সাইয়্যিদুনা হাসান (রা)-এর সাথে শিয়াদের শত্রুতা

আবু মাইসারা

শিয়ারা যুগে যুগে আহলে বাইতের সাথে শত্রুতা করে গেছে। আমরা পর্যায়ক্রমে সব আলোচনা করবো। এই পর্বে আমরা হাসান রা এর সাথে শিয়াদের শত্রুতার কথা আলোচনা করবো ইনশাল্লাহ।

শিয়া ইতিহাসবিদ ও লেখকরা স্পষ্টভাবে লিখেছেন যে যারা হাসানকে লুণ্ঠন করেছিল, তার তাবু ও সেখানকার জিনিসপত্র লুট করেছিল এবং তাকে জখম করেছিল, তারা ছিল মাদায়েনের সাবাত বাসী। এটাই সেই এলাকা যেখানে সাইয়্যিদুনা আলী আবদুল্লাহ ইবনে সাবাহকে নির্বাসিত করেছিলেন। তারা তাঁর মতাদর্শ ও বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল এবং অনৈক্য ও বিদ্বেষ উসকে দিয়েছিল। তাদের মধ্যে মুখতার ইবনে আবী উবাইদ আস-সাকাফী সাবাঈয়াদের শিকারে পরিণত হয়েছিলেন, যিনি পরবর্তী ঘটনাবলীতে একটি ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনিই প্রকাশ করেছিলেন ঠিক সেই একই বিশ্বাসগুলো, যা তিনি শিখেছিলেন দুর্বৃত্ত ইহুদি আবদুল্লাহ ইবনে সাবাহ’—এর কাছ থেকে এবং ধূর্ত দুর্বৃত্ত সাবাঈয়াদের কাছ থেকে। ইতিহাসবিদগণ লিখেছেন যে, হাসান ইবনে আলী (রাদিয়াল্লাহু আনহু) মাদায়েনে প্রবেশ করেন এবং আহত অবস্থায় মুখতারের চাচার বাড়িতে অবস্থান করেন।

فقال له المختار وهو شاب هل لك في الغنى والشرف قال وما ذاك قال تأخذ الحسن بن علي وتقيده وتتبعبه إلى معاوية فقال له عمه قبحك الله وقبح ما جئت به الأغدر بابن بنت رسول الله صلى الله عليه وسلم

মুখতার, যিনি তখন এক যুবক ছিলেন, তার চাচাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কি সম্পদ ও সম্মান কামনা করেন?”

(তার চাচা বললেন) “তুমি কী বোঝাতে চাও?”

মুখতার বললেন, “হাসান ইবনে আলীকে ধরে নিয়ে এসে শৃঙ্খলিত করুন এবং তাঁকে মুআবিয়ার নিকট প্রেরণ করুন।”

তার চাচা তাঁকে বললেন, “আল্লাহ তোমাকে লাঞ্ছিত করুন এবং তুমি যা নিয়ে এসেছ তাকে অপমানিত করুন। আমি কি রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর কন্যার পুত্রের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করব?”[১]

যখন হাসান ﷺ একদিকে সাবাঈয়াদের আচরণ, অন্যদিকে শিয়াদের পরিত্যাগ এবং তৃতীয় দিকে রক্তপাত প্রত্যক্ষ করলেন, তিনি শান্তি চুক্তিকে সর্বোত্তম বলে স্থির করলেন। শিয়া ইতিহাসবিদ ইয়াকুবী লিখেছেন:

وحمل الحسن إلى مدائن وقد نزف نزفاً شديداً واشتدت به العلة فافترق الناس عنه وقدم معاوية إلى العراق فغلب على الأمر والحسن عليل شديد العلة فلما رأى الحسن أن لا قوة به وأن أصحابه قد افترقوا عنه فلم يقموا له صالح معاوية وصعد المنبر فحمد الله وأثنى عليه وقال أيها الناس إن الله هداكم بأولنا وحقن دماءكم بآخرنا وقد سالمت معاوية وإن أدري لعله فتنة لكم ومتاع إلى حين

হাসান (রা.) প্রচুর রক্তক্ষরণের পর এবং তাঁর অসুস্থতা তীব্রতর হওয়ার পর মাদায়েনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। লোকেরা তাঁকে পরিত্যাগ করে। মুআবিয়া ইরাকে আগমন করেন এবং হাসান (রা.) অত্যন্ত অসুস্থ থাকা অবস্থায়ই ক্ষমতা দখল করে নেন। যখন হাসান (রা.) দেখলেন যে তাঁর আর কোনো শক্তি নেই এবং তাঁর সঙ্গীরা তাঁকে পরিত্যাগ করেছে ও তাঁর পাশে দাঁড়ায়নি, তখন তিনি মুআবিয়া (রা)-এর সাথে সন্ধি করেন। তিনি মিম্বারে আরোহণ করলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করার পর বললেন, “হে মানুষ, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদেরকে আমাদের প্রথমভাগ দ্বারা হিদায়াত দান করেছেন এবং আমাদের শেষভাগ দ্বারা তোমদের রক্তপাত রোধ করেছেন। আমি মুআবিয়া (রা)-এর সাথে সন্ধি করেছি। আমি জানি না, সম্ভবত এটি তোমাদের জন্য একটি পরীক্ষা এবং কিছুকালের জন্য বিনোদন হবে।[২]

সাইয়্যিদুনা হাসান (রা.) মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে সন্ধি স্থাপন এবং তার অনুকূলে খিলাফত ত্যাগ করেই ক্ষান্ত হননি। তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে প্রকাশ্য দৃষ্টিতে তার ভাইয়েরা এবং তার সেনাবাহিনীর প্রধান কমান্ডারদের সাথে একত্রে বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। প্রসিদ্ধ শিয়া রিজাল বিশারদ কাশশী, জাফর ইবনুল বাকির (রহ.)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন:


إن معاوية كتب إلى الحسن رضي الله عنه أن أقدم أنت والحسن وأصحاب علي فخرج معه قيس بن سعد بن عبادة الأنصاري وقدموا إلى الشام فأذن لهم معاوية وأعد لهم الخطباء، فقال يا حسن قم فاخطب، ثم قال للحسن رضي الله عنه قم فاخطب، فقام فاخطب، ثم قال يا قيس قم فاخطب، فالتفت إلى الحسن رضي الله عنه ينظر ما يأمره، فقال يا قيس إنه إمامي يعني الحسن رضي الله عنه

মুআবিয়া হাসান (রা.)-এর কাছে লিখলেন, “হুসাইন (রা.) এবং আলী (রা.)-এর সঙ্গীদের সাথে একত্রে আগমন কর।”

কায়েস ইবনে সাদ ইবনে উবাদা আল-আনসারী (রা.) তাদের সাথে রওনা হলেন। তারা সিরিয়ায় পৌঁছলেন। মুআবিয়া তাদের প্রবেশের অনুমতি দিলেন এবং তাদের জন্য বক্তৃতা দেওয়ার মঞ্চ প্রস্তুত করলেন।

তিনি বললেন, “হে হাসান, উঠে দাঁড়াও এবং বাইয়াত কর।” অতঃপর তিনি হুসাইন (রা.)-কে বললেন, “তুমি উঠে দাঁড়াও এবং বাইয়াত কর।” তিনি উঠে দাঁড়ালেন এবং বাইয়াত করলেন। অতঃপর তিনি বললেন, “হে কায়েস, উঠে দাঁড়াও এবং বাইয়াত কর।” কায়েস (রা.) হুসাইন (রা.)-এর দিকে ফিরে গেলেন, যাতে দেখতে পারেন তিনি তাঁকে কী নির্দেশ দেন। হুসাইন (রা.) বললেন, “হে কায়েস, তিনি অর্থাৎ হাসান (রা.)-ই আমার নেতা।”[৩]

প্রখ্যাত শিয়া আলেম মাজলিসী তাঁর ‘জিলাউল উয়ুনুল ফারিসি’ গ্রন্থে একই রকম বর্ণনা লিপিবদ্ধ করেছেন, যা শিয়া মুহাদ্দিস আব্বাস কুম্মী তাঁর ফারসি ভাষার প্রধান ইতিহাস গ্রন্থ ‘মুনতাহাল আমাল’-এ নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন, এবং একইভাবে ইবনে আবিল হাদীদ আশশিয়ীও তাঁর ‘শারহু নাহজিল বালাগা’ গ্রন্থে নির্ভরযোগ্য বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন।[৪]

এই রাফেজি শিয়ারা পরবর্তীতে হাসান রা কে মুশরিক পর্যন্ত ফতোয়া দেয়। শিয়াদের প্রখ্যাত আলেম মুসা নাওবাখতী বলেনঃ

لما ودع الحسن معاوية وأخذ منه المال الذي بعث به إليه وصالح معاوية الحسن طعنوا فيه وخالفوه ورجعوا عن إمامته، فدخلوا في مقالة جمهور الناس وبقي سائر أصحابه على إمامته إلى أن قتل فلما تنحى عن محاربة معاوية وانتهى إلى مظلم سباط وثب عليه ثبة رجل من هناك يقال له الجراح بن سنان فأخذ بلجام دابته ثم قال الله أكبر أشركت كما أشرك أبوك من قبل وطعنه بمعول في أصل فخذه فقطع الفخذ إلى العظم فاغتنته الحسن وخرج جميعاً فاجتمع الناس على الجراح فقتلونه حتى قتلوه ثم حمل الحسن على سرير فأتي به المدائن فلم يزل يعالج بها في منزل سعد بن مسعود الثقفي حتى صلحت جراحته ثم انصرف إلى المدينة فلم يزل جريحًا من طعنته كاظمًا لغيظه متجرعًا لريقه على الشجا والأذى من أهل دعوته حتى توفي رضي الله عنه في آخر صفر سنة سبع وأربعين وهو ابن خمس وأربعين سنة وستة أشهر وقال بعضهم أنه ولد سنة ثلاث من الهجرة من شهر رمضان وإمامته ست سنين وخمسة أشهر

হাসান (রা) যখন মু’আবিয়া (রা)- এর সাথে সন্ধি করলেন, তার প্রেরিত সম্পদ গ্রহণ করলেন এবং মু’আবিয়া (রা) হাসানে (রা)-এর সাথে শান্তি স্থাপন করলেন, তখন তারা (শিয়ারা) তাকে সমালোচনা করল, তার বিরোধিতা করল এবং তার ইমামত অস্বীকার করল; এভাবে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অবস্থানে চলে গেল। তার বাকি অনুসারীরা তার ইমামতের উপর অটল রইল, যতক্ষণ না তাকে হত্যা করা হয়।

যখন তিনি মু’আবিয়া (রা)-এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা থেকে বিরত হলেন এবং সাবাত এর অন্ধকার অঞ্চলে পৌঁছলেন, তখন সেই এলাকার জাররাহ ইবনে সিনান নামক এক ব্যক্তি তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং তার সওয়ারির লাগাম ধরে ফেলল, তারপর চিৎকার করে বলল, আল্লাহু আকবার! তুমি শিরক করেছ, ঠিক যেমন তোমার পিতা আগে করেছিল।” তারপর সে একটি খঞ্জর দিয়ে তার ঊরুর গোড়ায় এত গভীরভাবে আঘাত করল যে তা হাড়ে পৌঁছে গেল। হাসান (রা) তাকে জড়িয়ে ধরে পাল্টা লড়াই করল এবং তারা দুজনেই মাটিতে পড়ে গেল। লোকেরা জাররাহের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাকে ছুরি মেরে হত্যা করল। এরপর হাসান (রা)-কে একটি খাটিয়ায় করে মাদায়েনে নিয়ে যাওয়া হয়। সা’দ ইবনে মাসউদ আস-সাকাফির বাড়িতে তার চিকিৎসা করা হয়, যতক্ষণ না তার ক্ষতগুলি সেরে ওঠে। এরপর তিনি মদিনায় ফিরে আসেন।

তিনি সেই ছুরিকাঘাতের আঘাতে জর্জরিত অবস্থায় থাকলেন, নিজের সমর্থকদের কাছ থেকে পাওয়া মনঃকষ্ট ও বেদনায় ক্রোধ চেপে রেখে ও ক্ষোভ গিলে, অবশেষে ৪৭ হিজরির সফর মাসের শেষে ৪৫ বছর ৬ মাস বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ বলেন, তিনি হিজরতের তৃতীয় বছরের রমজান মাসে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। তার ইমামত স্থায়ী হয়েছিল ছয় বছর পাঁচ মাস।[৫]

এই কারণে রাফেজী শিয়ারা হাসান রা এর প্রতি বিদ্বেষের কারণে এই রাফেজী শিয়ারা হাসান রা এর সন্তান সন্ততির আলোচনাও করেনা এমনকি এ কারণেই রাফেজী শিয়াদের পরবর্তী সকল ইমাম হুসাইন রা এর বংশ থেকে। রাফেজী শিয়াদের ভাবখানা এমন যেন হাসান (রা) মুসলিমদের কেঊ ছিলেন না। এই রাফেজীরা চায় মুসলিমরা যাতে হাসান রা ও তার সন্তান-সন্ততিকে ভুলে যায়। আমরা সামনের পর্বে দেখবো এই রাফেজী শিয়ারা কিভাবে আলী রা এর আরেক ঐরসজাত সন্তান হোসাইন (রা) এর ছোট ভাই মুহাম্মদ বিন আলী (রহ) কে মিথ্যাবাদী বলে অপবাদ দিয়েছিলো এবং তাকে পরিত্যাগ করেছিলো। যায়েদ বিন আলী (রহ)-এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো। অথচ এই রাফেজী শিয়ারাই মুখে আহলে বাইতের কথা বলে ফেনা তুলে ফেলে। ওহে রাফেজী, হাসান রা ও তার সন্তানরা কি আহলে বাইত ছিলো না, মুহাম্মদ বিন হানাফিয়্যা রা কি আহলে বাইত ছিলো না, যায়েদ বিন আলী (রহ) কি আহলে বাইত ছিলো না?!!


তথ্যসূত্রঃ

[১] তারিখ আত-তাবারী, ৬/৯২; আল কামিল,৩/২০২, আল বিদায়াহ ওয়ান নিয়াহাহ,৮/১৪।উপরোক্ত বর্ণনা ইবনে কাসীরের।

[২] তারিখ আল ইয়াকুবী, ২/২১৫

[৩] রিজাল আল কাশশী, পৃঃ১০২

[৪] জিলাউল উয়ুন,১/৩৯৫;মুনতাহা আল আ’মাল,পৃঃ৩১৬;শরাহ নাহজুল বালাগাহ,১৬/৩৮

[৫] আন-নাওবাখতী, ফিরাকুশ শিয়া, পৃঃ৪৬



Leave a comment