সংকলনঃ আবু মাইসারা
হিজরি দশম শতাব্দী পর্যন্ত পারস্যের অঞ্চলগুলো বিশাল সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল, তখন ইরানে রাফেজি শিয়া রাষ্ট্রের উত্থানের ফলে মুসলমানদের ওপর যে অবর্ণনীয় বিপদ নেমে এসেছিল তা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কেননা, এই রাষ্ট্রের কর্ণধাররা ইরানের সুন্নি অধিবাসীদের জোরপূর্বক শিয়া ইমামি মাযহাবে ধর্মান্তরিত করার জন্য তাদের বিরুদ্ধে নৃশংস কর্মকাণ্ড শুরু করেছিল। তাদের মধ্যে সবচেয়ে হিংস্র ছিলেন শাহ ইসমাইল সাফাভী, যিনি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের বিরুদ্ধে হত্যা ও নির্যাতনের জঘন্যতম রূপ প্রয়োগ করেছিলেন। ঐতিহাসিকরা বর্ণনা করেছেন যে, তিনি তাবরিজের গণহত্যায় বিশ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করেছিলেন এবং সেখানে পুরুষ, নারী, বৃদ্ধ বা শিশুর মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি। সাফাবীয়রা এই শহরে আগমন করে মিম্বরগুলোতে সাহাবায়ে কেরামের প্রতি গালিগালাজ করার ঘোষণা দেয়। আহলে সুন্নতের আলেমগণ এতে অস্বীকৃতি জানালে তারা বহু আলেমগণকে হত্যা করে যাদের মধ্যে আল্লামা মোল্লা আলী কারী হানাফী (রহ) এর ওস্তাদ শায়খ মুইন উদ্দিন আল-আইজি ও আল্লামা তাফতাজানির নাতি ও ছিলেন।
শেখ মুইন উদ্দিন আল-আইজি (রাহিমাহুল্লাহ এর শাহাদাত
শেখ মুইন উদ্দিন আল-আইজি (রাহিমাহুল্লাহ) ছিলেন দশম হিজরি শতকের একজন প্রখ্যাত আলিম, ফকিহ এবং মুহাদ্দিস। তিনি বিশেষ করে মোল্লা আলী কারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উস্তাদ হিসেবে সুপরিচিত। তার জীবন এবং শাহাদাতের ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে বেশ শোকাবহ।
তার সম্পর্কে প্রধান কিছু তথ্য নিচে তুলে ধরা হলো:
১. পরিচয় ও জ্ঞানচর্চা
তার পূর্ণ নাম মুইন উদ্দিন বিন হাফিজ জয়নুদ্দিন আল-আইজি আল-শাফিয়ী। তিনি তৎকালীন পারস্যের (বর্তমান ইরান) ‘আইজ’ নামক অঞ্চলের অধিবাসী ছিলেন। তিনি ইলমে হাদিস, ফিকহ এবং কালাম শাস্ত্রে অত্যন্ত দক্ষ ছিলেন। তিনি তৎকালীন হেরাতের জামে মসজিদের খতিব ছিলেন। মোল্লা আলী কারী (রহ) যখন হেরাতে অবস্থান করছিলেন, তখন তিনি শায়খ মুইন উদ্দিন আল-আইজি (রহ)-এর নিকট ইলম অর্জন করেন।
২. সাভাবী (Safavid) বংশের সাথে বিরোধ
সেই সময়ে পারস্যে সাভাবী রাজবংশের উত্থান ঘটেছিল। শাহ ইসমাইল সাভাবী যখন ক্ষমতা দখল করেন, তখন তিনি জোরপূর্বক সুন্নি আকিদার মানুষদের রাফেজীদের কুফরী মতবাদ গ্রহণে বাধ্য করতেন। শায়খ মুইন উদ্দিন আল-আইজি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ মুসলিম আলিম এবং তিনি তাদের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন।
৩. শাহাদাতের ঘটনা
সাভাবী শাসকরা যখন হেরাত এবং তার আশেপাশের অঞ্চল দখল করে, তখন তারা বিশিষ্ট মুসলিম আলিমদের টার্গেট করে। শায়খ মুইন উদ্দিন আল-আইজিকে তাদের আকিদা কবুল করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তিনি তার ঈমান ও মুসলিম আকিদায় অটল থাকেন।
এরই ধারাবাহিকতায়, সাভাবীরা তাকে নির্মমভাবে শহীদ করে। ইতিহাসবিদের মতে, তাকে জনসম্মুখে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল যাতে সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে তাদের আনুগত্য স্বীকার করে।
৪. মোল্লা আলী কারী (রহ)-এর ওপর প্রভাব
উস্তাদের এই নির্মম শাহাদাত মোল্লা আলী কারীর জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এই অস্থিরতা এবং সাভাবীদের জুলুমের কারণেই মোল্লা আলী কারী তার জন্মভূমি ত্যাগ করে পবিত্র মক্কায় হিজরত করেন। তিনি তার লেখনীতে অনেক জায়গায় উস্তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করেছেন এবং তৎকালীন ফিতনা সম্পর্কে উম্মাহকে সতর্ক করেছেন।
শায়খ সাইফুদ্দীন আহমাদ আল-তাফতাজানি (রহ) এর শাহাদাত
শায়খ সাইফুদ্দীন আহমাদ আল-তাফতাজানি (রাহিমাহুল্লাহ) প্রখ্যাত পন্ডিত আল্লামা সা’দ উদ্দিন তাফতাজানি (রাহিমাহুল্লাহ)-এর প্রপৌত্র ছিলেন। ইতিহাসে তিনি ‘শাইখুল ইসলাম’ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। মোল্লা আলী কারী (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উস্তাদদের তালিকায় এবং সাভাবী আমলের ইতিহাসে তার শাহাদাতের ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচে তার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. বংশ পরিচয় ও অবস্থান
শায়খ সাইফুদ্দীন আহমাদ আল-তাফতাজানি ছিলেন আল্লামা সা’দ উদ্দিন তাফতাজানির বংশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি তৎকালীন হেরাত (বর্তমান আফগানিস্তান) অঞ্চলের ‘শাইখুল ইসলাম’ বা প্রধান মুফতি ছিলেন। তিনি কেবল বংশীয় ঐতিহ্যের কারণেই নয়, বরং নিজস্ব ইলম ও তাকওয়ার কারণে সমকালীন বিশ্বে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন।
২. মোল্লা আলী কারীর সাথে সম্পর্ক
মোল্লা আলী কারী (রাহিমাহুল্লাহ) তার ছাত্র ছিলেন। মোল্লা আলী কারী যখন হেরাতে অবস্থান করছিলেন, তখন তিনি শায়খ সাইফুদ্দীন তাফতাজানি (রহ)-এর নিকট থেকে জ্ঞান অর্জন করেন। পরবর্তীতে সাভাবীদের হাতে উস্তাদের শাহাদাত এবং হেরাতের অস্থির পরিস্থিতির কারণেই মোল্লা আলী কারী মক্কায় হিজরত করতে বাধ্য হন।
৩. সাভাবীদের হাতে শাহাদাত
৯১৬ হিজরিতে (১৫১০ খ্রিস্টাব্দ) যখন সাভাবী শাসক অভিশপ্ত শাহ ইসমাইল সাভাবী হেরাত জয় করেন, তখন তিনি সেখানকার মুসলিম আলেমদের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেন। শাহ ইসমাইল চেয়েছিলেন শায়খ সাইফুদ্দীন আল-তাফতাজানি যেন জনসম্মুখে মুসলিম আকিদা ত্যাগ করে রাফেজী ধর্মের কুফরী আকিদা গ্রহণ করেন এবং সাহাবায়ে কেরামের (রা.) প্রতি বিরাগভাজন হন।
শায়খ সাইফুদ্দীন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই অন্যায্য দাবি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, জীবন দিলেও তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের আকিদা থেকে বিচ্যুত হবেন না। এর ফলে:
- শাহ ইসমাইল অত্যন্ত ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে ফাঁসির আদেশ দেন।
- কোনো কোনো বর্ণনা মতে, তাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে জনসম্মুখে শহীদ করা হয়েছিল।
- তার সাথে হেরাতের আরও অনেক বিশিষ্ট সুন্নি আলেমকেও হত্যা করা হয়।
৪. ইতিহাসের পাতায় প্রভাব
তার এই শাহাদাত তৎকালীন মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। সুন্নি আলেমদের ওপর সাভাবীদের এই চরম নির্যাতনের একটি প্রতীকী ঘটনা হিসেবে শায়খ সাইফুদ্দীন তাফতাজানির নাম ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। মোল্লা আলী কারী (রাহিমাহুল্লাহ) তার বিভিন্ন কিতাবে (যেমন: মিরকাতুল মাফাতিহ , শাম্মুল আওয়ারিদ) তৎকালীন ফিতনা এবং উস্তাদদের কষ্টের কথা ইঙ্গিত করেছেন।


Leave a comment