বইঃ আহলে বাইতঃমধ্যপন্থী এবং চরমপন্থী মতবাদগুলোর মধ্যে আহলে বাইতের প্রকৃত পরিচয়ের অনুসন্ধান।
লেখকঃমুহাম্মদ সালিম আল খিদ্বর
অনুবাদঃ আবু মাইসারা
কপিরাইটঃ অনুবাদক কতৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুবাদকের লিখিত অনুমতি ব্যতীত বইটি কেউ প্রকাশ করলে তা আইনত দন্ডনীয় আপরাধ বলে গণ্য হবে।তবে প্রচারের উদ্দেশ্যে যে কেউ এই ওয়েবসাইট থেকে যেকোন লেখা কোন রকম কাটছাট ব্যতীত যেকোন অনলাইন প্লাটফর্মে প্রকাশ করতে পারবে তবে অবশ্যই লেখক ও অনুবাদকের নাম উল্লেখ করে দিবেন।
পর্বঃ১
আহলে বাইত কারা?
নিঃসন্দেহে, কুর’আন ও রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সুন্নাহ-র অন্তর্নিহিত পরিভাষাসমূহ বুঝতে পারা হলো এই গ্রন্থদ্বয়ের মূল উদ্দেশ্য ও অর্থ উপলব্ধির চাবিকাঠি। একইভাবে, ‘ইসলামিক টার্মস’ বা ইসলামী পরিভাষাসমূহের গভীরে গিয়ে তাদের আসল মর্ম উদ্ঘাটন করাই হলো যেকোনো উদ্দেশ্যমূলক আলোচনার ভিত্তি স্থাপনের প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ। প্রকৃতপক্ষে, বর্তমান সময়ের অধিকাংশ মতবাদগত বিতর্কই একাডেমিক ভিত্তির অভাবে নিষ্ফলা হয়ে থাকে; এ কারণেই সেসব আলোচনা সাধারণত শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও খুব দ্রুত অভিযোগের কোলাহলে রূপ নেয়; এবং বিতর্ক শেষে লক্ষ্য করা যায় যে, কেউই তাদের নিজ নিজ অবস্থান স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হননি।
সুতরাং এটি গুরুত্বপূর্ণ যে, মানুষ যেন দীর্ঘ আলোচনা ও তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হওয়ার আগে ‘মূল পরিভাষাগুলো’ এবং সংশ্লিষ্ট ভিত্তিসমূহ স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীনভাবে সংজ্ঞায়িত করে নেয়।
ইবনে হাযম (রহ.) একবার বলেছিলেন: “প্রত্যেক বিকৃতি ও বিচ্যুতির মূল হলো শব্দের জগাখিচুড়ি; অর্থাৎ, এমন কিছু শব্দের নাম ও অর্থের মধ্যে গোলমাল সৃষ্টি করা, যেগুলোর একাধিক ব্যাখ্যা হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে, একজন ব্যক্তি একটি নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেন তার বহু অর্থের একটি উদ্দেশ্য নিয়ে, কিন্তু শ্রোতা তা ভিন্নভাবে বুঝে নেন, যার ফলে সৃষ্টি হয় বিবাদ ও অস্পষ্টতা। ইসলামী শরী‘আহ-র ক্ষেত্রে এই ধরনের বিকৃতি কারো জন্য অপূরণীয় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে; আল্লাহ যাদেরকে হিফাযত করেছেন, তারা ছাড়া।”[1]
সুতরাং, মুসলমানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব এবং বিভেদ অবসানের জন্য ভালো গবেষকদের প্রথমে এই বিষয়টির সাথে সম্পর্কিত শব্দগুলোর সঠিক অর্থের সাথে নিজেদেরকে পরিচিত করা প্রয়োজন ।
আরবি ভাষায় (আল) এবং (আহল) এর অর্থ
আমরা আহল-বাইত শব্দটি সম্পর্কিত অনেকগুলি পরিভাষাীয় ব্যাখ্যা শুনতে এবং দেখতে পাই, উদাহরণস্বরূপ:
- আ’ল আল বাইত
- আহল আল বাইত
- আ’ল আল মুহাম্মাদ
- আ’ল আন নবী
- ইতরাত আন নবী
এগুলির কি আলাদা আলাদা অর্থ রয়েছে, নাকি সবগুলো একই অর্থ বহন করে? উপরোক্ত প্রশ্নটির বিশদ জবাব দেওয়ার আগে আরবী ভাষায় (আ’ল) এবং (আহল) অর্থের দিকে মনোযোগ দেওয়া জরুরি।
আলঃ
এই শব্দটির অর্থ নির্ধারণের বিষয়ে ভাষাবিদদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। আমরা যখন ভাষাতত্ত্ববিদদের বক্তব্য একত্র করি তখন আল শব্দটি সম্পর্কে মাত্র দুটি স্বতন্ত্র মতামত দৃষ্টিগোচর হয়।
প্রথম মতামত – “আল” এর ভিত্তি “আহলঃ
রাগিব আসফাহনী (৫০২ হি), ইবনে মানজুর (৭১১ হি), এবং ফিরোজাবাদি (৮১৭ হি) লিখেছেন যে আ’ল শব্দটি আহল [2] থেকে উদ্ভূত হয়েছে, তবে কয়েকটি কারণের ভিত্তিতে ইবনুল কাইয়্যিম এই মতটিকে দুর্বল (যয়ীফ) সাব্যস্ত করেছেন ।[3]
দ্বিতীয় মত (গৃহীত মত):
আ‘ল শব্দটি হামজা (أ), ওয়াও (و) এবং লাম (ل) অক্ষর থেকে উদ্ভূত হয়েছে, যার মিলিত রূপ আওল (أول)।এর অর্থ “ফিরে আসা” বা “পশ্চাদপসরণ বা পুনর্মিলন”।
খলিল আহমেদ ফারাহিদি (১৭০ হি), ইবনে ফারিস (৩৯৫ হি), ইবনে জাওজী(৫৯৭ হি)থেকে এই মত বর্ণিত হয়েছে এবং ইবনু তাইমিয়্যাহ (৪২৮ হি) ও এই মত পোষণ করেছেন।[4]
এখন আলোচনার বিষয় হলোঃ এই শব্দের অর্থ (আল) যখন কোনও ব্যক্তির সাথে সম্পৃক্ত করা হবে তখন তার অর্থ কী হওয়া উচিত? ভাষাবিদগণ এ সম্পর্কে দুটি ভিন্ন মত দিয়েছেন:
- তার পরিবারের সদস্যরা।
- যারা তাঁর আনুগত্য করে এবং তাকে অনুসরণ করে।
জাওহারি (৩৯৩ হি) লিখেছেন, যে কোনও ব্যক্তির আ‘ল তার পরিবারের সদস্যদের এবং যারা তাকে অনুসরণ করে তাদের বোঝায়।[5]
ইবনে ফারিস (৩৯৫ হি) ও একই মত প্রকাশ করেছেন যে, কোনও ব্যক্তির আ’ল বলতে তার পরিবারের সদস্যদের বোঝায়।[6]
ইবনে জাওযী (রহ) তার শিক্ষক আলী বিন উবাইদুল্লাহ (রহ)-এর বক্তব্য লিপিবদ্ধ করেছেন যে, আ’ল ওইসব লোকদের বোঝায় যারা কোন ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত, হোক তা ঐ ব্যক্তির বংশধারার মাধ্যমে বা ওইসব লোকের আনুগত্য ও অনুসরণের কারণে।[7]
উপরোক্ত উভয় অর্থের সমর্থনে মূল উৎসগুলিতে (কোরআন ও সুন্নাহ) অনেকগুলো দলিল পাওয়া যায়।
কোরআনের নিম্নোক্ত কয়েকটি আয়াতে আ‘ল শব্দটি আহল বা পরিবারের সদস্য অর্থে ব্যবহার হয়েছে।
আল্লাহ বলেনঃ
فَقَدۡ اٰتَیۡنَاۤ اٰلَ اِبۡرٰہِیۡمَ الۡکِتٰبَ وَ الۡحِکۡمَۃَ وَ اٰتَیۡنٰہُمۡ مُّلۡکًا عَظِیۡمًا
“আমি ইবরাহীমের বংশধরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি বিশাল রাজত্ব।”[8]
উপরোক্ত আয়াতে আল শব্দটি ইব্রাহিম (আঃ) এর সন্তান ও বংশধরকে বোঝায় যাদেরকে আল্লাহ নবুওয়াত (রিসালাহ ও নুবুওয়াহ) এর জন্য বেছে নিয়েছিলেন এবং তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত রাজা হলেন সোলায়মান (আঃ)[9]
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পবিত্র কুরআনে উল্লেখ করেছেন যে, ইয়াকুব (আঃ) তাঁর পুত্র ইউসুফ (আঃ) -কে উদ্দেশ্য করে বলেন:
وَ کَذٰلِکَ یَجۡتَبِیۡکَ رَبُّکَ وَ یُعَلِّمُکَ مِنۡ تَاۡوِیۡلِ الۡاَحَادِیۡثِ وَ یُتِمُّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکَ وَ عَلٰۤی اٰلِ یَعۡقُوۡبَ کَمَاۤ اَتَمَّہَا عَلٰۤی اَبَوَیۡکَ مِنۡ قَبۡلُ اِبۡرٰہِیۡمَ وَ اِسۡحٰقَ ؕ اِنَّ رَبَّکَ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ
“আর এভাবে তোমার রব তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষা দেবেন। আর তোমার উপর ও ইয়াকূবের পরিবারের উপর তাঁর নিআমত পূর্ণ করবেন যেভাবে তিনি তা পূর্বে পূর্ণ করেছিলেন তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের উপর, নিশ্চয় তোমার রব সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।”[10]
উপরোক্ত আয়াতটিতে ও আল শব্দটি ইয়াকুব(আঃ) এর সন্তান ও বংশধরকে বোঝায়,অনুসারীদের নয়।
এভাবে একই অর্থে, আল্লাহ বলেছেন:
یَعۡمَلُوۡنَ لَہٗ مَا یَشَآءُ مِنۡ مَّحَارِیۡبَ وَ تَمَاثِیۡلَ وَ جِفَانٍ کَالۡجَوَابِ وَ قُدُوۡرٍ رّٰسِیٰتٍ ؕ اِعۡمَلُوۡۤا اٰلَ دَاوٗدَ شُکۡرًا ؕ وَ قَلِیۡلٌ مِّنۡ عِبَادِیَ الشَّکُوۡرُ
“তারা তৈরী করত সুলাইমানের ইচ্ছানুযায়ী তার জন্য প্রাসাদ, ভাস্কর্য, সুবিশাল হাউযের মত বড় পাত্র ও স্থির হাড়ি। ‘হে দাঊদ পরিবার, তোমরা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ আমল করে যাও এবং আমার বান্দাদের মধ্যে অল্পই কৃতজ্ঞ।”[11]
এখানে আ‘ল-এ-দাউদ (আঃ) শব্দটি দাউদ (আঃ) এবং তার পরিবারকে বোঝায়।[12]
এবং নিম্নোক্ত আয়াতে আল শব্দটি আনুসারী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
আল্লাহ বলেনঃ
اَدۡخِلُوۡۤا اٰلَ فِرۡعَوۡنَ اَشَدَّ الۡعَذَابِ
“ফির‘আউনের অনুসারীদেরকে কঠোরতম আযাবে প্রবেশ করাও” [13]
আলেমদের সুলতান ইজ্জুদ্দিন ইবনে আবদিস সালাম (মৃত্যু: ৬৬০ হি / ১২১২ খ্রি।) তাঁর তাফসীরে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে আহল আল বাইত এবং আল-আল-বাইত একই অর্থ বহন করে।[14]
কাব ইবনে উজরাহ বলেন: আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলাম: হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কীভাবে আপনার আহলে বাইতের উপর দরূদ পাঠ করব? তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বললেনঃ বলো:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ. اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَىٰ مُحَمَّدٍ وَعَلَىٰ آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَىٰ إِبْرَاهِيمَ وَعَلَىٰ آلِ إِبْرَاهِيمَ، إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ.
“হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি রহমত নাযিল করো যেমন রহমত নাযিল করেছিলে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসনীয় ও মর্যাদাবান। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি বরকত নাযিল করো যেমন বরকত নাযিল করেছিলে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসনীয় ও মর্যাদাবান।”
উপরের হাদীসটি বর্ণনা করার পর আল হাফিজ আল হাকিম আন নিশাপুরী বলেন আমি হাদিসটি এই জন্য উল্লেখ করছি যাতে সবার বুঝে আসে আ‘ল আল বাইত এবং আহল আল বাইত একই অর্থ বহন করে।[15]
বারো ইমামি পণ্ডিত ইবনে বাবওয়াইয়ি আল কুম্মি বলেছেনঃ “আল মানে আহল।”আল্লাহ লূত (আঃ) এর জীবনীতে বলেনঃ
فَاَسۡرِ بِاَهۡلِكَ بِقِطۡعٍ مِّنَ الَّیۡلِ
“সুতরাং তুমি তোমার পরিবার নিয়ে রাতের কোন এক অংশে রওয়ানা হও।”[16]
এবং তিনি (আল্লাহ আজ্জা ওয়া জাল্লা) বলেনঃ
اِلَّاۤ اٰلَ لُوۡطٍ ؕ نَجَّیۡنٰهُمۡ بِسَحَرٍ
“তবে লূত পরিবারের উপর নয়। আমি তাদেরকে শেষ রাতে নাজাত দিয়েছিলাম”[17]
এভাবে তিনি আ‘ল (আহল) কে বর্ণনা করেছেন।[18]
[1] আল ইহকাম ফি উসুলুল আহকাম,ভলিঃ৮,পৃঃ ১০১
[2]আল মুফরাদাত ফি গারীব আল কোরআন,পৃঃ৩৮;লিসানুল আরব,ভলিঃ১১,পৃঃ২৮;আল কামুসুল মুহিত,ভলিঃ৩,পৃঃ৩৩১
[3]জালাউল আফহাম,ইবনুল কাইয়্যিম,পৃ-১১৫
[4]কিতাবুল আয়ুন, ভলিঃ ৮,পৃঃ ৩৫৯; মুজামু মাকায়ীস আল-লূগাহ, ভলিঃ ১,পৃঃ১৫৯; নুজহাত আল আয়ুন,পৃঃ১২১; মাজমুঊল ফাতাওয়া,ভলিঃ ২২,পৃঃ ৪৬৩।
[5]আস-সিহাহ,ভলিঃ৪,পৃঃ১৬২৭
[6]মুজামু মাকায়ীস আল-লূগাহ,ভলিঃ১,পৃঃ১২১
[7] নুজহাত আল আয়ুন,পৃঃ১২১-১২২
[8]আন নিসা ৪:৫৪
[9]তাফসীর আল বাগাভী,ভলিঃ২,পৃঃ২৩৬;তাফসীর আত তাহরীর ওয়া আত তানভীর,ভলিঃ৪,পৃঃ ২১ এবং তাফসীর আস সাদী,ভলিঃ১,পৃঃ ১৮২।
[10]ইউসুফ ১২:৬
[11]সাবা ৩৪:১৩
[12]তাফসীর আল কুরতুবী,ভলিঃ১৪,পৃ-২৬৮; তাফসীর আল বাগাভী,ভলিঃ৬,পৃঃ৩৯১; তাফসীর আস সাদী,ভলিঃ১,পৃঃ৬৭৬
[13]গাফির ৪০:৪৬
[14]তাফসীর আল ইজ আবদিস সালাম,ভলিঃ১,পৃঃ১২৪।
[15]আল মুসতাদরাক,ভলিঃ৩,পৃ-১৬০,হাদীসঃ৪৭১০
[16]সূরা হুদ ১১:৮১
[17]সূরা কামার ৫৪:৩৪
[18]কামাল আদ্দীন ওয়া তামাম আল নিমাহ,পৃঃ২৪১-২৪২

Leave a comment