মেনু

আহলে বাইত কারা?- পর্বঃ৩

বইঃ আহলে বাইতঃমধ্যপন্থী এবং চরমপন্থী মতবাদগুলোর মধ্যে আহলে বাইতের প্রকৃত পরিচয়ের অনুসন্ধান।

লেখকঃমুহাম্মদ সালিম আল খিদ্বর

অনুবাদঃ আবু মাইসারা


‘ল আল বাইত

পূর্ববর্তী পৃষ্ঠাগুলিতে এটি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে,(আহল আল-বাইত), (‘ল আল-বাইত) এবং (আল মুহাম্মদ) (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এর অর্থের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। বরং পরিভাষাগুলোর সাথে সম্পর্কিত সমস্ত দলিল, অর্থগুলির একে অপরের উপর আপতিত হওয়া নির্দেশ করে।তবে এর অর্থের সঠিক ধারণাটি বক্তার নির্দিষ্ট বক্তব্য এবং ভাষাগত শৈলী থেকে উদ্ভূত হবে।

আল মুহাম্মদ সম্পর্কে আবুল বাকা খাফাভী বলেনঃ“বংশের দৃষ্টিকোণ থেকে, -নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) হলেন আলী (রা), আকীল(রা), জাফর(রা) এবং আব্বাস (রা) এর বংশধর এবং ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে আল্লাহর ভয়ে ভীত বিশ্বাসী(মুত্তাকী মুমিন) প্রত্যেক ব্যাক্তিই ন-নবী এর(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)অন্তর্ভুক্ত, যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেছিলেন[1] যখন তাকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘আল’ সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল।”[2]

আহল আল-বাইত এবং ‘ল আল-বাইত পরিভষাগুলোর দুটো গৃহীত অর্থ রয়েছে।একটি ‘সাধারণ অর্থ’ অন্যটি ‘নির্দিষ্ট অর্থ’।

সাধারণ অর্থঃ এটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবীগণ সহ কেয়ামত দিন পর্যন্ত যারা তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) অনুসরণ করবেন তাদের সবাইকে বোঝায়।

ইমাম জাওহারী মুসনাদে মুওয়াত্তায় আলী ইবনে মাবাদ জাজরী  থেকে উল্লেখ করেন যে, তিনি বলেন: আবদুল মালেক ইবনে সালেহ আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “আল মুহাম্মাদ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দ্বারা কাদেরকে বোঝানো হয়েছে? ” আমি জবাব দিলাম, “যারা তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পদাঙ্ক অনুসরণ করে” । তিনি বললেন, “আপনি সঠিক উত্তর দিয়েছেন এবং মালিক বিন আনাস আমাকে এমনটিই জানিয়েছিলেন।”[3]

তারিখে আসবাহানে হামানী বর্ণনা করেন,আমি ইমাম সাওরীকে প্রশ্ন করলাম “আহল আল বাইত কারা?”তিনি বললেন ,“সৃষ্টিকর্তা সম্পর্কে সচেতন আল্লাহভীরু প্রত্যেক ব্যাক্তি।”[4]

অন্য বর্ণনায় বর্ণিত আছে ইমাম সাওরী (রহঃ) বলেন, আহল আল বাইত বলতে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতকে বোঝায়।[5]

নির্দিষ্ট অর্থঃ নির্দিষ্ট অর্থে আহল আল বাইত বলতে বনু হাশিম এবং  রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর স্ত্রীগণকে বোঝায়।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীসে এর পক্ষে অনেক দলিল রয়েছে, যার মধ্যে কয়েকটি নীচে উদ্ধৃত করা হল:

  1. যায়েদ বিন আরকাম রা কে জিজ্ঞেস করা হলোঃ আ’ল আল বাইত কারা? তিনি উত্তর দিলেন,আ’ল আল বাইত হলো তারা যাদের উপর যাকাত নেওয়া নিষেধ করা হয়েছে। তাকে আবারও জিজ্ঞেস করা হলো ,”তারা কারা যাদের উপর যাকাত নেওয়া নিষেধ করা হয়েছে?”এবং তিনি উত্তর দিলেনঃ “তারা হলেন আলী রা এর পরিবার, আকীল রা এর পরিবার,জাফর রা এর পরিবার এবং আব্বাস রা এর পরিবার।[6]
  2. আব্দুল্লাহ বিন হারিস বিন নাওফেল বর্ণনা করেছেন যে ‘আব্দুল মুত্তালিব বিন রাবিয়াহ বিন হারিস বিন আব্দুল মুত্তালিব এবং ফযল বিন আব্বাস (রাদিযাল।লাহু আনহুম) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আসলেন এবং তাকে অনুরোধ করলেন যে তাদেরকে (মানুষের কাছ থেকে) যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত করা হোক। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বললেন, যাকাত ও দান হল মানুষের সম্পদের অপবিত্রতা এবং তা আ’ল মুহাম্মাদের জন্য বৈধ নয়।[7]
  3. রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর দাস-খেদমতকারী আবু রাফে বলেন: “রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বনু মাখজুম থেকে একজনকে যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত করেছিলেন। ওই একই ব্যক্তি আমাকে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে অনুরোধ করতে বলেছিলেন যেন আমাকেও একই কাজের জন্য নিযুক্ত করা যেতে পারে। আমি তখন গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম যার উত্তরে নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন যে যাকাত আ’ল মুহাম্মাদের জন্য বৈধ নয় এবং একজন দাস তার মালিকের সম্প্রদায়ের সদস্য।[8]
  4. আবদুর রহমান ইবনে আবি লায়লা বর্ণনা করেন: “আমি একবার কাব ইবনে উজরাহ (রা.)-এর সাথে সাক্ষাত করলাম, এবং তিনি বললেন, আমি কি তোমাকে আমার কাছে একটি উপহার (অর্থাৎ হাদিস) দিয়ে দেব না যা আমি নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে শুনেছি আমি বললাম, অনুগ্রহ করে আমাকে অবশ্যই উপহারটি দিন! তিনি বলেন: “আমরা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আপনার ও আপনার পরিবারের (আহলে বাইত) প্রতি আমাদের সালাত ও বরকত পাঠাতে হবে? যদিও আল্লাহ ইতিমধ্যেই আমাদেরকে সালাম জানানোর উপায় শিখিয়েছেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উত্তরে বললেন, এভাবে বল: হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও আল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) -এর উপর তোমার বরকত নাযিল কর যেভাবে তুমি ইব্রাহিম (আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং আল ইব্রাহিমের উপর বরকত দান করেছ। নিঃসন্দেহে তুমিই সবচেয়ে প্রশংসিত ও করুণাময়।[9]

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পরিবারের সদস্যদের (আ’ল) প্রতি দরূদ পাঠানোর বিভিন্ন উপায় শিখিয়েছেন, যার মধ্যে তাঁর থেকে নিম্নোক্ত বক্তব্যও বর্ণিত হয়েছে:

আমর বিন সুলাইম জুরাকি উল্লেখ করেছেন যে, আবু হুমাইদ সা’দি (রাঃ) তাকে অবহিত করেছেন যে, সাহাবায়ে কেরাম রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন: “আপনার উপর দরূদ কিভাবে পাঠ করা হবে? , হে রাসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)? সুতরাং, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন এভাবে:

“হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের উপর আপনার অনুগ্রহ দান করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম (আঃ)-এর উপর অনুগ্রহ করেছেন; এবং মুহাম্মাদ, তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের উপর আপনার বরকত দান করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম (আঃ)-এর উপর বরকত দান করেছেন। নিঃসন্দেহে আপনিই সবচেয়ে প্রশংসিত ও করুণাময়”।[10]

আলেমগণ আবূ হুমাইদ সা’দি (রাঃ) এর উল্লিখিত হাদীস থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, “সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম” এই শব্দগুলো নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য ব্যবহার করা যাতে পারে।[11] উপরন্তু, উপরোক্ত হাদিস থেকে এটা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, “আল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)” শব্দের মধ্যে স্ত্রী ও সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তবে আমরা বলি না যে তারাই একমাত্র “আল মুহাম্মাদ” শব্দের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, কারণ বনু হাশিমও এই শব্দটির অর্থের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত, যেমনটি উপরে আলোচনা করা হয়েছে।

ইমাম ইবনে কাইয়্যিম তার জালাঊল আফ্হাম গ্রন্থে লিখেছেন: “বিশেষ দোয়ায় (আশীর্বাদ প্রেরণ) নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রী ও সন্তানদের উল্লেখ করা “আল মুহাম্মাদ” শব্দের অর্থে তাদের একচেটিয়াতার প্রমাণ নয়, কারণ আবু হুরায়রা (রা.)-এর অন্য বর্ণনায় নিম্নোক্ত শব্দগুলো পাওয়া যায়: “হে আল্লাহ! মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), তাঁর স্ত্রীগণ – মুমিনদের মাতা, তাঁর সন্তান এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের (আহলে বাইত) উপর আপনার অনুগ্রহ দান করুন, যেমন আপনি ইব্রাহিম (আঃ) উপর বরকত দান করেছেন।”[12]

উপরের হাদিসে স্ত্রী, সন্তান এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সম্পর্কে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে, যেখান থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, তাঁর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)”  স্ত্রী ও সন্তানদের ব্যতীত “আল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)” পরিভাষায় আরও কেউ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং তাদের (স্ত্রী ও সন্তান) বিশেষ উল্লেখ প্রধানত পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের উপর তাদের প্রাধান্য বোঝানোর জন্য।[13]

ইমাম ইবনে হাজার তার সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীতে লিখেছেনঃ

তাশাহহুদে “আল মুহাম্মাদ” পরিভাষাটি নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রী এবং যাদের উপর যাকাত নিষিদ্ধ তাদের অন্তর্ভূক্ত করে (অর্থাৎ নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রী ,সন্তানগণ এবং বনু হাশিমের সন্তানগণ)।”[14]

  • আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ “ফল নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে সদকা হিসাবে সংগৃহীত খেজুর দ্বারা একটি বড় স্তূপ তৈরি করা হলো। হাসান ও হোসাইন সেই খেজুরগুলো নিয়ে খেলতে লাগলেন এবং খেলতে খেলতে তাদের একজন মুখে খেজুর রাখলেন। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন তা দেখলেন, তখনই তিনি তা মুখ থেকে সরিয়ে নিলেন এবং বললেনঃ “তুমি কি জানো না যে, ‘ল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সদকা খায় না।[15]
  • আবূ হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

হে আল্লাহ! আল মুহাম্মাদের (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  রিযিক তাদের প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট করুন[16]

এই হাদিস থেকে লোকেরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, “বনু হাশিম” এবং “বনু আল মুত্তালিব”-এর জন্য নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর এই দোয়া কবুল হয়েছে, কেননা তাদের মধ্যে বহু লোক গত হয়েছে এবং নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি ব্যতীত আজও অনেকে উপস্থিত রয়েছে, যাদের রিজিক তাদের প্রয়োজনের জন্য যথেষ্ট ছিল। নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ইন্তেকালের পরও ‘মুমিনদের মায়েরা যা কিছু অতিরিক্ত রিজিক পেতেন, তারা তা দান-খয়রাত করে দিতেন, শুধুমাত্র ততটুকুই রাখতেন যতটুকু তাদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য দরকার ছিল।

বর্ণিত আছে যে, আয়েশা (রাঃ) একবার প্রচুর পরিমাণে সম্পদ পেয়েছিলেন এবং তিনি এক জমায়েতে পুরোটাই বন্টন করেছিলেন, তখন তাঁর দাসী-খেদমতকারীনি উচ্চারণ করেছিলেন: “আহ! আপনি যদি একটি দিরহাম রাখতেন তবে আমরা গোশত কিনতে পারতাম! এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন: “আপনি যদি আমাকে আগে বলতেন তবে আমি এটি রাখতাম।”[17]

  • আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিতঃ “রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদীনায় আগমনের পর থেকে তার মৃত্যু পর্যন্ত আ‘ল মুহাম্মাদ কখনও একটানা তিন রাত পেট ভরে গম-খাবার খেতে পাননি।[18]

আবু হুরায়রা (রা.) এর অন্য বর্ণনায় তিনি উল্লেখ করেন:

“আ’ল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তার (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মৃত্যুর আগ পর্যন্ত টানা তিন রাত কখনো পেট ভরেনি।”[19]

কিছু আলেম বলেছেন: “আব্বাস (রাঃ), তাঁর সন্তান এবং বনু মুত্তালিব, আয়েশা (রাঃ)-এর এই বক্তব্যের অন্তর্ভুক্ত নয়।”[20]

  • আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একবার একটি শিংওয়ালা ভেড়া পেলেন, তিনি আরও বলেনঃ “আল্লাহর রসূল (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সেটিকে মাটিতে শোয়ালেন এবং সেটির গলা কেটে বললেন:

বিসমিল্লাহি আল্লাহুম্মা তাকাব্বাল মিন মুহাম্মাদীন ওয়া আলি মুহাম্মাদিন ওয়া মিন উম্মাতি মুহাম্মাদিন” (আল্লাহর নামে, এটি মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম), ‘লে মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এবং মুহাম্মদের(সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  উম্মতের পক্ষ থেকে গ্রহণ করুন)।”[21]

  • আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন: “লোকেরা বারিরাহ (রাঃ)-কে দান (সদকা) করত এবং তিনি আমাদের কাছে উপহার (হাদিয়া) পাঠাতেন, তাই আমি এটি নবী (সা.)-এর কাছে উল্লেখ করলাম। যার জবাবে তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছিলেন: “এটি তার জন্য দান (সদকা) এবং তোমার জন্য উপহার (হাদিয়া)।”[22]

অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

“এটি তার জন্য দান (সদকা) এবং আমাদের জন্য উপহার (হাদিয়া)।”[23]

  1. আবু বকর (রাঃ) ফাতিমা (রাঃ) কে বলেনঃ “আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি:

আমাদের (নবীদের) উত্তরাধিকারী নেই, বরং আমরা যা রেখে যাই তা একটি সদকা এবং আ‘ল মুহাম্মদ তা থেকে খেতে পারেন।[24]

ইমাম কুরতুবী লিখেছেন:

“এই হাদিসে আ’ল মুহাম্মাদ শব্দটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রীদেরকে বোঝানো হয়েছে, কারণ অন্য বর্ণনায় তিনি (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন: আমার রেখে যাওয়া সম্পত্তি আমার স্ত্রীদের ভরণপোষণ।”[25]

এ কারণেই, যখন উমর আল-ফারুক (রা.) তাঁর খিলাফত আমলে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেন, তখন তিনি আ’লে মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  থেকে শুরু করার নির্দেশ দেন, ফলে নবীর (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)  স্ত্রীদের থেকে তথ্য সংগ্রহ শুরু হয়েছিলো, তারপর আলী (রাঃ) নাম অন্তর্ভূক্ত হয়।[26]

ইমাম ইবনে কাইয়িম (রহ.) বলেন:

সঠিক মত হলো, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পত্নীদের উপরও যাকাত গ্রহণ নিষিদ্ধ। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহ.)-এরও এটাই মত। কারণ, এটি মানুষের সম্পদের অপবিত্রতা (নাজাসাত), আর আল্লাহ তা‘আলা নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও তাঁর পরিবারবর্গ (আলে-মুহাম্মাদ)-কে এই অপবিত্রতা থেকে পবিত্র রেখেছেন।

তবে একটি বিস্ময়কর ব্যাপার এই যে, নবী (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর স্ত্রীগণকে তার পরিবারের (আ’লে মুহাম্মদ) অন্তর্ভুক্ত বিবেচনা করা হয় যখন ন্যূনতম জীবিকা, বা পশু কোরবানি, বা একটানা তিন দিন পেট ভরে খাবার না পাওয়া, বা সালাতের সময় দরূদ পাঠের বিষয় সামনে আসে; কিন্তু যখন দান (সদকার) নিষেধের কথা আসে তখন তারা মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর পরিবারে (আ’ল-আল-বাইত) অন্তর্ভুক্ত হন না, অথচ দান (সদকা) হল মানুষের ধন-সম্পদের  ময়লা-নাজাসাত এবং নবীর পবিত্র স্ত্রীগণ এই অপবিত্রতা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ও সুরক্ষিত।[27]

২য় পর্ব পড়ুন৪র্থ পর্ব পড়ুন


[1] এখানে তিনি আনাস রা থেকে বর্ণিত ঐ হাদিসের প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যেখানে নবী(ﷺ)কে প্রশ্ন করা হয়েছিলঃ“আল মুহাম্মদ কারা?”তিনি(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) উত্তর দিয়েছিলেনঃ “প্রত্যেক মুত্তাকী মুমিন।”

এই হাদিস সম্পর্কে ইমাম ইবনু তায়মিয়্যাহ তার মাজমুঊল  ফাতাওয়াতে (ভলিঃ২২,পৃ-৪৬২) বলেনঃ “হাদিসটি মাওজু।এর কোন ভিত্তি নেই।”(আরও দেখুনঃআলবানী রহ এর সিলসিলাতুল আহাদিস আয জয়ীফা ওয়া আল মাওজুয়া,ভলিঃ৩,পৃ-৪৬৮,হাদিসঃ১৩০৪)

[2] কিতাবুল কুল্লিয়াত,ভলিঃ১,পৃ-২৪৩

[3] মুসনাদ আল মুওয়াত্তা,পৃ-৮২

[4] তারিখে আসবাহান,ভলিঃ২,পৃ-১২০

[5] হিলয়াতুল আওলিয়া,ভলিঃ৭,পৃ-১৯

[6] মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক, ভলিঃ৪, পৃঃ৫২, হাদিস নং৬৯৪৩

[7] সহীহ মুসলিম, হাদিস নং১০৭২

[8] মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং: ২৭১৮২; শুআয়েব আরনাউত বলেন, এই হাদিসটি শাইখাইন (বুখারী ও মুসলিম) এর মানদণ্ডে সহীহ।

[9] সহীহ বুখারী, হাদিস নং৩৩৭০; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং৪০৬

[10] সহীহ বুখারী, হাদিস নং৩৩৬৯; সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ৪০৭

[11] আত তাহমীদ, ইবনে আব্দুলবার, ভলিঃ১৭, পৃঃ৩০৩

[12] এই হাদিসটি দূর্বল।দেখুনঃযয়ীফ সুনানে আবু দাঊদ,আলবানী ভলিঃ১১, পৃঃ১৬০

[13] জালাঊল আফ্হাম, পৃঃ২২৩

[14] ফাতহুল বারীঃ ভলিঃ১১, পৃঃ১৬০

[15] সহীহ বুখারী, হাদিস নং১৪৮৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ১০৬৯

[16] সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ১০৫৫

[17] জালাঊল আফ্হাম, পৃঃ২১৬

[18] সহীহ বুখারী, হাদিস নং৫৪১৬; সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ২৯৭০

[19] সহীহ বুখারী, হাদিস নং৫৩৭৪

[20] জালাঊল আফ্হাম, পৃঃ২১৭

[21] সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ১৯৬৭

[22] সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ১০৭৫

[23] সহীহ বুখারী, হাদিস নং১৪৯৩; সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ১০৭৪

[24] সহীহ বুখারী, হাদিস নং৪০৩৫; সহীহ মুসলিম, হাদিস নংঃ১৭৫৯

[25] আল মুফহিমঃ ভলিঃ৫, পৃঃ২৬০

[26] আল আমওয়াল,আবু উবাইদঃ পৃঃ২১৭-২১৮

[27] জালাঊল আফ্হাম, পৃঃ২১৭-২১৮



Leave a comment