রাফেজী শিয়াদের ইতিহাস-ভূমিকা

আবু মাইসারা

শিয়াদের অন্যতম ভয়ংকর ফিরকা হলো এই রাফেজী শিয়া। ইহাদিগকে রাফেজী বলার কারণ এই যে, ইহারা অধিকাংশ সাহাবাকেই পরিত্যাগ করিয়াছে এবং হযরত আবু বকর (রা:) ও হযরত উমর ফারুক (রা:)-এর খেলাফতকে অস্বীকার করিয়াছে।[১] কেহ কেহ রাফেজী নামকরনের কারণ এইরূপ বলে যে, যখন হযরত জয়নুল আবেদীনের মুখ হইতে হযরত আবু বকর (রা:) এবং হযরত উমর (রা:)-এর প্রতি সমর্থনমূলক যুক্তি প্রকাশ পাইলো, তখন উহারা হযরত জয়নুল আবেদীনের সঙ্গ এবং আনুগত্য পরিত্যাগ করিল। হযরত জয়নুল আবেদীন (রহ:) বলিলেন যে ইহারা আমাকে ছাড়িয়া গেল। এই কারণে উহাদিগকে রাফেজী বলা হয়।[২] কেহ কেহ এইরূপও বলেন যে, শিয়া তাহারাই যারা হযরত উসমান (রা:)-এর উপর হযরত আলীকে (রা:) প্রধান দেয় অর্থাৎ শিয়া বা রাফেজী সম্প্রদায়ের লোকেরা হযরত আলী (রা:)-কে হযরত উসমান (রা:) অপেক্ষা আফজাল ও শ্রেষ্ঠ মনে করে।[৩]

আবু মুহাম্মদ ইবনে কুতায়বা (রহ) (মৃঃ২৭৬ হিজরী) রাফেজীদের ব্যাপারে লিখেছেনঃ [৪]

“আমি রাফেযীগণের কুরআন ব্যাখ্যা দেখে বিস্মিত, বিশেষ করে বিশেষ করে তারা দাবি করে যে, তাদের কাছে গোপন জ্ঞান আছে, যা তাদের কাছে এসেছে ‘জাফর’ থেকে। এই কথা হারুন ইবন সা’দ আল-আজলী উল্লেখ করেছেন এবং তিনি ছিলেন প্রধান জায়দিয়া নেতা। তিনি বলেছেনঃ

তুমি কি দেখ না যে রাফেযীগণ নিজেরাই বিভক্ত?
জাফরের সম্পর্কে সবার বক্তব্যই ভয়াবহ,
কেউ বলে তাকে নেতা,
আবার কেউ বলে তাকে পবিত্র নবী,
তাদের গূঢ় ধারণার সাথে আমি একমত নই – এতে আশ্চর্য কী!
আমি পরম দয়ালুর কাছে আশ্রয় চাই সেই সব গূঢ়তত্ত্ববাদের অনুসারীদের থেকে,
আমি পরম দয়ালুর কাছে আশ্রয় চাই সমস্ত রাফেযী থেকে,
যারা কুফরিতে দূরদর্শী কিন্তু দ্বীনের ক্ষেত্রে অন্ধ,
নেককার মানুষরা (আহলে হক্ব) যখন বেদ‘আত থেকে দূরে থাকে, রাফেযীগণ তা গ্রহণ করে,
আর নেককার মানুষরা (আহলে হক্ব) যখন তা মেনে নেয়, রাফেযীগণ তখন তা প্রত্যাখ্যান করে,
কেউ যদি বলে হাতি একটি টিকটিকি, তারা তাও সত্যায়ন করবে,
কেউ যদি বলে কালো মানুষ ফর্সা হয়ে গেছে, তারা তাও সত্যায়ন করবে,
এসব উটের প্রস্রাবের চেয়েও বেশি ঘৃণ্য,
কারণ এটি পেছনের বদলে সামনেই প্রস্রাব করতে পছন্দ করে,
এটা তাদের জন্যও ঘৃণ্য যারা (নবীকে) মিথ্যা বলে,
যেমনটি খ্রিস্টানরা ঈসাকে মিথ্যা বলেছে।

আবু মুহাম্মদ বলেছেন: (তাদের দাবি অনুযায়ী) এটি হল জিলদ-ই-জাফর। তারা দাবি করেছে, ইমাম তাদের জন্য একটি বই লিখেছেন, যাতে তাদের প্রয়োজনীয় সমস্ত বিষয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত যা কিছু ঘটবে, তার সবকিছু লেখা আছে।

তারা আল্লাহর বাণী ‘সুলাইমান দাউদের উত্তরাধিকারী হয়েছিল’[৫]— থেকে বলে বেড়ায়ঃ ইমামই হলো নবীর জ্ঞানের উত্তরাধিকারী।

আর তাদের কথা, আল্লাহর বাণী ‘আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গরু যবেহ করার নির্দেশ দিয়েছেন’[৬]— এই এটি আয়েশা (রা.)-র প্রতি ইঙ্গিত।

এবং মহান আল্লাহর বাণী ‘তখন আমরা তাদের একাংশকে অপর অংশ দ্বারা আঘাত করতে বলেছি’[৭]— তারা বলে, এখানে তালহা ও জুবায়েরকে বোঝানো হয়েছে।”

শরাব ও জুয়ার’ ব্যাখ্যায় তারা বলেঃ এগুলো হচ্ছে আবু বকর ও উমর (রাঃ)। আর ‘জিবত ও তাগুত’ মানে হচ্ছে মুয়াবিয়া ও আমর ইবনে আস। এদের ব্যাখ্যা ও মন্তব্যের অনেক অদ্ভুত কথা আছে, যা উল্লেখ করতে ইচ্ছুক নই, আর কেউ আমাদের এই বই পড়লে সেগুলো শোনার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে।

সাহিত্যিকদের কেউ কেউ বলতেনঃ রাফেজিদের কুরআন ব্যাখ্যার সাথে মক্কার এক লোকের কবিতার ব্যাখ্যা খুব মিল। একদিন তারা বলেছিলঃ বনি তামিমের মতো মিথ্যাবাদী কেউ নেই, তারা দাবি করে—

যুরারাহ ঘর তার ধ্বংসাবশেষে ঘেরা,

এবং মুজাশী, আবু ফাওয়ারিস ও নাহশালও তাদের দলের অন্তর্ভূক্ত।

তাকে জিজ্ঞাসা করা হলোঃ তুমি এই কবিতার ব্যাপারে কী বলো? সে বলতঃ ঘর হচ্ছে আল্লাহর ঘর, আর যুরারাহ হচ্ছে হাজরে আসওয়াদ (কালো পাথর)। তাকে আবার জিজ্ঞাসা করা হলোঃ মুজাশি কে? সে বললঃ (মুজাশি হলো) জমজম কূপ যাতে বিশুদ্ধ পানি আছে। তাকে আবারো জিজ্ঞেস করা হলোঃ ফাওয়ারিস কে? সে বললঃ তিনি হলেন আবু কুবাইস (পাহাড়)। তাকে জিজ্ঞেস করা হলোঃ নহশাল কে? সে বলল: নহশাল হলো সবচেয়ে শক্ত। সে কিছুক্ষণ চিন্তা করল, তারপর বললঃ নহশাল হলো কাবার প্রদীপ, কারণ এটি লম্বা ও কালো— তাই এটি নহশাল।

এরা হলো বিদআতীদের মধ্যে সর্বাধিক বিভক্ত ও বিচ্ছিন্ন এবং তারা বহু দল-উপদলে বিভক্ত।

রাফেজীরা প্রধানত বৃহৎ তিন দলে বিভক্তঃ

১। ইমামিয়া

২। ইসমাইলিয়া

৩। ঘালি

এরা প্রত্যেকে আবার বহু উপদলে বিভক্ত যা আমরা একে একে আলোচনা করবো।


তথ্যসূত্রঃ

[১] জ্বিলানী,আব্দুল কাদের, গুনিয়াতুত ত্বালেবীন, ভলিঃ ১ ও ২, পৃঃ৮৯, ফেন্সী লাইব্রেরী এন্ড ষ্টেশনারী

[২] জ্বিলানী,আব্দুল কাদের, গুনিয়াতুত ত্বালেবীন, ভলিঃ ১ ও ২, পৃঃ৮৯, ফেন্সী লাইব্রেরী এন্ড ষ্টেশনারী

[৩] জ্বিলানী,আব্দুল কাদের, গুনিয়াতুত ত্বালেবীন, ভলিঃ ১ ও ২, পৃঃ৮৯, ফেন্সী লাইব্রেরী এন্ড ষ্টেশনারী

[৪] আবু মুহাম্মদ ইবনে কুতায়বা, তাবিল আল হাদীস, পৃষ্ঠাঃ ১২৪, আল মাকতাবা আল ইসলামী

[৫] সূরা নাহলঃ১৬

[৬] সূরা বাকারাহঃ৬৭

[৭] সূরা বাকারাহঃ৭৩



Leave a comment