারা এই উদ্দেশ্যে পরিচিত করে যে, যারা পরকালে বিশ্বাস করে না তাদের মন যেন সেগির প্রতি অনুগামী হয় এবং তারা যেন পরিতুষ্ট হয় আর তারা যেন অপরকর্ম করে তারা যেন তাই করতে থাকে।” (সূরা আন’আম : ১১২-১১৩)
এ জাতীয় বহু আয়াত রয়েছে যেগুলো বিবৃত করে যে, মন্দ লোক ছাড়া অন্য কেউ বাতিল, মূর্খতা, গোমরাহী এবং নাফরমানীর পথে যায় না, সেগুলোর প্রতি অনুগত হয় না।
জৈনেক কবি বলেছেন :
إِنَّهُ لَا يَسْتَخْفِذُ عَلَى أَحَدٍ ۛ – إِلَّا عَلَى أَضْعَفِ الْمُجَانِينِ
“একমাত্র দুর্বল চিত্ত যাদের তাদেরকে ব্যতীত অন্য কারো উপর সে কর্তৃত্ব স্থাপন করতে পারে না।”
এরপরও ওই গোমরাহ দলের মধ্যে বিভিন্ন স্তর রয়েছে। যেমন কুফরী, নাস্তিকবাদ, মূর্খতা। দুর্বল চিত্ত ও দুর্বল দ্বীনদার লোকের উচিৎ এ জাতীয় বিষয়গুলো অনুধাবন ও উপলব্ধি করা এবং এগুলো থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করা। দুর্বল ঈমান ও দুর্বল বুদ্ধির কারণে ইবলীস শয়তান তাদের জন্য কুফরী ও অন্যান্য মূর্খতার পথ উন্মুক্ত করতে পারে। ইবলীস মাঝে মাঝে তার কতক অনুসারীর জন্য এমন কিছু করে দেয় যা সে ইতোপূর্বে জানত না। যেমন এক কবি বলেছেন :
وكنت امرءا من جند إبليس برهةً … من الدهر حتى صار إبليس من جندي
“আমি বহুদিন ইবলীসের শিষ্য ছিলাম। অবশেষে ইবলীসই আমার শিষ্য হয়ে গিয়েছে।”
মোটকথা, এইসব গোমরাহ দলগুলো এই হিজরীতে (২৭৮ হিজরী) মাথাচাড়া দিয়ে উঠে এবং বিভিন্ন স্থানে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। শেষ পর্যন্ত তারা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, তারা মসজিদুল হারামে প্রবেশ করে। মসজিদের কাবাগৃহের চারপাশে হাজীদেরকে হত্যা করে। হাজরে আসওয়াদ ভেঙে ফেলে এবং নির্দিষ্ট স্থান থেকে খুলে ফেলে। ৩১৭ হিজরীতে তারা হাজরে আসওয়াদ নিজেদের দেশে নিয়ে যায়। ৩৩৯ হিজরী সন পর্যন্ত হাজরে আসওয়াদ তাদের দেশেই ছিল। সর্বমোট ২২ বছর বায়তুল্লাহ শরীফ হাজরে আসওয়াদ মসজিদুল হারাম থেকে খালি ছিল। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এই সব অঘটন ঘটেছিল, ঘটতে পেরেছিল খলীফাদের দুর্বলতার কারণে। তুর্কী সেনাপতিদের হাতে খলীফাদের খেলার পুতুল স্বরূপ অবস্থান এবং বিভিন্ন দেশে তুর্কীদের কর্তৃত্ব স্থাপনের পরিপ্রেক্ষিতে। এই হিজরী সনে দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। এক. এই সকল বিভ্রান্ত সম্প্রদায়ের উথান, দুই. ইসলামের তরবারি আল্লাহর দীনির সহায়কারী আবু আহমদ আল-মুআফফাকার ওফাত,। তবে তার ইন্তিকালের পর মহান আল্লাহ্ মুসলিম জাতির জন্য তার পুত্র আবুল আব্বাস আহমদ আল-মু’তাদিদকে অবশিষ্ট রাখেন। তিনি একজন সাহস বীর পুরুষ ছিলেন।
তথ্যসূত্রঃ
[১]সারজানি, রাগিব, ইসলামি ইতিহাস, ২য় খন্ড, পৃঃ ১৬১-১৬২
[২] ইবনে কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়া আন নিহায়াহ, ভলিঃ ১১, পৃষ্ঠাঃ ১২৫-১২৮,ইফা

Leave a comment