বইঃ আহলে বাইতঃমধ্যপন্থী এবং চরমপন্থী মতবাদগুলোর মধ্যে আহলে বাইতের প্রকৃত পরিচয়ের অনুসন্ধান।
লেখকঃমুহাম্মদ সালিম আল খিদ্বর
অনুবাদঃ আবু মাইসারা
আহলঃ
ভাষাবিদগণ একমত যে, কোন লোকের আহল বলতে তাঁর স্ত্রী এবং যেসব মানুষ তাঁর কাছে সবচেয়ে খাস (most Special) তাদের বোঝায়।
খলিল ইবনে আহমদ (মৃঃ১৭৫ হি/৭৯১ খ্রি) তাঁর কিতাব আল-আয়ুনে লিখেছেন: কোন লোকের আহল হলো তাঁর স্ত্রী এবং যেসব মানুষ তাঁর কাছে সবচেয়ে খাস(most Special) তারা।[1]
উপরোক্ত বক্তব্য সত্যায়ন করে ইবনে ফারিস (৩৯৫ হি/১০০৪ খ্রি) তার কিতাব মুজামু মাকায়ীস আল-লূগাহতে খলিল ইবনে আহমদের এই বক্তব্য উল্লেখ করেছেন।[2]
আল আযহারী (মৃঃ৩৭০ হি)লাইস ইবনুল মুজাফফর থেকে বর্ণনা করেন, “কোন লোকের আহল হলো তাঁর স্ত্রী এবং যেসব মানুষ তাঁর কাছে সবচেয়ে খাস (most Special) তারা।”[3]
ইবনে মানজুর(মৃঃ৭১১ হি ),আল-ফাইরুজাবাদি (মৃঃ৮১৭ হি) এবং অন্যান্যরা ও এই মত গ্রহন করেছেন।[4]
আল রাগিব আল আসবাহানি (মৃঃ৫০২ হি) বলেনঃ“কোন লোকের আহল বলতে ঐসব ব্যক্তিদের বোঝায় যারা তাঁর সাথে বংশ বা ধর্মের মাধ্যমে সংযুক্ত আছেন বা যারা শিল্প, বাড়ি এবং দেশের ক্ষেত্রে তার সাথে যুক্ত আছেন। সুতরাং, মূলত কোন লোকের আহল হলো ঐসব লোকেরা যারা তাঁর সাথে একই বাড়ি ভাগাভাগি করেছিল, তারপর তা এভাবে প্রচার হলো যে এরাই ঐসব লোক যারা বংশের মাধ্যমে তাঁর সাথে যুক্ত ছিল; এবং [এই পরিভাষা] (আহলে বাইত) সাধারণত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পরিবারের মধ্যেই পরিচিত ছিল।[5]
আমি বলি: এ পর্যন্ত যা উপস্থাপিত হয়েছে তার মূল কথা হলো কোন লোকের আহল তার স্ত্রীকে অন্তর্ভূক্ত করে।এ বিষয়ে কোরআন এবং সুন্নাহায় অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যা এই বইয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।
সামগ্রিকভাবে এই পরিভাষাটি পরিবর্ধিত হয়ে তাদেরকে অন্তর্ভূক্ত করেছে যারা কোন লোকের সাথে বংশধারার মাধ্যমে যুক্ত হয়েছেন।এর প্রমাণ মুসা আঃ এর বক্তব্য যা কোরআনে উল্লেখিত হয়েছেঃ
وَاجْعَل لِّي وَزِيرًا مِّنْ أَهْلِي
“এবং আমার পরিবার থেকে আমার জন্য একজন সাহায্যকারী নিয়োগ করুন।”[6]
তিনি তার ভাই হারুন (আঃ) কে উদ্দেশ্য করে একথা বলেছিলেন।আরো অনেক প্রমাণ রয়েছে যা আমরা পরে উল্লেখ করব।
শব্দগুচ্ছটি (আহলে বাইত) বিশ্বাসের মাধ্যমে সম্পৃক্তদেরও অন্তর্ভূক্ত করে।যার প্রমাণ নূহ (আঃ) এবং তার সন্তান সম্পর্কে আল্লাহর বাণীঃ
وَ نَادٰی نُوۡحٌ رَّبَّهٗ فَقَالَ رَبِّ اِنَّ ابۡنِیۡ مِنۡ اَهۡلِیۡ وَ اِنَّ وَعۡدَكَ الۡحَقُّ وَ اَنۡتَ اَحۡكَمُ الۡحٰكِمِیۡنَ ﴿۴۵﴾قَالَ یٰنُوۡحُ اِنَّهٗ لَیۡسَ مِنۡ اَهۡلِكَ ۚ اِنَّهٗ عَمَلٌ غَیۡرُ صَالِحٍ ٭۫ۖ فَلَا تَسۡـَٔلۡنِ مَا لَـیۡسَ لَكَ بِهٖ عِلۡمٌ ؕ اِنِّیۡۤ اَعِظُكَ اَنۡ تَكُوۡنَ مِنَ الۡجٰهِلِیۡنَ
“আর নূহ তার রবকে ডাকল এবং বলল, ‘হে আমার রব, নিশ্চয় আমার সন্তান আমার পরিবারভুক্ত এবং আপনার ওয়াদা নিশ্চয় সত্য। আর আপনি বিচারকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ বিচারক’। তিনি বললেন, ‘হে নূহ, সে নিশ্চয় তোমার পরিবারভুক্ত নয়। সে অবশ্যই অসৎ কর্মপরায়ণ।[7] সুতরাং যে বিষয়ে তোমার কোন জ্ঞান নেই, আমার কাছে তা চেয়ো না। আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি, যেন মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত না হও।”[8]
এবং ঐ হাদিস যা ইবনে হিব্বান তার সহীহাতে ওয়াছিলা ইবনুল আসকাম থেকে বর্ণনা করেন,তিনি বলেনঃ
“আমি আলীর খোজে তার বাসায় গেলাম,আমাকে বলা হলো তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আনতে গেছেন এবং হঠাৎ তিনি চলে আসলেন।রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘরে প্রবেশ করলেন এবং আমিও ভিতরে গেলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিছানায় বসলেন এবং ফাতিমাকে তার ডান পাশে,আলীকে তার বাম পাশে বসালেন আর হাসান হোসাইনকে তার সামনে বসালেন এবং বললেনঃ
اِنَّمَا یُرِیۡدُ اللّٰهُ لِیُذۡهِبَ عَنۡكُمُ الرِّجۡسَ اَهۡلَ الۡبَیۡتِ وَ یُطَهِّرَكُمۡ تَطۡهِیۡرًا
হে নবী পরিবার, আল্লাহ তো কেবল চান তোমাদের থেকে অপবিত্রতাকে দূরীভূত করতে এবং তোমাদেরকে সম্পূর্ণরূপে পবিত্র করতে।[9]
হে আল্লাহ!এরাই আমার আহল। ওয়াছিলা (রা) প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহর রাসূল!আমি কি আপনার আহলের অন্তর্ভূক্ত নই?তিনি বললেনঃতুমিও আমার আহলের অন্তর্ভূক্ত।[10]ওয়াছিলা (রা) বললেনঃ প্রকৃতপক্ষে আমি ইহাই আশা করছিলাম।[11]
আবুল আব্বাস আল ফায়য়ুমি আল হামাভী (মৃঃ৭৭০হি)এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যেঃ“আহল মানে আহলুল বাইত এবং এর প্রকৃত অর্থ আত্মীয়তা।অনুসারী অর্থেও ইহা ব্যবহৃত হয়।”[12]
[1] কিতাবুল আয়ুন,ভলিঃ৪,পৃঃ৮৯
[2] মুজামু মাকায়ীস আল-লূগাহ,ভলিঃ১,পৃঃ১৫০
[3] তাহজিবুল লুগাহ, খন্ডঃ ৬,পৃঃ১৫০
[4] দেখুনঃ লিসানুল আরব,শিরোনামঃ আহল; আল কামুসুল মুহিত (লাম অধ্যায়, হামজাহ পরিচ্ছেদ),পৃঃ১২৪৫
[5] মুফরাদাত গারীবাল কোরআন,পৃঃ২৯
[6] সূরা ত্বা-হা ২০:২৯
[7] নূহ আঃ এর বিশ্বাস,আমল এবং তার সন্তানের বিশ্বাস,আমল এক ছিলনা।তাই আল্লাহ নূহ আঃ এর সন্তান তার পরিবারভুক্ত নয় বলে নূহ আঃ কে জবাব দিয়েছেন।সুতরাং বিশ্বাস এবং আমলে মিল থাকলেও একজন ব্যক্তি কারোও আহলের অন্তর্ভূক্ত হতে পারে।-অনুবাদক
[8] সূরা হূদ ১১:৪৫-৪৬
[9] সূরা আহজাব ৩৩:৩৩
[10] ওয়াছিলা ইবনুল আসকাম রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এর একজন সাহাবী ছিলেন।তাই ইসলামের ব্যপারে তার এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ্বাসে মিল ছিল।আর এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাকে তার আহলের অন্তর্ভূক্ত করেন শুধু বিশ্বাসে মিল থাকার কারণে।-অনুবাদক
[11] সহীহ ইবনু হিব্বান,হাদিসঃ৬৯৭৬
[12] আল মিসবাহুল মুনীর,ভলিঃ১,পৃঃ২৮

Leave a comment