মেনু

ইরানে সুন্নি ওলামায়ে কেরামের দুর্দশা

আবু মাইসারা

আধুনিক ইরানের শিয়া ধর্মীয় নেতারা সাফাভী আমলের ধর্মান্ধ ধর্মীয় নেতাদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। আবারও আহলুস সুন্নাহর ওলামায়ে কেরামই তাদের নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। সুকৌশলী মিডিয়া সেন্সরশিপের মাধ্যমে রাষ্ট্র এই খবরগুলোর বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম থেকে আড়াল করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবুও আল্লাহ চেয়েছেন যে এর কিছু অংশ যেন প্রকাশ পায়, যাতে ইরানে আহলুস সুন্নাহর ভাগ্য নিয়ে যারা চিন্তিত, তারা ইরানি সুন্নিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কঠোর পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে পারেন। তাদের আকিদার (বিশ্বাস) কারণে যারা নিহত বা কারাবন্দী হয়েছেন, তাদের স্মৃতি রক্ষা করা আমাদের কর্তব্য। এই নিবন্ধে বিপ্লব পরবর্তী দুই দশকে নিহত, নির্বাসিত বা কারাবন্দী হওয়া বিশিষ্ট ইরানি সুন্নিদের একটি তালিকা রয়েছে। — মাওলানা মুহাম্মদ ত্বহা কারান (আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন)

১৫০১ সালে শাহ ইসমাইল সাফাভীর অগ্রসরমান বাহিনীর হাতে তাবরিজ পতনের মাধ্যমে ইরানি ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হয়। পারস্যের ভূমি, যার জনসংখ্যা সেই সময় পর্যন্ত মূলত সুন্নি ছিল, এখন শিয়া আবাসভূমিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। সুন্নি ইরানিদের ওপর দমন-পীড়ন ছিল দ্রুত ও নির্মম। সুন্নি ওলামা এবং সুফিদের বিশেষভাবে নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। অনেকেই নিশ্চিত মৃত্যুর চেয়ে নির্বাসনকে বেছে নিয়েছিলেন; ওলামাদের নিধন এবং বহিষ্কারের ফলে ইরানের আহলুস সুন্নাহ সেই নেতৃত্বকে হারিয়ে ফেলে যারা ভূখণ্ডটির প্রধান আকিদা হিসেবে তাদের বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখতে সক্ষম ছিল। এভাবে ইব্রাহিম ইবন আদহাম, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক এবং আবু দাউদ আস-সিজিস্তানির মতো মনীষীদের হাত ধরে শুরু হওয়া এবং আল-গাজালি, আর-রাজি এবং আবদুল কাদির জিলানির মতো ব্যক্তিদের মাধ্যমে দীর্ঘকাল ধরে লালিত পারস্যের সুন্নি শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার ঐতিহ্য সাফাভীদের নিরলস নিপীড়নের মাধ্যমে এক ভয়াবহ পরিণতির সম্মুখীন হয়।

সাফাভী শাসনের আড়াই শতাব্দী ইরানে শিয়া মতাদর্শের আধিপত্য নিশ্চিত করেছিল। যে দেশে একসময় একজন শিয়া আলেমও মেলা ভার ছিল, লেবাননের জাবাল আমিল এবং বাহরাইন থেকে আসা ব্যাপক অভিবাসনের ফলে ইরান শীঘ্রই একটি শক্তিশালী ধর্মীয় গোষ্ঠীর (clergy) অধিকারী হয়। শীঘ্রই ইরানের প্রকৃত ক্ষমতা এই ধর্মীয় নেতাদের হাতে চলে আসে। তারাই আঠারো শতকে নাদির শাহের উদার ও সংমিশ্রণবাদী নীতিকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন। উনবিংশ শতাব্দীতে তারা ‘তামাক বিপ্লবের’ (Tobacco Revolution) মাধ্যমে ইরানি জনমানুষের ওপর তাদের বিশাল কর্তৃত্বের প্রমাণ দেন। বিংশ শতাব্দীতে ইরানে এই ধর্মীয় ক্ষমতা তার চরম শিখরে পৌঁছায় যখন ১৯৭৯ সালের বিপ্লব আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির ‘বিলায়াত আল-ফকিহ’ তত্ত্বকে ইরানের সরকারের মূল ভিত্তিতে পরিণত করে।

আধুনিক ইরানের শিয়া ধর্মীয় নেতারা সাফাভী আমলের ধর্মান্ধ ধর্মীয় নেতাদের যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। আবারও আহলুস সুন্নাহর ওলামায়ে কেরামই তাদের নির্যাতনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। সুকৌশলী মিডিয়া সেন্সরশিপের মাধ্যমে রাষ্ট্র এই খবরগুলোর বেশিরভাগই আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম থেকে আড়াল করে রাখতে সক্ষম হয়েছে। তবুও আল্লাহ চেয়েছেন যে এর কিছু অংশ যেন প্রকাশ পায়, যাতে ইরানে আহলুস সুন্নাহর ভাগ্য নিয়ে যারা চিন্তিত, তারা ইরানি সুন্নিদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া কঠোর পরিস্থিতি সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পেতে পারেন।

ষোড়শ শতাব্দীতে সাফাভীরা যখন আহলুস সুন্নাহ নিধন শুরু করে, সেই ট্র্যাজেডির একটি অংশ ছিল এই যে, নিহত হওয়া অধিকাংশ সুন্নি পণ্ডিত ও আল্লাহভীরু মানুষের নাম পরবর্তী প্রজন্মের কাছে হারিয়ে গেছে। ইবনে আল-ইমাদের ‘শাজারাতুজ জাহাব’ -এর মতো জীবনীমূলক উৎসগুলো পড়লে দেখা যায় যে, সাফাভীদের ক্ষমতায় আরোহণের সাথে সাথে ইরান থেকে বিশিষ্ট সুন্নি বুদ্ধিজীবীদের সংখ্যা হঠাৎ হ্রাস পায় এবং পরবর্তীতে তারা প্রায় সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যান। বর্তমান আফগানিস্তানের হেরাত অঞ্চলের অধিবাসী মোল্লা আলী আল-ক্বারীর মতো কেউ কেউ কেবল তখনই খ্যাতি অর্জন করতে পেরেছিলেন যখন তার পরিবার তাদের মাতৃভূমি ছেড়ে মক্কায় গিয়ে বসতি স্থাপন করেন, যেখানে তিনি বড় হয়ে ওঠেন।

বর্তমানে সেই ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঘটছে এবং সুন্নিরা আবারও শিয়াদের রক্তপিপাসার সহজ শিকারে পরিণত হচ্ছে। এমতাবস্থায় আমাদের দায়িত্ব হলো—যাঁরা তাঁদের আকিদার (বিশ্বাস) কারণে শহীদ বা কারাবন্দী হয়েছেন, তাঁদের স্মৃতি রক্ষা করা। তেহরান সরকার তার নিজস্ব শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় সচেষ্ট; মনে হচ্ছে, সুন্নিদের স্মৃতি রক্ষার দায়িত্ব আমাদের নিজেদেরই নিতে হবে।

বিপ্লব পরবর্তী দুই দশকে নিহত, নির্বাসিত বা কারাবন্দী হওয়া বিশিষ্ট ইরানি সুন্নিদের একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:

১. আহমদ মুফতিজাদা

আহমদ মুফতিজাদা ছিলেন কুর্দিস্তানের একজন বিশিষ্ট সুন্নি শাফেয়ী নেতা এবং ইরানের অন্যতম প্রভাবশালী সুন্নি ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হতেন। তার বাবা ছিলেন কুর্দ অঞ্চলের প্রধান মুফতি। তার চাচাও ছিলেন বড় আলেম। তার বাবার মৃত্যুর পর মুফতির পদ গ্রহণ করার সুযোগ থাকলেও তিনি তা গ্রহণ না করে রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে মনোনিবেশ করেন। বিশেষত ১৯৭০ সালে স্বীয় জন্মশহর সেনেন্দাজের কেন্দ্রীয় মসজিদের খতিব হলে বক্তব্যের মাধ্যমে খুব দ্রুতই সুন্নি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এরং অল্পদিনেই কুর্দিদের মধ্যে জনপ্রিয়তা লাভ করেন। তখন তিনি কুর্দিদের জাতিগত বৈষম্য বিশেষত পুরো ইরান জুড়ে সুন্নিদের উপর হওয়া সাম্প্রদায়িক বৈষম্য নিরসণের আওয়াজ তুলেন এবং অল্পদিনেই জাতীয় নেতায় রূপান্তরিত হন। সেসময় ইরানের বিভিন্ন সুন্নি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য মজলিসে শুরা আহলুস সুন্নাহ নামে একটি সংগঠনেরও ভিত্তি রাখেন। যার লক্ষ্য ছিল বিভিন্ন সুন্নি জনগোষ্ঠিকে একত্রিত করে ইরানে একটি ইসলামি রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েম করা, সঙ্গে সঙ্গে সুন্নিদের জন্য জাতিগতভাবে সমতা নিশ্চিত করা। বিশেষত কুর্দিদের জন্য সীমীত সায়ত্তশাসনও নিশ্চিত করা। রেজা শাহ পাহলভির সময় তার বিরুদ্ধে তিনি সরব অবস্থান গ্রহণ করেন। বিশেষত তার উৎখাত আন্দোলনে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন। ফলে গ্রেফতারও হতে হয়েছিল তাকে। তার নেতৃত্ব ও সাহসীকতার জন্যই রুহুল্লাহ (রুহুশশয়তান) খোমিনি তাকে মর্যাদাবান আলেম ও সাহসী ধর্মীয় নেতা বলে প্রশংসা করেছিলেন।

বিপ্লবের আঠারো মাস আগে ইরাকে নির্বাসিত খোমেনির সাথে তাঁর যোগাযোগ স্থাপিত হয়। তাঁদের মধ্যে পত্রবিনিময় শুরু হয়, যেখানে মুফতিজাদা খোমেনিকে বিভিন্ন পরামর্শ দিতেন। খোমেনির সহযোগীরা কুর্দিস্তানের সানান্দাজে অবস্থিত মুফতিজাদার প্রধান কার্যালয় হয়ে ইরাকে যাওয়ার সময় এই চিঠিগুলো আদান-প্রদান করতেন। মুফতিজাদা কেবল কুর্দিস্তানের সুন্নিদেরই নয়, বরং ইরানের অন্যান্য অঞ্চলের সুন্নিদেরও শাহের বিরুদ্ধে খোমেনির পক্ষ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোঝাতে সক্ষম হয়েছিলেন। যখন বিপ্লব এলো এবং শাহ দেশ ছেড়ে পালালেন, তখন ইরানের আহলুস সুন্নাহ শিয়াদের মতোই আনন্দিত হয়েছিল এই আশায় যে, এই বিপ্লব তাদের দীর্ঘদিনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বঞ্চনার অবসান ঘটাবে।

ইরান বিপ্লবের পর প্রথম পাঁচমাস ভালোই ছিল, কিন্তু এরপরই খোমিনি তার খোলস ছেড়ে আসলরূপ প্রকাশ করেন এবং নতুন সংবিধানে শিয়াবাদকে সরকারি ধর্ম হিসেবে ঘোষণা দেন। সঙ্গে সঙ্গে সুন্নিদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদ থেকে দূরে সরিয়ে দেন। এই বিপ্লব সফল হতে না হতেই কুর্দিস্তানে ট্যাংক প্রবেশ করতে শুরু করে। মার্ক্সবাদী ভাবধারার দল ‘কুর্দিশ ডেমোক্রেটিক পার্টি’ (KDP) শাহের আমল থেকেই কুর্দি স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে আসছিল। খোমেনির বাহিনী কেডিপি (KDP)-র কার্যক্রম দমনের অজুহাতে কুর্দি গ্রামগুলোতে আক্রমণ শুরু করে। এর ফলে বিপ্লবের পূর্ববর্তী সময়ে, মুফতিজাদা জোরালোভাবে তাঁর জনগণকে মার্ক্সবাদী কেডিপি (KDP)-র বিচ্ছিন্নতাবাদের বিরুদ্ধে পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং খোমেনির বিপ্লবের পক্ষ নিতে উৎসাহিত করেছিলেন। কিন্তু এটি তাদের জন্য কোনো সুফল বয়ে আনেনি। প্রত্যক্ষদর্শীরা হামলার বর্ণনা দিতে গিয়ে স্মরণ করেন যে, সৈন্যরা চিৎকার করে বলছিল— “ওমর, উসমান এবং মুয়াবিয়ার সন্তানদের প্রতি কোনো দয়া দেখিও না!”। তবুও মুফতিজাদা ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়েছিলেন এবং সশস্ত্র প্রতিরোধের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেছিলেন।

আশা করা হয়েছিল যে, মুফতিজাদা তাঁর জনপ্রিয়তা এবং খোমেনির প্রতি তাঁর অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণে কুর্দিস্তানের সুন্নি-অধ্যুষিত প্রদেশে খোমেনির প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্ত হবেন। পরিবর্তে, খোমেনি ‘সাফদারি’ নামক এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেন, যার কোনো জনসমর্থন ছিল না এবং সেই পদের জন্য তার একমাত্র যোগ্যতা ছিল সে একজন শিয়া। তখনই মুফতি জাদাহ এর বিরোধিতা করেন এবং বিপ্লবের সময় সুন্নিদের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল তা স্মরণ করিয়ে দেন। সেসময় তিনি তেহরানে সুন্নি সম্মেলন করে সুন্নিদের ঐক্যবদ্ধ করারও চেষ্টা করেন। কিন্তু খোমিনি প্রশাসন তখন উল্টোপথে হাঁটেন এবং তাদের প্রতিশ্রুতির পথে না গিয়ে উল্টো সুন্নি দমনে লেগে পড়েন। বিশেষত দ্বিতীয়বার সুন্নি সম্মেলনের আবেদন করলে তাও প্রত্যাখ্যাত হয়। ফলে মুফতি জাদাহ এটি নিজের বাড়িতে আয়োজন করেন। কুর্দিস্তানের সানান্দাজের জনগণও তখন সহিংস প্রতিক্রিয়া দেখায় যখন সাফদারি এবং তার অনুসারীরা এক প্রতিবাদী জনতার ওপর গুলি চালায়। সাফদারিকে তখন পালিয়ে প্রাণ বাঁচাতে হয় এবং তার কমিটির সদস্যদের শহরবাসী প্রতিশোধ হিসেবে গুলি করে হত্যা করে। কুর্দিস্তান নিয়ে খোমেনির উদ্দেশ্য এভাবে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পর, মুফতিজাদা একটি পরামর্শক সংস্থার সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করা ছাড়া আর কোনো পথ খুঁজে পাননি এবং তিনি ‘আহলুস সুন্নাহর কেন্দ্রীয় পরামর্শক পরিষদ’ (মাজলিস আল-শুরা আল-মারকাজি লি আহল আল-সুন্নাহ) প্রতিষ্ঠা করেন। এরপরই খোমিনি সরকার তার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন এবং ১৯৮২ সালে তাকে গ্রেফতার করে ৫বছরের কারাদণ্ড দেন। শুধু তাকেই নয়, বরং তার ছাত্রদেরও দমন পীড়নের টার্গেট বানানো হয়। বিশেষত তার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান মাকতাবাতুল কুরআনের ১৮০ জন ছাত্র ও শিক্ষককেও গ্রেফতার করা হয় এবং তার অন্যতম ছাত্র নাসের সুবহানীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

যাইহোক, মুফতি জাদাহ এর ৫বছর সাজার মেয়াদ শেষ হলে তাকে মুক্তি না দিয়ে আর কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রম করবেন না মর্মে লিখিত অঙ্গীকার করতে বললে তিনি তা অস্বীকার করেন। পরে অন্যায়ভাবে তাকে আরো ৫বছর জেলে রাখা হয়। এবং পূর্ণ দশবছরই তাকে অমানবিক নির্যাতন করা হয়। বিশেষত ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত তাকে একক সেলে রাখা হয়েছিলো। এসব নির্যাতনের কারণে তিনি ক্যানসার আক্রন্ত হয়ে যান এবং কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহ পর ১৯৯৩ সালের ৯ই ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন। তাকে গ্রেফতার ও দমনের মাধ্যমে মূলত ইরানে আহলুস সুন্নাতের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। ফলে তারপরে এমন বড় নেতার উত্থান হয় নি। আর সম্ভাবনাময় কেউ থাকলেও তাকে আর জীবিত রাখে নি।

২. মাওলানা আব্দুল আজিজ মোল্লাজাদা

মাওলানা আব্দুল আজিজ ছিলেন বালুচিস্তানের হানাফী মুফতি এবং সুন্নি বালুচদের অবিসংবাদিত নেতা। বিপ্লবের শুরুর দিকে তিনি বালুচিস্তানের রাজধানী জাহেদানে খোমেনিপন্থী খুতবা প্রদান করতেন। মুফতিজাদা এবং অন্যদের মতো তিনিও বিশ্বাস করেছিলেন যে, ইরানের নতুন নেতারা শাহের আমলের কুর্দিস্তান ও বালুচিস্তানের মতো সুন্নি-অধ্যুষিত অঞ্চলগুলোর দুর্দশা দূর করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবেন। খোমেনির সর্ব-ইসলামী (pan-Islamist) বাগ্মিতা তাঁদের মনের যেকোনো সাম্প্রদায়িক শঙ্কা দূর করে দিয়েছিল। তবে, যখন আহলুস সুন্নাহর ওপর দমন-পীড়ন শুরু হলো এবং সরকারের সুন্নি-বিরোধী নীতিগুলো প্রকাশ পেতে থাকল, মাওলানা আব্দুল আজিজ তাঁর সমর্থন প্রত্যাহার করতে বাধ্য হন। এর কিছুকাল পরেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন, যাকে “রহস্যজনক পরিস্থিতি” হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তেহরান সরকারের সুন্নি-বিরোধী নীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল সুন্নি প্রধান এলাকাগুলোতে বড় আকারের শিয়া বসতি স্থাপন করা। মাওলানা আব্দুল আজিজের নিজ শহর জাহেদান, যা বিপ্লবের আগে একটি সম্পূর্ণ সুন্নি শহর ছিল, সেখানে আহলুস সুন্নাহর মানুষ খুব শীঘ্রই সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়।

৩. শায়খ উসমান সিরাজউদ্দীন

বিপ্লবের শুরুতে শায়খ উসমান সিরাজউদ্দীন ছিলেন ইরানের নকশবন্দী সুফি তরীকার (order) শায়খ। বিপ্লবের অল্পকাল পরেই তাঁকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করা হয়। এই ব্যক্তির নির্বাসন খোমেনির ইরান দখল এবং ১৬শ শতাব্দীতে শাহ ইসমাইলের ইরান দখলের মধ্যে আরও একটি সাদৃশ্য তৈরি করে। শাহ ইসমাইলের পারস্য বিজয়ের পর নকশবন্দী তরীকা প্রথম সুন্নি সুফি তরীকা হিসেবে নিপীড়নের শিকার হয়েছিল; সম্ভবত তাদের কট্টর সুন্নিবাদ এবং এই কারণে যে, অন্যান্য অনেক তরীকার বিপরীতে তারা সাইয়্যেদুনা আবু বকর رَضِيَ ٱللَّٰهُ عَنْهُ-এর মাধ্যমে আল্লাহর রাসূল ﷺ-এর সাথে সম্পর্কিত। চার শতাব্দী আগে মোল্লা বাকির মজলিসী উল্লাসের সাথে দম্ভভরে বলেছিলেন যে তিনি পারস্যের ভূমিকে “প্রত্যেক নকশবন্দী দরবেশ থেকে মুক্ত” করেছেন; আজ ইরানের বর্তমান সরকার সেই একই তরীকার শায়খকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দিয়েছে।

৪. শায়খ মুহয়ী আদ-দীন

খোরাসানের এই সুন্নি আলেমকে বেশ কয়েক বছর আটকে রাখা হয়েছিল, এরপর তাঁকে দুই বছরের জন্য ইসফাহানে নির্বাসনে পাঠানো হয়। এই বছর (১৯৯৭) রমজান মাসে তিনি বালুচিস্তানে নির্বাসিত ছিলেন।

৫. শায়খ ইব্রাহিম শাফিজাদা

[ইব্রাহিম সাফিজাদেহ সাহেবের হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত তথ্য আবদুর রহমান বোরুমন্দ ফাউন্ডেশন কর্তৃক সাফিজাদেহ সাহেবের পুত্র খালেদ সাফিজাদেহের সাথে ২০১৯ সালের ১২ জুন, ২০২০ সালের ৩১ জানুয়ারি এবং ২০২০ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সাক্ষাৎকার থেকে প্রাপ্ত। অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ (৬ এপ্রিল, ৩ জুন, ১ সেপ্টেম্বর এবং ২১ অক্টোবর ২০০৯; ২০ অক্টোবর ২০১৪), ফারস নিউজ এজেন্সি (১৭ মে ২০১৯), তাসনিম নিউজ এজেন্সি (১৭ মে ২০১৯), আফগান ভয়েস এজেন্সি – আভা (২২ মে ২০১৯), ইরানের সুন্নি অ্যাডহেরেন্টস ফ্রন্ট (জাবহে সুন্নাত) ওয়েবলগ (তারিখবিহীন), কালেমেহ টিভি ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক ওয়েবসাইট (২৫ মে ২০১৯), কালেমেহ টিভি ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেল (২৫ মে ও ২৮ মে ২০১৯, ১ জুন ২০১৯ এবং ১৩ এপ্রিল ২০১৮), সাফিজাদেহ সাহেবের মেডিকেল রিপোর্ট (১৮ মে ২০১৯), জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের (UNHCR) পত্র (২৫ জুলাই ২০১৮), জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে সাফিজাদেহ সাহেবের পত্র (মার্চ ২০১৯) এবং অন্যান্য উৎস থেকে।]

সাফিজাদেহ সাহেব ১৯৫৫ সালের ১৬ মার্চ দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের কায়েন কাউন্টির ফান্দোখত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং তার আটটি সন্তান ছিল—২ জন মেয়ে ও ৬ জন ছেলে। তিনি একজন সুন্নি মুসলিম এবং হানাফি মাযহাবের অনুসারী ছিলেন। সাফিজাদেহ সাহেব খোরাসান রাজাভি প্রদেশের সীমান্তবর্তী শহর তাইবাদে ধর্মতত্ত্বের মৌলিক নীতিসমূহ শিক্ষা করেন এবং উচ্চশিক্ষার জন্য পাকিস্তানে যান। তিনি করাচির দারুল উলুম মাদ্রাসায় ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) এবং হাদিস (মহানবী হযরত মুহাম্মদ ﷺ-এর বাণী ও ঐতিহ্যের সংকলন) অধ্যয়ন করেন। শিক্ষা অব্যাহত রাখতে তিনি ১৯৭৯-৮০ সালে সৌদি আরবে যান। সাফিজাদেহ সাহেব রিয়াদের কিং সাউদ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আরবি সাহিত্যে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। পাঁচ বছর পর তিনি ইরানে ফিরে আসেন। দুই বছরের বাধ্যতামূলক সামরিক পরিষেবা শেষ করার পর, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত না হওয়ায় তিনি তাইবাদের মাযহার-আত্তৌহিদ সেমিনারিতে ধর্মতত্ত্ব পড়াতে শুরু করেন। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; মেডিকেল ডকুমেন্ট, ১৮ মে ২০১৯; সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ৭ মার্চ ২০০৯ এবং ৭ এপ্রিল ২০০৯)। সৌদি আরবের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সউদ বিশ্ববিদ্যালয়ের এই স্নাতককে ‘ওয়াহাবী’ অভিযোগ দিয়ে পৈশাচিক হামলার শিকার হতে হয়। বাজারের মাঝখানে তাঁকে ৭০টি দোররা মারার পর কারাবন্দী করা হয়। তাঁকে ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।

তদুপরি, ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯-৯০ সালের মধ্যে সাফিজাদেহ সাহেব তাইবাদের আমির হামজা মসজিদের ইমাম ছিলেন। তিনি মসজিদে বক্তৃতা দিতেন এবং যুবকদের কাছে ধর্মীয় বিষয়াদি ব্যাখ্যা করতেন। তার ঘনিষ্ঠজনদের মতে, তরুণদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপনে তার অসাধারণ দক্ষতা ছিল। উপরন্তু, সাফিজাদেহ সাহেব বৃহস্পতিবার রাতে তার বাড়িতে বিপুল সংখ্যক মানুষের সাথে মিলিত হতেন এবং তাদের সাথে ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক বিষয়ে আলোচনা করতেন। বিপ্লবী কমিটি (Revolutionary Committees) তাকে বেশ কয়েকবার তলব করে এবং যুবকদের সাথে যোগাযোগ কমাতে ও বাড়িতে সভা না করার নির্দেশ দেয়। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ৭ এপ্রিল ২০০৯)।

সাফিজাদেহ সাহেবের পুত্র খালেদ সাফিজাদেহ তার পিতাকে একজন সৎ, নীতিবান এবং মিশুক ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছেন যিনি তরুণদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। তার মতে, সাফিজাদেহ সাহেব খেলাধুলা, বিশেষ করে পাহাড়ে চড়া পছন্দ করতেন। (কালেমেহ টিভি ওয়ার্ল্ড নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেল, ২৫ মে ২০১৯)।

সাফিজাদেহ সাহেব “খোরাসান সুন্নি ধর্মীয় নেতা সমন্বয় পরিষদ” (Sunni Religious Leaders Coordination Council of Khorassan)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৮৯ সালের জুনে পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। খোরাসান প্রদেশের বেশ কিছু সুন্নি আলেম যখন “ধর্মীয় কার্যাবলি এগিয়ে নেওয়ার” প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন, তখন এই পরিষদটি গঠিত হয়। পরিষদের লক্ষ্য ছিল “সুন্নি বিষয়ক সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধির কার্যালয়”-সহ সরকারি সংস্থাগুলোর প্রভাব ও হস্তক্ষেপের মুখে সুন্নি আলেমদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ৭ এপ্রিল ২০০৯)।

সাফিজাদেহ সাহেব “ইরান সুন্নি অ্যাডহেরেন্টস ফ্রন্ট” (জাবহে সুন্নাত) নামক একটি সংগঠনের মুখপাত্র এবং পরিচালকও ছিলেন। ২০১৭ সালে এই ফ্রন্ট তাদের কার্যক্রম শুরু করে। এই সংগঠনের উদ্দেশ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে “সুন্নি মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি তৈরির লক্ষ্যে কাজ করা”, “সুন্নি অনুসারীদের অধিকার রক্ষা করা”, “সুন্নিদের ধর্মীয় পবিত্রতা ও বিশ্বাস রক্ষা করা” এবং “নিপীড়িত পরিবারগুলোর প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ ও তাদের কণ্ঠস্বর হওয়া”। এই ফ্রন্ট ধর্ম ও রাজনীতির বিচ্ছেদকে প্রত্যাখ্যান করে এবং সুন্নি মুসলমানদের রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। রাজনৈতিকভাবে ফ্রন্টটি “ইরানের ভবিষ্যতের জন্য একটি ফেডারেল গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা” চায়। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯ এবং ৩১ জানুয়ারি ২০২০; জাবহে সুন্নাত ওয়েবলগ; কর্ডপা, ২৩ মে ২০১৯; নূর নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেল, ১৩ এপ্রিল ২০১৮)।

ফ্রন্টের উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইরান সুন্নি অ্যাডহেরেন্টস ফ্রন্টের মুখপাত্র ফারদিন বাসামি বলেন: “আমরা চাই ফ্রন্টটি সমস্ত ইরানি সুন্নিদের একটি ঘর হোক; তারা তাদের মর্যাদা ফিরে পেতে চায় এবং ইরানের অন্যান্য অঞ্চলের মানুষের মতো প্রথম শ্রেণীর স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সমান অধিকার পেতে চায়।” (নূর নেটওয়ার্ক ইউটিউব চ্যানেল, ১৩ এপ্রিল ২০১৮)।

কারাগার থেকে মুক্তির পর, সাফিজাদেহ সাহেব তার লেখা, বক্তৃতা এবং সাক্ষাৎকারে “বিলায়াত-ই ফকিহ” (System of the Guardianship of the Religious Scholar) ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট সমালোচনা করেছিলেন এবং বিশ্বাস করতেন যে এই ব্যবস্থা “নিপীড়ন ও দুর্নীতির” ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি নিজেকে একজন “সংগ্রামী আলেম” মনে করতেন এবং বিশ্বাস করতেন যে আলেমরা পরিষদের কাঠামোর মধ্যে থেকে তাদের “ধর্মীয় ও জাতীয় দায়িত্ব” পালন করতে পারেন এবং “পুরো ইরানের সুন্নি অনুসারীদের মধ্যে সমন্বয় ও ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করতে পারেন”। (সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ৭ এপ্রিল ২০০৯; ভেসাল-ই হক ইউটিউব চ্যানেল, ১৬ মার্চ ২০১৩)।

সুন্নি নাগরিকদের অধিকার সম্পর্কে সাফিজাদেহ সাহেব জোর দিয়ে বলেছিলেন: “বালুচ, কুর্দি, লোর, তুর্কমেন, আরব, ফার্সি বা তুর্কি—আমরা সবাই ইরানি এবং আমাদের সবার নাগরিক অধিকার ভোগ করার অধিকার থাকতে হবে। আমাদের নির্বাচিত করার এবং নির্বাচিত হওয়ার অধিকার থাকতে হবে, এবং আমাদের মতপ্রকাশ ও বাক-স্বাধীনতার অধিকার থাকতে হবে।” তিনি আরও বলেছিলেন: “[তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামী প্রজাতন্ত্র দেখিয়েছে যে] তারা আমাদের পরোয়া করে না, আমাদের কোনো অধিকারের যোগ্য মনে করে না এবং তারা কখনোই স্বেচ্ছায় আমাদের নাগরিক অধিকার দেবে না। তাই আমাদের অধিকার আমাদেরই ছিনিয়ে নিতে হবে এবং তা আদায়ের জন্য আমাদের জেগে উঠতে হবে।” (সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ২০ অক্টোবর ২০১৪)।

কারাগার এবং স্বেচ্ছায় নির্বাসন

১৯৮৯ সালের ৩ অক্টোবর, খোরাসান সুন্নি ধর্মীয় নেতা সমন্বয় পরিষদ প্রতিষ্ঠার অল্পকাল পরে, ধর্মীয় কাগজপত্র পোড়ানোর অজুহাতে বিপ্লবী কমিটির রক্ষীরা সাফিজাদেহ সাহেবকে সেমিনারি প্রাঙ্গণ থেকে গ্রেপ্তার করে। তিনি মাশহাদ শহরের তথ্য প্রশাসন (Information Administration) আটক কেন্দ্রে ৩ মাস কাটান, যেখানে তার ধর্মীয় বিশ্বাস এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। গ্রেপ্তারের পর তাইবাদ শহরের বিপ্লবী কমিটি একটি চিঠি প্রকাশ করে যেখানে তাকে “বিপ্লব-বিরোধী এবং মোফসেদ ফিল-আরজ (পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টিকারী)” হিসেবে অভিহিত করা হয়। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ৭ এপ্রিল ২০০৯; ভেসাল-ই হক ইউটিউব চ্যানেল, ১৬ মার্চ ২০১৩)।

আটক ও কারাবাসের সময় সাফিজাদেহ সাহেবকে তার বিশ্বাস ত্যাগ করার জন্য প্রচণ্ড মানসিক ও শারীরিক চাপের মধ্যে রাখা হয়েছিল, যার মধ্যে মারধর এবং ফ্যানের সাথে দাড়ি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখার মতো নির্যাতনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার ধর্মীয় বিশ্বাসের জন্য তাকে অপমানও করা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, যখন রক্ষীরা তাকে এবং অন্যান্য সুন্নি বন্দিদের চোখ বেঁধে জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষে নিয়ে যেত, তখন তারা হাতের বদলে হাতা ধরে টানত, অথবা ভাঁজ করা সংবাদপত্র বা অন্য কিছু ব্যবহার করত [যাতে তারা অপবিত্র মনে করে বন্দিদের স্পর্শ না করে]। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ৭ এপ্রিল ২০০৯; ভেসাল-ই হক ইউটিউব চ্যানেল, ১৬ মার্চ ২০১৩)।

আটকের সময় সাফিজাদেহ সাহেবের পরিবার তার কোনো খবর পায়নি এবং পরবর্তীতেও দেখা করতে যাওয়ার সময় তারা সব সময় সমস্যার সম্মুখীন হতো। অনেক সময় কারা কর্তৃপক্ষ কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই তার পরিবারের সাথে দেখা করতে দিত না। অধিকন্তু, সাফিজাদেহ সাহেব যখন কারাগারে ছিলেন, তখন তার খাইরুল্লাহ নামে এক ভাইকে ১০ মাস কারাবাসের পর মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং সাফিজাদেহ সাহেবকে তার জানাজা বা শেষকৃত্যে অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ৭ এপ্রিল ২০০৯)।

১৯৮৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর, মাশহাদ স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ক্লার্জি (Special Tribunal for the Clergy) “ওয়াহাবি সম্প্রদায়ের পক্ষ হয়ে কাজ করা এবং [ইসলামি] পবিত্রতাকে অবমাননা ও লাঞ্ছিত করার” অভিযোগে সাফিজাদেহ সাহেবকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড এবং ৭৪টি বেত্রাঘাতের আদেশ দেয়। তাইবাদ শহরের ওয়াহদাত স্কোয়ারে প্রকাশ্যে তার বেত্রাঘাতের দণ্ড কার্যকর করা হয়। বিচারে এবং কারাগার থেকে মুক্তির পর সাফিজাদেহ সাহেব বারবার ওয়াহাবিবাদে বিশ্বাসের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি তাকে গ্রেপ্তারের অজুহাত হিসেবে ধর্মীয় গ্রন্থ পোড়ানোর কথা উল্লেখ করেন এবং জানান যে তার সাজা হওয়ার আসল কারণ ছিল সুন্নি ধর্মীয় নেতা সমন্বয় পরিষদ প্রতিষ্ঠা করা। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ১ সেপ্টেম্বর ২০০৯)।

স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ক্লার্জি রায় দেওয়ার পর, সাফিজাদেহ সাহেবকে ১৯৯০ সালের ২৭ জানুয়ারি সাজা ভোগের জন্য মাশহাদের ওয়াকিলআবাদ কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয় এবং তিনি সেখানে তিন বছর সাত মাস কাটান। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; সাফিজাদেহ সাহেবের ওয়েবলগ, ১ সেপ্টেম্বর এবং ২১ অক্টোবর ২০০৯)।

মুক্তির পর স্থানীয় কর্তৃপক্ষ সাফিজাদেহ সাহেবের ওপর চাপ অব্যাহত রাখে। তার ছেলের মতে, তিনি মাত্র এক বছর মসজিদে সক্রিয় থাকতে এবং শিক্ষকতা করতে পেরেছিলেন। এরপর তাকে প্রতি মাসে তাইবাদ শহরের স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ক্লার্জিতে রিপোর্ট করতে হতো। স্পেশাল ট্রাইব্যুনালের সহকারী প্রসিকিউটরের সাথে তার শেষ বৈঠকে তাকে বলা হয়েছিল যে তার শিক্ষকতা এবং ইমামতি করা নিষিদ্ধ এবং তাকে অবশ্যই বাড়িতে থাকতে হবে। খালেদ সাফিজাদেহের মতে, ওই বৈঠকেই ট্রাইব্যুনাল তাকে ধর্মীয় পোশাক পরিধানের অযোগ্য ঘোষণা করে (defrocked)। এই চাপের কারণে সাফিজাদেহ সাহেব ১৯৯৬ সালে ইরান ত্যাগ করেন এবং আফগানিস্তানের হেরাত শহরে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন। তার ছেলের মতে, এ অঞ্চলে ইরানের উপস্থিতি ও প্রভাবের কারণে হেরাতেও সাফিজাদেহ সাহেবের শিক্ষকতা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। তিনি তখন উত্তর আফগানিস্তানের একটি পরিবহন কোম্পানি সহ বেশ কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করতেন। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; ইরান ইন্টারন্যাশনাল, ৯ জুন ২০১৯)।

সাফিজাদেহ সাহেবের প্রতি হুমকি এবং হত্যাকাণ্ড

উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৭ মে শুক্রবার দুপুর দেড়টায় হেরাত পৌরসভার এক নম্বর ডিস্ট্রিক্টের বাগ মুরাদ পাড়ায় মাসজিদে জামে সেফিদ মসজিদের কাছে চারজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি সাফিজাদেহ সাহেবকে গুলি করে। খুনিরা মোটরসাইকেল ও গাড়িতে করে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়। সাফিজাদেহ সাহেবের ছেলে, যিনি হত্যাকাণ্ডের সময় মসজিদের ভেতরে ছিলেন, জানান: “আমার বাবা আমার ভাইয়ের সাথে ছিলেন কিন্তু পরে তারা আলাদা হয়ে যান এবং তাদের মধ্যে সামান্য দূরত্ব তৈরি হয়। মসজিদের কাছে একটি গাড়ি থেকে একজন ব্যক্তি নেমে আমার বাবাকে পেছন থেকে গুলি করে। প্রথম গুলিটি তার লিভারে লাগে। বাবা আত্মরক্ষার জন্য কয়েক পা এগোতেই দ্বিতীয় গুলিটি তার মুখে লাগে। এরপর তারা তার বুক লক্ষ্য করে তৃতীয় গুলি চালায়, কিন্তু তা তার ডান কাঁধে লাগে।” সাফিজাদেহ সাহেবের মতে, এই ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছিল যখন হেরাতের গভর্নরের মসজিদে উপস্থিতির কারণে আশেপাশে সরকারি এজেন্টরা ছিল। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯ এবং ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০; তাসনিম নিউজ এজেন্সি, ১৮ মে ২০১৯; ফারস নিউজ এজেন্সি, ১৭ মে ২০১৯)।

সাফিজাদেহ সাহেবকে হেরাতের হোজাভি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। ২০১৯ সালের ১৯ মে প্রকাশিত এক রিপোর্টে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তার অবস্থা আশঙ্কাজনক ঘোষণা করে এবং চিকিৎসার জন্য তাকে আফগানিস্তানের বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে হাসপাতাল কর্মকর্তারা জোর দিয়ে বলেন যে সাফিজাদেহ সাহেবকে আফগানিস্তানের বাইরে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। ২২ মে ২০১৯ বুধবার সকাল সাড়ে ৭টায় আঘাতের তীব্রতার কারণে সাফিজাদেহ সাহেবের দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং তিনি হাসপাতালে মারা যান। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯; মেডিকেল সার্টিফিকেট, ১৮ মে ২০১৯; আভা নিউজ এজেন্সি, ২২ মে ২০১৯)। হেরাতে অবস্থানকালে সাফিজাদেহ সাহেব ইরানি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে অসংখ্য হুমকিমূলক বার্তা পেয়েছিলেন। ইরানে তার পরিবারের সদস্যদের বেশ কয়েকবার তলব করা হয়েছিল এবং সাফিজাদেহ সাহেবকে ইরানে ফিরে আসার জন্য উৎসাহিত করতে বলা হয়েছিল। আফগানিস্তানে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে ২০১৯ সালের মার্চের এক পত্রে সাফিজাদেহ সাহেব এই হুমকিগুলো এভাবে ব্যাখ্যা করেছিলেন: “আট বছর আগে একজন গোয়েন্দা [মন্ত্রণালয়] কর্মকর্তা আমাকে দুবার ইরানে ফিরে যেতে অথবা অন্তত কোথাও তাদের সাথে দেখা করতে বলেছিলেন। দুই বছর আগে দক্ষিণ খোরাসান প্রদেশের গোয়েন্দা প্রধান আমার চাচা ও মাকে বলেছিলেন, ‘মৌলভীকে ফিরিয়ে আনুন; অন্যথায় যদি তিনি নিহত হন বা তার বা তার পরিবারের সদস্যদের কিছু হয় তবে অভিযোগ করবেন না’।” একই চিঠিতে সাফিজাদেহ সাহেব উল্লেখ করেছিলেন যে ২০১৬ সালের মে মাসে অন্য একটি ঘটনায় বেশ কিছু ব্যক্তি তাকে মসজিদে হত্যা করতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি নির্দিষ্ট ওই দিনে সেখানে ছিলেন না। (সাফিজাদেহ সাহেবের পত্র, ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০১৯; খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯)।

তদুপরি, সাফিজাদেহ সাহেবের এক মেয়ে, তার স্বামী ও সন্তান ২০০৭ সালের দিকে নিখোঁজ হন—আফগানিস্তানের হেরাতে তাদের পরিবারের সাথে দেখা করে ইরানে ফিরে যাওয়ার অল্প সময় পরেই। সাফিজাদেহ সাহেবের পরিবার বিচার বিভাগীয় এবং পুলিশ অঙ্গনগুলোতে মামলাটি নিয়ে অনেক চেষ্টা করেও কোনো ফল পায়নি; তারা বিশ্বাস করেন যে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় এর সাথে জড়িত ছিল এবং তাদের উদ্দেশ্য ছিল সাফিজাদেহ সাহেবকে হুমকি দেওয়া। (খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯)।

আফগানিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা সাফিজাদেহ সাহেবের পরিবারকে বহুবার সতর্ক করেছিলেন যে তার জীবন বিপন্ন। তাই তারা বেশ কয়েকবার বাসা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছিলেন। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কাছে লেখা চিঠিতে সাফিজাদেহ সাহেব বলেছিলেন: “২০১৭ সালের জানুয়ারিতে আফগান নিরাপত্তা এজেন্টরা আমাকে বলেছিল যে আমার জীবন ঝুঁকিতে এবং আমার সরে যাওয়া উচিত।” তাই সাফিজাদেহ সাহেব “তিন মাস ঘর থেকে বের হননি এবং যখনই বের হতেন, পরিবারের এক বা একাধিক সদস্য তার সাথে থাকতেন”। তার হত্যাকাণ্ডের তিন মাস আগে লেখা এই চিঠিতে তিনি জাতিসংঘ শরণার্থী কর্মকর্তাদের সাথে তার পূর্ববর্তী পত্রালাপের কথা উল্লেখ করেন এবং তাদের সতর্ক করে বলেন: “যদি আমার বা আমার পরিবারের কোনো সদস্যের কিছু হয়, তবে আমি আপনাদের দায়ী করব।” (সাফিজাদেহ সাহেবের পত্র, ফেব্রুয়ারি-মার্চ ২০১৯; খালেদ সাফিজাদেহের সাথে সাক্ষাৎকার, ১২ জুন ২০১৯)।

৫ জুলাই ২০১৮ তারিখে জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার সাফিজাদেহ সাহেবকে শরণার্থীর মর্যাদা প্রদান করেছিল। (জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের পত্র, ৫ জুলাই ২০১৮)।

৬. মাওলানা নযর মুহাম্মদ বালুচী

তিনি পার্লামেন্টের একজন সদস্য ছিলেন। খোমেনির শাসনামলে তাঁকে দুই বছর কারাবন্দী রাখা হয় এবং সেখানে তিনি নির্যাতনের শিকার হন। নির্যাতনের মাধ্যমে তাঁর কাছ থেকে ইরাক ও ইসরায়েলের হয়ে গোয়েন্দাগিরি করার মিথ্যা স্বীকারোক্তি আদায় করা হয়েছিল। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি ইরান ছেড়ে পাকিস্তানে চলে যান এবং বর্তমানে সেখানেই বসবাস করছেন।

৭. মাওলানা দোস্ত মুহাম্মদ বালুচী

খোমেনির কারাগারে দুই বছর কাটানোর পর তাঁকে ইসফাহানে নির্বাসিত করা হয়।

৮. সাইয়্যেদ আব্দুল বাইস ক্বাত্তালী

বন্দর খামিরের একটি সুন্নি মসজিদের এই ইমাম ও খতিবকেও কারাবন্দী করা হয়েছিল।

৯. মৌলভী ইব্রাহিম দামানী

বালুচিস্তানের এই আলেম অন্তত তিনবার কারাবরণ করেন। এই বছরের (১৯৯৭) রমজান মাসেও তিনি কারাদণ্ড ভোগ করছিলেন।

১০. শায়খ আব্দুল মাজীদ

১১. শায়খ মুহাম্মদ কাসিম

১২. শায়খ আহমদ নারাউয়ী

উপরোক্ত তিনজনই বালুচিস্তানের রাজধানী জাহেদান শহরের একটি সুন্নি ধর্মীয় মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন। তাঁদের কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার ও কারাবন্দী করা হয়েছিল।

১৩. মাওলানা আব্দুল্লাহ কুহিস্তানী

১৪. মাওলানা আব্দুল গনী শায়খ জামী

১৫. মাওলানা সাইয়্যেদ আহমদ হুসাইনী

১৬. মাওলানা আব্দুল বাক্বী শিরানী

১৭. মাওলানা জওয়ানশীর রাওয়াদী

১৮. মাওলানা গোলাম সারওয়ার ইয়ারিজমী

১৯. মাওলানা আব্দুল লতীফ

উপরোক্ত ব্যক্তিবর্গ সবাই কারাবন্দী ছিলেন।

২০. মাওলানা আব্দুল মালিক মোল্লাজাদা

মাওলানা আব্দুল মালিক ছিলেন সুন্নী আলেম মাওলানা আব্দুল আজিজ মোল্লাজাদার পুত্র। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি বালুচিস্তানে সুন্নিদের নেতা হিসেবে স্থলাভিষিক্ত হন। ১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে ইরান সরকার তাকে গ্রেপ্তার করে এবং ছয় মাস পর তিনি মুক্তি পান। ১৯৮৯ সালে বেশ কয়েকবার তলব করার পর তিনি পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৯৬ সালের ৪ মার্চ যে বাড়িতে তিনি অবস্থান করছিলেন, সেখান থেকে বের হওয়ার সময় ঘাতকদের গুলিতে তিনি নিহত হন। ধারণা করা হয় যে, তারা পাকিস্তানে অবস্থানরত ইরানি গোয়েন্দা সংস্থার লোক ছিল। তাঁর সাথে করাচিতে আরেক সুন্নি আলেম মৌলভি আবদুল নাসের জমশিদজেহির (Molavi Abdol Nasser Jamshidzehi) সাথে তাঁকে হত্যা করা হয়। এই হামলায় একজন পাকিস্তানি নারীও আহত হয়েছিলেন। গত কয়েক বছরে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে আরও বেশ কয়েকজন সুন্নি আলেমকে একইভাবে হত্যা করা হয়েছে যা পাকিস্তান ও আফিগানিস্তান সরাসরি ইরানকে দায়ী করেছে।

২১. শায়খ আব্দুল নাসির জামশিদযায়ী

এই ইরানী তরুণ আলেম করাচিতে মাওলানা আব্দুল মালিকের সাথে একই হামলায় নিহত হন। তিনি দামেস্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ছিলেন এবং করাচির জামিআতুল দিরাসাত আল-ইসলামিয়্যাহ-তে (University of Islamic Studies) প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

২২. মাওলানা আলী আকবর মোল্লাজাদা

তিনি মাওলানা আব্দুল মালিকের ছোট ভাই। পাকিস্তানে আক্রান্ত হওয়ার সময় তিনি অল্পের জন্য মৃত্যু থেকে বেঁচে যান। বর্তমানে তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতে নির্বাসিত জীবন যাপন করছেন।

২৩. ড. আহমদ সায়ইয়াদ আল-বালুশী

১৪১৬ হিজরি সনের (১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দ) রমজান মাসে মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদিস অনুষদের স্নাতক শায়খ ড. আহমদ মিরিন সায়ইয়াদ আল-বালুশী (আল্লাহ তাঁর ওপর রহম করুন) নিহত হন। তিনি আরও অনেক ইরানি সুন্নির সাথে পড়াশোনা করেছেন, যাঁদের মধ্যে তাঁর বন্ধু ড. আব্দুর রহিম মোল্লাজাদাও ছিলেন। ড. আব্দুর রহিম মোল্লাজাদা আরব বিশ্বে ‘শায়খ আবু মুনতাসির আল-বালুশী’ নামে পরিচিত; ২০০০-এর দশকের শুরুর দিকে ‘মুস্তাকিল্লাহ টিভি’র (Mustaqillah TV) বিতর্কগুলোতে তিনি একের পর এক আরবিভাষী রাফেজি আলেমদের মুখোশ উন্মোচন, অপদস্থ এবং তাঁদের যুক্তি খণ্ডন করার জন্য খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

শায়খ আহমদ সায়ইয়াদ আল-বালুশী মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের হাদিস অনুষদে ভর্তি হন এবং এর প্রথম ব্যাচেই চমৎকার কৃতিত্বের সাথে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর একাডেমিক গবেষণা এবং থিসিস লেখার সময় তিনি বিভিন্ন গ্রন্থাগারে গবেষণা ও ইসলামিক পাণ্ডুলিপিগুলো পরীক্ষার উদ্দেশ্যে মিশর, ইস্তাম্বুল এবং দেওবন্দ সফর করেছিলেন। হারামাইন শরিফাইনে প্রায় বিশ বছর পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৯৮৫ সালে ইরানি বালুচিস্তানের চাবাহার শহরের নিকটবর্তী নিজ এলাকা কারওয়ানে ফিরে আসেন। সেখানে তাঁর নিজ গ্রাম জারা-বাদে তিনি ‘দার আল সুন্নাহ’ নামে একটি মসজিদ ও দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মানুষের মাঝে ইসলামের সঠিক জ্ঞান ও নববী হাদিসের প্রচার ও প্রসার ঘটানো।

মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে শায়খ আহমদ সায়ইয়াদ ছিলেন প্রথম দিকের ইরানি সুন্নি ছাত্রদের একজন। সিস্তান ও বালুচিস্তান প্রদেশের এক দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণকারী এই মনীষী প্রথমে তাঁর চাচার কাছে হানাফী ফিকহ পড়েন এবং পরবর্তীতে উচ্চতর শিক্ষার জন্য মদিনায় পাড়ি জমান। সেখান থেকেই তিনি হাদিস শাস্ত্রে মাস্টার্স ও পিএইচডি সম্পন্ন করেন। তাঁর মাস্টার্সের থিসিস ছিল আমিরুল মুমিনিন আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর গুণাবলির ওপর (হ্যাঁ, তথাকথিত ‘ওয়াহাবী’ ভূমিতে ‘নাসেবি ওয়াহাবীরা’ এগুলোই অধ্যয়ন করে)। তিনি অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাপন, পোশাকে ও আহারে সাধারণত্ব, বিনয় এবং উন্নত চরিত্রের জন্য পরিচিত ছিলেন। রেওয়ায়েত বা বর্ণনাবিদ্যায় তাঁর গভীর পাণ্ডিত্য ছিল এবং হাদিসের সনদ ও সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণে তিনি বিশেষভাবে স্বীকৃত ছিলেন। ফিরে আসার তিন বছর পার হওয়ার আগেই ১৯৮৮ সালে ইরানি কর্তৃপক্ষ তাঁকে গ্রেপ্তার করে। কুখ্যাত ‘এভিন কারাগারে’ (Evin Prison) তিনি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় অন্যায়ভাবে কারাবন্দী ছিলেন। কারাবাসকালে তিনি সুন্নি ও শিয়া উভয় মতাদর্শের অসংখ্য হাদিস গ্রন্থ পর্যালোচনা করেন। কিন্তু আলী খামেনির নেতৃত্বাধীন ইসমাইল সাফাভীর উত্তরসূরি জালিম ও স্বৈরাচারী শাসকরা দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে কুরআন, সুন্নাহ এবং বিশুদ্ধ তাওহীদের এই প্রসার সহ্য করতে পারেনি। কারাগারে থাকাকালীন তিনি মুহাম্মদ বাকির আল-মজলিসীর ১৫০ খণ্ডের কিতাব ‘বিহার আল-আনওয়ার’ (বিহার আল-শিরক ওয়া আল-যুলুমাত) গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। (মজলিসী তাঁর এই বইতে দ্ব্যর্থহীনভাবে দাবি করেছেন যে সাহাবায়ে কেরাম কুরআন পরিবর্তন করেছেন, তিনি সাহাবীদের ব্যাপকভাবে তাকফির করেছেন এবং আহলে বায়তের নামে শিরক মিশ্রিত দোয়াকে পবিত্র ঘোষণা করেছেন)। মাজলিসী ইমামিয়া রাফেজি ধর্মের অন্যতম শ্রদ্ধেয় আলেম, যার জন্য ইরানে মাজার তৈরি করা হয়েছে এবং তাদের অনুসারীদের তাঁর মাধ্যমে তাওয়াসসুল (!) করতে উৎসাহিত করা হয়। খোমেনি এবং খামেনি—উভয়ই তাঁকে ( বাকের মাজলিসীকে) অত্যন্ত শ্রদ্ধা করতেন।

কারাগার থেকে মুক্তির পর শায়খ আহমদ সায়ইয়াদ পুনরায় তাঁর কাজ শুরু করেন, কিন্তু তাঁকে বারবার তলব ও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো। মুক্তির পর তিনি ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ভ্রমণ করেন। অবশেষে ১৪১৬ হিজরির ১০ই রমজান (কিছু সূত্রের মতে ১১ বা ১২ তারিখ), ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে একটি সুপরিকল্পিত গোয়েন্দা অভিযানের মাধ্যমে তাঁকে অপহরণ ও হত্যা করা হয়। সাদা পোশাকের সরকারি এজেন্টরা তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর শেষবার জীবিত দেখা গিয়েছিল। পাঁচ দিন পরে দক্ষিণ ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাবের কাছে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায়, যাতে নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। তাঁর এই হত্যাকাণ্ড ছিল একটি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং এটি ৯০-এর দশকে ইরানে সুন্নি আলেমদের ওপর চলা ধারাবাহিক গুপ্তহত্যারই একটি অংশ। তাঁর এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে জাতিসংঘ, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এবং বেশ কিছু ইরানি অধিকার ও বিরোধী গোষ্ঠী প্রতিবাদ জানিয়েছিল। গভীর শোক ও বেদনার সাথে সুন্নি সম্প্রদায় তাঁর মৃতদেহ নিজ গ্রামে নিয়ে আসে। তাঁর জানাজার সময় সরকারি বাহিনী সংঘর্ষ উসকে দেয় বলে খবর পাওয়া যায়, যার ফলে তিনজন সুন্নি বালুচ ব্যক্তি নিহত হন।

আল্লাহর ইচ্ছায়, তাঁর সেই অভিশপ্ত হত্যাকারী আলী খামেনি ৩২ বছর পর একই হিজরি মাসে এবং প্রায় একই দিনে মৃত্যুবরণ করেন—যিনি নিজের জনগণের কাছেই ঘৃণিত ছিলেন এবং রেখে গেছেন রক্ত ও নিপীড়নের এক কলঙ্কিত ইতিহাস।

সকল মহিমা সেই মহান সত্তার জন্য, যিনি অবকাশ দেন কিন্তু ছেড়ে দেন না।

২৪. শায়খ ফারুক ফারসাদ

শায়খ ফারুক ছিলেন আরদাবিলে বসবাসকারী একজন কুর্দি আলেম। তিনিও মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছিলেন। যিনি ‘কুরআন স্কুল’-এর নৈতিক নির্ভুলতা ও বিচার পরিষদের (Moral Infallibility and Judgment Council) একজন সদস্য ছিলেন। তিনি ছিলেন রাফেজী ইরান সরকারের লক্ষ্যবস্তু হওয়া আরেকজন সুন্নি আলেম। বেশ কয়েকবার গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁকে আরদাবিলে (Ardabil) নির্বাসিত করা হয়। ১৯৯৬ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি তিনি তাঁর বাড়ি থেকে বের হন, যা আগে থেকেই সরকারের নজরদারিতে ছিল। কিছুক্ষণ পরে নিকটস্থ এলাকায় তিনি ‘চেইন মার্ডার’ বা ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন এবং তাঁর শ্বাসরুদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। এই এলাকায় ইরানের গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের এজেন্টদের দ্বারা কয়েক ডজন বুদ্ধিজীবী

২৫. শায়খ মুহাম্মদ সালিহ যিয়ায়ী

শায়খ যিয়ায়ী ছিলেন বন্দর আব্বাসের প্রধান সুন্নি মসজিদের খতিব। তিনি সেই শহরের একটি উচ্চতর ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেরও প্রধান ছিলেন। তিনি মদিনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতক ছিলেন। ১৯৯৪ সালে রাস্তার ধারে তাঁর ক্ষতবিক্ষত মৃতদেহ পাওয়া যায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে: “ইরানের সরকারি সূত্র অনুযায়ী, পুলিশের তদন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে তিনি একটি গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছেন। তবে, এই বিবরণ প্রত্যক্ষদর্শীদের রিপোর্টের সাথে ভিন্নমত পোষণ করে যারা জানিয়েছেন যে তাঁর ক্ষতবিক্ষত দেহটি গাড়ি থেকে আলাদা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল, যা তথাকথিত দুর্ঘটনার লক্ষণের সাথে সংগতিপূর্ণ ছিল না। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বিশ্বাস করে যে একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন তদন্ত পরিচালিত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর মৃত্যুর প্রকৃত সত্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়”।

২৬. শায়খ মুহাম্মদ রাবীঈ

জনাব মোল্লা মোহাম্মদ রবি’ঈ (মামুস্তা রবি’ঈ), যিনি একজন সুন্নি মুসলিম এবং কেরমানশাহ শহরের জুমআর খতিব ছিলেন, তিনি এক ধারাবাহিক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার হন যা “চেইন মার্ডার” বা ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড (Serial Murders) নামে পরিচিত। তিনি ইসলামের শাফেয়ী মাযহাবের একজন “মুফতি” (সুন্নি ইসলামের শরয়ী বিধানের ব্যাখ্যাকারী এবং ‘ফতোয়া’ প্রদানের অধিকারী ব্যক্তি) ছিলেন। তাঁর জীবন, কর্মকাণ্ড এবং হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত তথ্যসমূহ তাঁর কর্মের ওয়েবব্লগ, জমহুরি ইসলামি দৈনিক পত্রিকা (ডিসেম্বর ১৯৯৬), রুজঅনলাইন-এ তাঁর স্ত্রীর সাক্ষাৎকার (২৬ ডিসেম্বর ২০১১), ‘বায়োগ্রাফি অফ সুন্নি লুমিনারিজ’ (সুন্নি মনীষীদের জীবনী), সুন্নি নিউজ, মাকতাবে কুরআন (কুরআন স্কুল), ইমাদউদ্দিন বাকী রচিত “দ্য ট্র্যাজেডি অফ ডেমোক্রেসি ইন ইরান” বই এবং ১৮ জানুয়ারি ২০০০ সালের জাতিসংঘ বিশেষ প্রতিনিধির প্রতিবেদনসহ অসংখ্য উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

জনাব মোহাম্মদ রবি’ঈ ১৩১১ (১৯৩২-৩৩) সালে কুর্দিস্তান প্রদেশের দিওয়ানদারেহ শহরের দারাসব গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইরান ও ইরাকি কুর্দিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষকদের নিকট তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং ১৩৪৩ (১৯৬৪-৬৫) সালে ফতোয়া প্রদান ও ধর্মতত্ত্ব শিক্ষাদানের অনুমতি লাভ করেন। ১৩৪৫ (১৯৬৬-৬৭) সালে তিনি ইরানের প্রতিনিধিত্ব করে একটি কুরআন তিলাওয়াত প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন। ইরানে ফেরার পর তাঁকে কুর্দি ভাষায় পরিচালিত একটি রেডিও প্রোগ্রামের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি আরদাবিলিস মাদ্রাসা এবং এমাদউদ্দৌলা মসজিদে কুরআন এবং এর সঠিক তিলাওয়াত ও তাজবীদ শিক্ষা দিতেন। ১৩৫১ (১৯৭২-৭৩) সালে তিনি কেরমানশাহ শহরের শাফেয়ী মসজিদের জুমআর খতিব নিযুক্ত হন। তাঁকে কুর্দিস্তানের শাফেয়ী মাযহাবের একজন প্রধান ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হতো। ১৯৭৮ সালের শরতে কেরমানশাহের জনগণের অনুরোধে জনাব রবি’ঈ কেরমানশাহের শাফেয়ী মসজিদের ইমাম ও খতিব এবং বাগ্মী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিবাহিত ছিলেন এবং তাঁর দুই ছেলে ও এক মেয়ে রয়েছে।

জনাব রবি’ঈ ফারসি, কুর্দি এবং আরবি ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর অত্যন্ত সুললিত ছিল এবং পবিত্র রমজান মাসে রেডিওতে ও কেরমানশাহের মসজিদগুলোতে তাঁর কুরআন তিলাওয়াত ও দোয়া সম্প্রচারিত হতো। কুর্দি, ফারসি ও আরবি ভাষায় তাঁর অসংখ্য রচনা রয়েছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো “বাকিয়াতুস সালেহাত” (باقیات الصالحات), যা শাফেয়ী মাযহাবের পূর্ণাঙ্গ বিধিবিধানের একটি সংকলন। অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে “হাশত ওর্দিবেহেশত”, “হযরত ওসমান”, “দোকান্দারানে তরিকত” (বিশ্বাসের বণিক), “আলিজনাব গুরিল” (হিজ হাইনেস দ্য গরিলা—একটি উপন্যাস) এবং চার হাজার দ্বিপদী সম্বলিত একটি কাব্যগ্রন্থ। (সুন্নি মনীষীদের জীবনী)। কেরমানশাহে জুমআর খতিব থাকাকালীন ইমাম শাফেয়ী মসজিদে বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম হতে শুরু করে। তিনি বিপ্লবের প্রথম দিকে আল্লামা আহমদ মুফতিজাদাহ-র একজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও সহযোগী ছিলেন এবং আয়াতুল্লাহ তালেঘানি ও তাঁর প্রতিনিধি দলের সাথে আলোচনায় সুন্নি প্রতিনিধিদের দলের সদস্য ছিলেন। (মোল্লা রবি’ঈর কর্মের ওয়েবসাইট)

১৯৯৬ সালের ২ ডিসেম্বর রবিবার দুপুর ১২:৩০ মিনিটে জনাব মোহাম্মদ রবি’ঈ কেরমানশাহ রেডিও ও টেলিভিশন স্টেশনে কাজে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হন এবং আর ফিরে আসেননি। রাত ১:০০ টার দিকে সানানদাজ-তেহরান বাস টার্মিনালের কাছে তাঁর লাশ পাওয়া যায়। লাশটি তাঁর গাড়ির পাশে শোয়ানো ছিল, তাঁর পাগড়িটি ছিল মাথার নিচে, আর চশমা ও ‘আবা’ (আলেমদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক) ছিল বুকের ওপর; লাশটি কিবলামুখী (যেদিকে মুখ করে মুসলিমরা নামাজ পড়ে এবং মৃতদেহ রাখা হয়) করে রাখা হয়েছিল। (রুজঅনলাইন, ২৬ ডিসেম্বর ২০১১)। জনাব রবি’ঈর হত্যার প্রতিবাদে তাঁর অনুসারীরা তাঁর দাফনের দিন অর্থাৎ ৩ ডিসেম্বর বিক্ষোভের আয়োজন করেন। এতে দাঙ্গা দমন পুলিশ ও সামরিক বাহিনী হস্তক্ষেপ করে, যার ফলে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত তা অন্যান্য কুর্দি শহরগুলোতেও বিস্তৃতি লাভ করে। বেশ কিছু কুর্দি শহর কয়েক দিনের জন্য বন্ধ ছিল। অনেক বিক্ষোভকারী আহত হন এবং অনেকে গ্রেপ্তার হন। কেরমানশাহে একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং রাওয়ানসার শহরে একজন তরুণ কলেজ ছাত্র গুলিতে নিহত হন। (জমহুরি ইসলামি পত্রিকা, ৭ ও ১৬ ডিসেম্বর ১৯৯৬; মোল্লা রবি’ঈর কর্মের ওয়েবসাইট; হামাদান ইউনিভার্সিটিতে সাঈদ ইমামির ভাষণ; “দ্য ট্র্যাজেডি অফ ডেমোক্রেসি”, পৃষ্ঠা ২৭৩)

২৭. শায়খ নাসির সুবহানী

কুর্দিস্তানের একজন মেধাবী সুন্নি আলেম ছিলেন। উস্তাদ নাসের সোবহানী ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দে ইরানের কুর্দিস্তান প্রদেশের কেরমানশাহ প্রদেশের আওরামানাত অঞ্চলের পাভে শহরের অন্তর্গত দোরিসান গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা নিজ জন্মভূমি ও পাভে শহরে সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি দ্বীনি শিক্ষা অর্জন শুরু করেন এবং কৈশোরেই তাঁর মেধা ও বিচক্ষণতা প্রকাশ পায়। দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে তিনি কুর্দিস্তানের অনেক বিখ্যাত শহর ও গ্রাম যেমন: পাভে, সানানদাজ, মারিওয়ান এবং পীরানশাহর ভ্রমণ করেন এবং ওই অঞ্চলের প্রখ্যাত আলেমদের সান্নিধ্য থেকে জ্ঞান লাভ করেন।

শাহী শাসনের বিরুদ্ধে ইরানের গণবিপ্লব শুরু হলে তিনিও সক্রিয় হন এবং পাভে, রাওয়ানসার, জাভানরুদ, সানানদাজ, কেরমানশাহ ও মারিওয়ান শহরে বেশ কিছু ভাষণ প্রদান করেন এবং গণ-আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি ‘ইখওয়ানুল মুসলিমিন’ (জামায়াতে দাওয়াত ও ইসলাহ) আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর মেধা, যোগ্যতা এবং আন্দোলনের প্রতি একনিষ্ঠতার কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি ইখওয়ানুল মুসলিমীন সদস্যদের আস্থাভাজন হন এবং আন্দোলনের নেতৃত্বের পর্যায়ে উন্নীত হন। ইরানের বিপ্লবের প্রথম বছরগুলোতে তিনি কর্মঠ উস্তাদ ও আলেমে রব্বানী উস্তাদ আহমদ মুফতিজাদা (রহ.)-এর একজন একনিষ্ঠ সহকর্মী ও বন্ধু ছিলেন। উস্তাদ মুফতিজাদা শহীদ নাসের সোবহানীকে একজন দরদী ভাই, সত্যবাদী বন্ধু এবং তাঁর চিরস্থায়ী সহকর্মী মনে করতেন। শহীদ সোবহানী উস্তাদ মুফতিজাদা (রহ.) এবং ইরান ও কুর্দিস্তানের অনেক আহলে সুন্নাত রাজনীতিবিদ ও উলামাদের সাথে নিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের কর্মকর্তাদের সাথে বেশ কিছু বৈঠক ও আলোচনায় অংশ নেন। এই উদ্দেশ্যে তিনি কয়েকবার কেরমানশাহ,কোম ও তেহরান সফর করেন এবং কুর্দি জাতি ও আহলে সুন্নাতের সমস্যার প্রতি গুরুত্বারোপের বিষয়ে শাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও বিতর্ক করেন। বিপ্লবের প্রথম বছরগুলোতে তিনি তৎকালীন কুর্দিস্তানের বড় বড় রাজনীতিবিদদের সাথে বেশ কিছু কংগ্রেসেও অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে যখন আহলে সুন্নাতের কেন্দ্রীয় পরিষদ (শামস) গঠিত হয়, তখন উস্তাদ সোবহানী এই সংগঠনের একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং প্রথম কংগ্রেসেই কেরমানশাহ প্রদেশের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হন। এছাড়াও তিনি শামস-এর দ্বিতীয় কংগ্রেসেও অংশগ্রহণ করেন। শামস-এর দ্বিতীয় অধিবেশন চলাকালীন ইরান সরকার ওই অধিবেশনে অংশগ্রহণকারী কয়েক ডজন ব্যক্তিকে বিভিন্ন শহর থেকে গ্রেপ্তার করে এবং উস্তাদ সোবহানীর বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। কিন্তু তারা তাঁকে ধরতে ব্যর্থ হয়। ফলে ১৯৮২ সালের শরতে তিনি নিজ এলাকা ত্যাগ করেন এবং ইরানের অন্যান্য শহরে গোপনে তাঁর কার্যক্রম চালিয়ে যান। ১৯৮৩ সালে তিনি পাকিস্তান সফর করেন। সেখানে তিনি বেশ কিছু বিশ্ববরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্বের সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি তৎকালীন আফগান জিহাদের কয়েকজন নেতার সাথেও দেখা করেন। ১৯৮৮ সালে তিনি তাঁর কয়েকজন ভাইসহ তুরস্ক সফর করেন এবং কুর্দি সমস্যা বিষয়ক একটি ইসলামী কংগ্রেসে অংশ নেন। সেখানে তিনি একটি মূল্যবান ভাষণ প্রদান করেন, যাতে তিনি কুরআন ও ইসলামের আলোকে জাতির অধিকার, জাতীয়তাবাদ ও জাতীয়তার বিষয়টি পর্যালোচনা করেন। অবশেষে ১৯৮৮ সালের ৬ জুন সানানদাজ শহরের একটি দাওয়াত থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর গ্রেপ্তারের কয়েক দিন পর পুরো ইরান জুড়ে অসন্তোষ ও প্রতিবাদের ঢেউ ওঠে এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সরকারের কাছে প্রতিবাদলিপি পাঠানো হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাতে কোনো লাভ হয়নি। এমনকি বিদেশের অনেক ইসলামী জামায়াত ও আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে উস্তাদ সোবহানীর গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের বিষয়ে ক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানান। ইরানের ভেতরেও এই উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সাথে অনেক বৈঠক করা হয়। এতো প্রচেষ্টার পর ইরান সরকারের কর্মকর্তারা উস্তাদ সোবহানীর বিষয়টি তদারককারী ব্যক্তিকে জানান যে, কয়েক দিন পর সানানদাজ শহরে তাঁর মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। অবশেষে কুর্দিস্তান প্রদেশের করভে শহরে শহীদ সোবহানীর কবর তাঁর আত্মীয়-স্বজনকে দেখিয়ে দেওয়া হয় এবং তাঁদের সতর্ক করে দেওয়া হয় যে, তাঁরা যেন তাঁর মরদেহ উত্তোলন না করেন। (আল্লাহ তাঁর আত্মাকে শান্তি দিন এবং তাঁর স্মৃতি অম্লান রাখুন)।

অনেক আলেম ও ইসলামী ব্যক্তিত্বের সাক্ষ্য অনুযায়ী, শহীদ উস্তাদ (রহ.) ছিলেন এক অনন্য বৈজ্ঞানিক যোগ্যতাসম্পন্ন আলেম এবং একজন আহলে ইজতিহাদ। তাই তাফসির, হাদিস, ফিকহ, দর্শন এবং দাওয়াত ও আন্দোলনের সকল ক্ষেত্রে তাঁর শক্তিশালী ও তাত্ত্বিক মতামত ও ইজতিহাদ রয়েছে।

শহীদ উস্তাদ (রহ.)-এর এক হাজারেরও বেশি অডিও ক্যাসেট সংরক্ষিত আছে, যা কুরআন তাফসির, আকাইদ, ইবাদত ও এর হিকমত, ইসলামের বুদ্ধিবৃত্তিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং উলূমুল কুরআন, উসূলে ফিকহ ও হাদিস শাস্ত্রের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এছাড়া বিপ্লবের আগে ও পরে বিভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর অনেক ভাষণ রয়েছে। কুর্দি ভাষা ছাড়াও আরবি ও ফারসি ভাষায় তাঁর কয়েকশ ক্যাসেট বর্তমান রয়েছে।

শহীদ নাসের সোবহানীর অন্যান্য ইলমী রচনাবলী: ১. মাজমুআ ফাতাওয়া (ফতোয়া সমগ্র): এটি ইরান ও সমসাময়িক বিশ্বের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা নিয়ে আরবি ভাষায় রচিত। ২. বিলায়াত ও ইমামত: এটি একটি রাজনৈতিক-দার্শনিক রচনা, যেখানে কুরআন অনুযায়ী বিলায়াত ও ইমামতের বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। ৩. তাজকিরাতুন ফী উলূমিল হাদিস: এটি মূলত একটি দীর্ঘ গবেষণাপত্র যা তিনি ‘মাজমাউস সুন্নাতিন নববিয়্যাহ’-এর জন্য লিখেছিলেন, যেটি ড. ইউসুফ আল-কারযাভী পরিচালনা করেন। এই গবেষণাপত্রে তিনি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস সংকলন প্রকল্পের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও লক্ষণীয় দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন। ৪. মুখতাসার মাদারিজুস সালিকিন: এতে তিনি আব্দুল মোনেম সালেহ-এর তাহজিবকে সংক্ষিপ্ত করেছেন। ৫. আকিদা বিষয়ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি কিতাব: যার বিষয়বস্তু তিনি সরাসরি কুরআন থেকে সংগ্রহ করছিলেন। গ্রেপ্তারের আগের দিনগুলোতে তিনি এটি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এটি অপূর্ণ থেকে যায়। উল্লিখিত কাজগুলো ছাড়াও ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে বিভিন্ন ইসলামী সাময়িকীতে তাঁর কয়েক ডজন প্রবন্ধ ও নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

২৮. শায়খ আব্দুল হক

পাকিস্তানের করাচির জামিআত আবি বকর থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এই আলেমকেও হত্যা করা হয়েছিল।

২৯. মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব সিদ্দিকী

পাকিস্তানের লাহোরের জামিআ ইসলামিয়্যাহ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা এই আলেমকেও হত্যা করা হয়েছিল।

৩০. ড. আলী মোজাফফারিয়ান

ড. মোজাফফারিয়ান একজন যোগ্য আলেম হওয়ার পাশাপাশি একজন এমবিবিএস ডাক্তারও ছিলেন। তিনি শিরাজ শহরের আহলুস সুন্নাহর ইমাম ও খতিব ছিলেন। তাঁকেও হত্যা করা হয়েছিল।

৩১. মৌলভী শের মুহাম্মদ বারাহউয়ী

বালুচিস্তানের জাবিল (Zabil) এলাকার এই আলেমকেও হত্যা করা হয়েছিল।

৩২.মৌলভী ফজলুর রহমান কুহি

মাশহাদের বিশেষ করণিক আদালত (Special Clerical Court) সিসতান ও বালুচিস্তানের সুন্নি জুমার ইমাম মৌলভী ফজলুর রহমান কুহিকে ছয় বছর চার মাস কারাদণ্ড দিয়েছে। ২০১৯ সালের নভেম্বরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ দমনের সময় তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো ২ অক্টোবর এই দণ্ডাদেশের খবর দিলেও ওই সুন্নি আলেমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পর্কে কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তার বিচারকার্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত ছিল না (অর্থাৎ রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছে)।

৩৩. মৌলভী হাবিবুল্লাহ হুসাইন

তিনি সারাভানের একজন সুন্নী আলেম ছিলেন। তাকেও হত্যা করা হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিস্তান ও বালুচিস্তান থেকে আব্দুল রশিদ রিগি, মৌলভী মোহাম্মদ ঘালান্দারজেহি, হাবিবুল্লাহ জামশিদি, আব্দুল গাফফার দাহানি এবং মোহাম্মদ দেহওয়ারি নামে সকল সুন্নি আলেমদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এছাড়াও হরমোজগানের তিন সুন্নি আলেম মৌলভী সাইদ আরামেশ, হাফেজ আব্দুল হাই আরামেশমৌলভী আমিন মোবারকি; উর্মিয়ার নিকটবর্তী গ্রামে কর্মরত সুন্নি আলেম ইসা আজারি এবং গোলেস্তান প্রদেশে বসবাসরত সুন্নি আলেম মৌলভী আলী সফর জেহি-ও গ্রেপ্তারের সম্মুখীন হয়েছেন।

রাফেজী ইরান কতৃক এই হত্যাযজ্ঞ ও গ্রেফতারীর ইতিহাস শেষ হবার নয় । বিগত ৪৫ বছর ধরে এই রাফেজীরা ইরানের হাজার হাজার সুন্নী ওলামায়ে কেরাম, সাধারণ সুন্নী জনগণকে গ্রেফতার, বিনা বিচারে মৃত্যুদন্ড দিয়েছে। ইরানকে সুন্নীশূণ্য করার জন্য কখনো তারা ওহাবী বলে কখনো “জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সমাবেশ ও যোগসাজশ,” কখনো “ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো,”কখনো “সালাফি গোষ্ঠীর সদস্যপদ,”কখনো “পৃথিবীতে ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি” কখনো “আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা” নাম দিয়ে শুধু সুন্নী মুসলিমদের বিনা অপরাধে জেলে বন্দী করে মিথ্যা সাক্ষী গ্রহণ করে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। পাঠকদের জন্য ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি খবরের বাংলা অনুবাদ তুলে ধরছিঃ

মূল খবরের লিঙ্ক দেখুন এখানে

ইরান: ৩৩ জন সুন্নি মুসলিমের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ করুন

মামলার বিবরণগুলো সুষ্ঠু বিচার নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে

জরুরি আপডেট, ১৩ জুন, ২০১৪: কারাগার কর্তৃপক্ষ রিপোর্ট অনুযায়ী রাজাই শাহর (Rajae Shahr) কারাগারের মৃত্যুপুরীতে থাকা ৩৩ জন বন্দীর মধ্যে ৪ জনকে—হামেদ আহমাদি, জাহাঙ্গীর দেহঘানি, জামশিদ দেহঘানি এবং কামাল মোল্লায়ি—জানিয়েছে যে, তাদের ১৪ জুন আদালতে হাজির হতে হবে। এই পদক্ষেপে তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার চরম আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই ব্যক্তিদের ইরানি কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ এক প্রবীণ সুন্নি আলেমকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন যে, ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে ওই শেখ নিহত হওয়ার কয়েক মাস আগে অর্থাৎ ২০০৯ সালের জুন ও জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে তাদের যখন গ্রেফতার করা হয়, তখন থেকেই তারা হেফাজতে ছিলেন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এর আগেও এমন ঘটনার নথিবদ্ধ করেছে যেখানে কারা কর্তৃপক্ষ মিথ্যা অজুহাতে (যেমন আদালতে হাজিরা বা পরিবারের সাথে দেখা করা) বন্দীদের ডেকে নিয়ে শেষ পর্যন্ত তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে।

আজ ১৮টি মানবাধিকার সংস্থা এবং একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী বলেছেন যে, ইরানি কর্তৃপক্ষের উচিত ৩৩ জন সুন্নি মুসলিম ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড বাতিল করা, যাদের মধ্যে সম্ভবত একজন কিশোর অপরাধীও রয়েছে। তাদের “আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা” (মুহারেবা) করার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। একইসাথে সমস্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ওপর অবিলম্বে স্থগিতাদেশ (moratorium) দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। এই আহ্বানটি এমন এক সময়ে এসেছে যখন এই ব্যক্তিদের দণ্ড প্রদানের আইনি প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। এছাড়া গত এক বছরে ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উচ্চ হার লক্ষ্য করা গেছে, যার মধ্যে ১ জুন, ২০১৪-এ একই অভিযোগে রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী গোলামরেজা খসরভি সাভাজানি-র ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর সংগৃহীত তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে, এই ব্যক্তিদের অধিকাংশকেই ২০০৯ এবং ২০১০ সালে পশ্চিম প্রদেশ কুর্দিস্তান থেকে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা গ্রেফতার করেছিলেন। বিচারপূর্ব আটকের সময় তাদের বেশ কয়েক মাস নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছিল এবং কোনো আইনজীবী বা আত্মীয়স্বজনের সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ধারণা করা হয়, সেই সময়ে তাদের ওপর নির্যাতন বা অন্য কোনো ধরনের দুর্ব্যবহার করা হয়েছে।

তাদের মধ্যে ৩১ জনের বিচার তেহরানের বিপ্লবী আদালতের ২৮ নম্বর শাখায় অনুষ্ঠিত হয়, একজনের বিচার তেহরানের ১৫ নম্বর শাখায় এবং অন্য একজনের বিচার সানন্দাজ (Sanandaj) বিপ্লবী আদালতের একটি শাখায় সম্পন্ন হয়। তাদের অস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত জাতীয় নিরাপত্তা অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে “জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে সমাবেশ ও যোগসাজশ,” “ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো,” “সালাফি গোষ্ঠীর সদস্যপদ,” “পৃথিবীতে ফাসাদ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি” এবং “আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা” (মুহারেবা)। শেষের দুটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে।

ইরানের ইসলামিক দণ্ডবিধির এই অস্পষ্ট শব্দযুক্ত অপরাধগুলো ফৌজদারি আইনের জন্য আন্তর্জাতিক আইনের দেওয়া স্পষ্টতা ও সূক্ষ্মতার মানদণ্ড পূরণ করে না। মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো বলেছে, কর্তৃপক্ষ নিয়মিতভাবে এই ধারাগুলো ব্যবহার করে সেইসব ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ করে যারা শান্তিপূর্ণভাবে তাদের ধর্ম পালনের স্বাধীনতা, মতপ্রকাশ, সংগঠন এবং সমাবেশের অধিকার চর্চা করে। অথবা কোনো প্রমাণ ছাড়াই সক্রিয় কর্মীদের সশস্ত্র বা সহিংস বিরোধী গোষ্ঠীকে সমর্থনের দায়ে অভিযুক্ত করতে এই আইন ব্যবহার করা হয়।

অধিকার গোষ্ঠীগুলোর সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, এই ব্যক্তিরা সশস্ত্র বা সহিংস কর্মকাণ্ডে কোনো প্রকার সম্পৃক্ততার কথা অস্বীকার করেছেন। তারা দাবি করেছেন যে, শুধুমাত্র ধর্ম চর্চা বা প্রচারের কারণে (যেমন ধর্মীয় সেমিনারে অংশ নেওয়া এবং ধর্মীয় পঠন সামগ্রী বিতরণ) তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। ইরানে সুন্নি মুসলিমরা সংখ্যালঘু, যেখানে অধিকাংশ মুসলিম শিয়া মতাবলম্বী। ইরানের অধিকাংশ সুন্নি কুর্দি এবং বেলুচ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে আইন ও বাস্তব উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের অভিযোগ করে আসছেন।

ইরানের দণ্ডবিধির সাম্প্রতিক পরিবর্তন অনুযায়ী, বিচার বিভাগের উচিত এই ৩৩ জনের মামলা পুনর্বিবেচনা করা এবং যদি তারা ব্যক্তিগতভাবে অস্ত্র ব্যবহার না করে থাকেন তবে “আল্লাহর বিরুদ্ধে শত্রুতা”র অভিযোগ থেকে তাদের মৃত্যুদণ্ড প্রত্যাহার করা। গোলামরেজা খসরভি সাভাজানি অস্ত্র ব্যবহার করেছেন এমন কোনো প্রমাণ আদালতে পেশ না করা সত্ত্বেও তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার বিষয়টি নির্দেশ করে যে, ইরানি কর্তৃপক্ষ সম্ভবত দণ্ডবিধির নতুন বিধানগুলো বাস্তবায়ন করছে না যা এই ৩৩ জন এবং মুহারেবা অভিযোগে অভিযুক্ত অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে পারত।

জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী, অভিযুক্তদের মধ্যে অন্তত একজন—বোরজান নাসরুল্লাহজাদে—কথিত অপরাধের সময় ১৮ বছরের কম বয়সী ছিলেন বলে ধারণা করা হয়। এটি শিশু অধিকার সনদ (Convention on the Rights of the Child) সহ আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা নিষিদ্ধ করে, ইরানও যার একটি পক্ষ।

এই গোষ্ঠীর মধ্যে চারজন ব্যক্তি—হামেদ আহমাদি, জাহাঙ্গীর দেহঘানি, জামশিদ দেহঘানি এবং কামাল মোল্লায়ি—ইরানি কর্তৃপক্ষের ঘনিষ্ঠ প্রবীণ সুন্নি আলেম মোল্লা মোহাম্মদ শেখ আল-ইসলামকে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত। তারা এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন যে, সেপ্টেম্বরে শেখের হত্যার কয়েক মাস আগে জুন ও জুলাইয়ের মধ্যে তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। সুপ্রিম কোর্ট ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে তাদের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে এবং দণ্ডগুলো সাজা বাস্তবায়ন কার্যালয়ে (Office for the Implementation of Sentences) পাঠানো হয়েছে। এই ব্যক্তিদের যেকোনো মুহূর্তে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট এই দলের আরও চার সদস্য—সৈয়দ জামাল মুসাভি, আবদুর রহমান সাঙ্গানি, সিদ্দিক মোহাম্মদি এবং সৈয়দ হাদি হোসেইনির মৃত্যুদণ্ডও বহাল রেখেছে। বাকি ২৫ জন সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনার অপেক্ষায় মৃত্যুপুরীতে রয়েছেন। তাদের অধিকাংশই কারাজ (Karaj) শহরের রাজাই শাহর এবং ঘেজেল হেসার (Ghezel Hesar) কারাগারে বন্দি বলে ধারণা করা হয়। একজনের খবর পাওয়া গেছে যে, সৈয়দ জামাল মুসাভি কুর্দিস্তান প্রদেশের সানন্দাজ কারাগারে রয়েছেন।

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো উদ্বিগ্ন যে, কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক সুষ্ঠু বিচারের মানদণ্ড লঙ্ঘন করে এবং আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকারের মতো মৌলিক সুরক্ষাগুলোকে উপেক্ষা করে এই ৩৩ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। গোষ্ঠীগুলোর সংগৃহীত তথ্য নির্দেশ করে যে, অন্তত কিছু বন্দীকে তাদের নিজেদের পছন্দমতো আইনজীবী ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়নি, যা ইরানি সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন (যেখানে আইনি পরামর্শ পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে)।

সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, তাদের সরকারিভাবে নিযুক্ত আইনজীবীদের কারাগারে তাদের সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি এবং তারা নথিপত্র দেখার সুযোগও পাননি। কয়েকজন বন্দি অভিযোগ করেছেন যে, বিচার শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট আগে তারা প্রথমবারের মতো তাদের আইনজীবীদের সাথে দেখা করেছিলেন। আদালতের কার্যক্রম রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং জানা গেছে যে এটি মাত্র ১০ থেকে ৩০ মিনিট স্থায়ী হয়েছিল।

কিছু বন্দি আরও অভিযোগ করেছেন যে, নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের যেসব স্বীকারোক্তিতে স্বাক্ষর করতে বাধ্য করা হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই বিচার বিভাগ মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এটি ইরানি সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন, যা “স্বীকারোক্তি আদায়ের উদ্দেশ্যে” সকল প্রকার নির্যাতন নিষিদ্ধ করে। বেশ কয়েকজন বন্দি খোলা চিঠিতে অভিযোগ করেছেন যে, আটকের সময় তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। বন্দিদের একজন, শাহরাম আহমাদি লিখেছেন:

“বিপ্লবী গার্ডের কর্মকর্তারা আমার মাথায় ও মুখে লাথি মেরেছিলেন, যার ফলে আমার নাক ও মাথা ফেটে যায়… আমার ভাঙা নাকের কোনো চিকিৎসা করা হয়নি… এবং এর ফলে বর্তমানে আমার শ্বাস নিতে সমস্যা হচ্ছে। [আমার] জিজ্ঞাসাবাদকারী জানতেন যে আমি আহত হয়েছি। তিনি উদ্দেশ্যমূলকভাবে আমার পেটে ঘুষি মারেন এবং আমার পুরনো ক্ষত থেকে প্রচুর রক্তপাত শুরু হয়। আমাকে ছদ্মনামে সানন্দাজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল… পরে আমার ক্ষতগুলোতে ইনফেকশন হয়ে যায় কিন্তু তারা আমাকে ওষুধ দিতে অস্বীকার করে।”

মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলো এই নির্যাতন ও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তদন্তের কোনো তথ্য খুঁজে পায়নি, যা ইরানের অভ্যন্তরীণ আইন এবং আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। ইরানের ইসলামিক দণ্ডবিধির ৫৭৮ অনুচ্ছেদে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য নির্যাতনকারী কর্মকর্তাদের শাস্তির বিধান রয়েছে। নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তির (ICCPR) ৭ম অনুচ্ছেদ, যাতে ইরানও একটি পক্ষ, নির্যাতন ও অন্যান্য দুর্ব্যবহার নিষিদ্ধ করে।

এই ব্যক্তিদের বিচারে যেসব অনিয়ম রিপোর্ট করা হয়েছে তা ICCPR-এর ১৪ অনুচ্ছেদের সুষ্ঠু বিচারের বিধানও লঙ্ঘন করে, যার মধ্যে রয়েছে নির্দোষ হওয়ার অনুমান (presumption of innocence), আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য পর্যাপ্ত সময় ও সুযোগ, নিজের পছন্দমতো আইনজীবীর সাথে যোগাযোগ এবং নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বা দোষ স্বীকার করতে বাধ্য না করা। জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিটি বলেছে: “যেসব বিচারের ফলে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার সম্ভাবনা থাকে, সেখানে সুষ্ঠু বিচারের গ্যারান্টিগুলোর যথাযথ সম্মান বজায় রাখা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”

ত্রুটিপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে, এই ১৮টি মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং একজন বিশিষ্ট মানবাধিকার আইনজীবী ইরানি কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে এই ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড স্থগিত এবং তাদের সাজা বাতিল করার আহ্বান জানাচ্ছে। কর্তৃপক্ষের উচিত অন্ততপক্ষে আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এবং মৃত্যুদণ্ডের বিকল্প রেখে এই ব্যক্তিদের নতুন করে বিচারের সুযোগ দেওয়া।

এই ৩৩ জন ব্যক্তির নাম নিচে বর্ণানুক্রমিকভাবে দেওয়া হলো: হামেদ আহমাদি, শাহরাম আহমাদি, আলম বারমাশতি, জাহাঙ্গীর দেহঘানি, জামশিদ দেহঘানি, সৈয়দ শাহো ইব্রাহিমি, ভারিয়া ঘাদেরিফার্দ, মোহাম্মদ ঘারিবি, সৈয়দ আবদুল হাদি হোসেইনি, ফারজাদ হোনারজো, মোহাম্মদ কায়ওয়ান করিমি, তালেব মালেকি, কামাল মোল্লায়ি, পৌরিয়া মোহাম্মদি, কায়ওয়ান মোমেনিফার্দ, সিদ্দিক মোহাম্মদি, সৈয়দ জামাল মুসাভি, তৈমুর নাদেরিজাদে, ফারশিদ নাসেরি, আহমদ নাসিরি, বোরজান নাসরুল্লাহজাদে, ইদ্রিস নেমাতি, ওমিদ পেইভান্দি, বাহমান রাহিমি, মোখতার রাহিমি, মোহাম্মদ ইয়াভার রাহিমি, আবদুর রহমান সাঙ্গানি, আমজাদ সালেহি, বেহরুজ শাহনাজারি, আরশ শরিফি, কাভে শরিফি, ফারজাদ শাহনাজারি এবং কাভে ভাইসি।

ইরান চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৃত্যুদণ্ড কার্যকরকারী দেশ হিসেবে রয়ে গেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালে ইরানি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে ৩৬৯টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা স্বীকার করেছে। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো জানিয়েছে যে, ২০১৩ সালে আরও শত শত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যার ফলে মোট সংখ্যা ৭০০ ছাড়িয়ে গেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ২৫ মে ২০১৪ পর্যন্ত ১৫১টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের কথা কর্তৃপক্ষ বা রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম স্বীকার করেছে, যেখানে নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো আরও অন্তত ১৮০টি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবর দিয়েছে, যার মোট সংখ্যা ৩৩১।

মানবাধিকার গোষ্ঠীসমূহ:

  • অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International)
  • হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch)
  • জাস্টিস ফর ইরান (Justice for Iran)
  • আবদুর রহমান বোরুমন্দ ফাউন্ডেশন (Abdorrahman Boroumand Foundation)
  • আর্শে সেভম (Arseh Sevom)
  • ইরানে আজারবাইজানি রাজনৈতিক বন্দীদের প্রতিরক্ষা সমিতি (Association for Defense of Azerbaijani Political Prisoners in Iran)
  • ইরানের কুর্দিস্তান মানবাধিকার সংস্থা-জেনেভা (KMMK-G)
  • বেলুচ মানবাধিকার সংস্থা (Baloch Human Rights Organization)
  • ইরানে আরবদের বিরুদ্ধে বর্ণবাদ ও বৈষম্য বিরোধী কেন্দ্র (Center for Combating Racism & Discrimination against Arabs in Iran)
  • মানবাধিকার সমর্থকদের কেন্দ্র (Centre for Supporters of Human Rights)
  • মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ (ECPM)
  • ইরানে মানবাধিকারের জন্য আন্তর্জাতিক প্রচারণা (International Campaign for Human Rights in Iran)
  • ইরান হিউম্যান রাইটস (Iran Human Rights)
  • ইরান হিউম্যান রাইটস ডকুমেন্টেশন সেন্টার (Iran Human Rights Documentation Center)
  • মৃত্যুদণ্ড বন্ধে ধাপে ধাপে পদযাত্রা (LEGAM)
  • মেহরঙ্গিজ কার (Mehrangiz Kar)
  • নোবেল নারী উদ্যোগ (Nobel Women’s Initiative)
  • সিয়ামাক পুরজন্দ ফাউন্ডেশন (Siamak Pourzand Foundation)
  • ইউনাইটেড ফর ইরান (United for Iran)

মসজিদ ও মাদ্রাসা ধ্বংস

ওলামায়ে কেরামকে হত্যা, নির্বাসন বা কারাবন্দী করার পাশাপাশি সুন্নি মসজিদগুলো বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। মসজিদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার অন্তত দুটি ঘটনা ঘটেছে; একটি মাশহাদ শহরে এবং অন্যটি তোরবাল-ই জাম (Torbal-e Jam) এলাকায়। মাশহাদে একটি সুন্নি মাদ্রাসা সেনাবাহিনী জোরপূর্বক দখল করে নেয়। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এবং কর্মীদের তাঁদের ধর্মীয় পদের মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছিল, আর শিক্ষার্থীদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে নিয়োগ (conscripted) করা হয়েছিল। এটি ছিল ইরানি আইনের পরিপন্থী, কারণ উক্ত আইন অনুযায়ী ধর্মীয় শিক্ষার্থীদের সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: খোমেনিপন্থী শাসনব্যবস্থা ‘ওয়াহীবাদ’-এর অজুহাত দিয়ে অনেক স্পষ্টভাষী ইরানি সুন্নি আলেম ও দাঈদের হত্যা করেছে—ঠিক যে স্লোগানটি বর্তমানে ড্যানিয়েল হকিকাতজু এবং তার সহযোগীরা ব্যবহার করে। হরমুজগান থেকে খোরাসান পর্যন্ত সুন্নি পারস্যবাসী এবং বালুচ থেকে শুরু করে কুর্দি পর্যন্ত ইরানে শহীদ হওয়া সুন্নি ওলামাদের তালিকা দীর্ঘ, যাঁদের ইতিহাস অধিকাংশ মুসলিমের কাছে আজও অজানা। যদি আমি তাঁদের প্রত্যেকের সম্পর্কে লিখতে চাই, তবে বই সংকলনের জন্য আমার একটি পুরো দল প্রয়োজন হবে। কিন্তু এই ‘গুরাবা’ (অচেনা পথিক) এবং আল্লাহর ওলিদের খবর আল্লাহ নিজেই জানেন। আর শয়তান ও প্রতারকদের বিচার দিবসে জবাবদিহি করতে হবে।


তথ্যসূত্রঃ

[মাওলানা মুহাম্মদ ত্বহা কারান (رحمه الله) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত পাক্ষিক সাময়িকী ‘আল-ইস্তিক্বামাহ’ (স্থাপিত: ১৯৯৭) থেকে অনূদিত। এর সাথে আরো বিভিন্ন জায়গা থেকে সম্পাদনা করে এই নির্যাতিত মুসলিমদের তথ্য সংগ্রহ করে যুক্ত করা হয়েছে। ভবিষ্যতে তথ্য আপডেটের কাজ চলতে থাকবে]



Leave a comment